বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরে ৪,৮৮০ কোটি টাকার প্রকল্প ডিএসসিসির

খালিদ সাইফুল্লাহ
Printed Edition
  • প্রতিদিন উৎপাদন ২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ
  • ৪১০ টন পরিবেশবান্ধব জৈব সার
  • ২০ টন বিএসএফ প্রোটিন

রাজধানী ঢাকার বাতাস ও পরিবেশ এখন এক অসহনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি। তিন কোটি মানুষের এই মেগাসিটিতে এখন ধুলাবালু আর দুর্গন্ধে টেকা দায় হয়ে পড়েছে। দুই সিটি করপোরেশন প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে একবার রাস্তাঘাট ঝাড়ু দিলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথেই পুরো শহর আবারো রূপ নিচ্ছে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে। বাসাবাড়ি, কাঁচাবাজার ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন যে হাজার হাজার টন বর্জ্য উৎপাদন হচ্ছে তা ব্যবস্থাপনায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে ঢাকার দুই নগর কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে বিভিন্ন সড়কের পাশে অবস্থিত সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) বা অন্তর্বর্তীকালীন বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রগুলো এখন নগরবাসীর জন্য স্থায়ী অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্মুক্ত বা আধো-উন্মুক্ত এই স্টেশনগুলো থেকে দিনরাত প্রতিনিয়ত ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ, যা পুরো ঢাকা শহরের বায়ুকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। এর সরাসরি প্রভাবে ফুসফুসের সংক্রমণ, শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ ও ডায়রিয়াসহ নানা জটিল রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে সর্বস্তরের নগরবাসী। এই চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে দুই সিটির গৃহীত প্রকল্পের ধরন, পরিবেশগত প্রভাব এবং কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে চলছে নানা চুলচেরা বিশ্লেষণ। উত্তর সিটি করপোরেশন যেখানে বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিতর্কিত পথে হাঁটছে, সেখানে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পরিবেশবান্ধব ও বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের এক মেগা প্রকল্প নিয়ে মাঠে নামছে।

জানা যায়, ২০১৬ সাল থেকে দুই সিটি করপোরেশন মিলে প্রায় শতাধিক এসটিএস নির্মাণ করেছে, যার ফলে রাস্তাঘাট থেকে উন্মুক্ত ডাস্টবিন বা বড় কনটেইনার অনেকাংশেই কমেছে। তবে অপরিকল্পিত অবস্থান, জায়গার অভাব ও আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতির কারণে এগুলো এখন স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের জন্য তীব্র ভোগান্তি সৃষ্টি করছে। অব্যবস্থাপনার কারণে এসটিএসের ময়লা ছড়িয়ে পড়ছে রাস্তা-ফুটপাতে। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের পুরো এলাকায়।

ডিএনসিসির প্রকল্প-বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ ও পরিবেশ দূষণের আশঙ্কা : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) তাদের এলাকার বর্জ্য সঙ্কট দূর করতে ‘ওয়েস্ট টু এনার্জি’ বা বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পটির মূল কাজ পেয়েছে চীনের একটি পরিবেশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিদিন আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে সংগৃহীত বর্জ্য পুড়িয়ে (ওহপরহবৎধঃরড়হ) বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। তবে এই প্রকল্প নিয়ে পরিবেশ বিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মনে তীব্র সংশয় ও আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। পরিবেশবাদীদের মতে, বাংলাদেশের বর্জ্যে সাধারণত ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই থাকে পচনশীল ও ভেজা জৈব বর্জ্য, যার ক্যালোরিফিক ভ্যালু (তাপ উৎপাদন ক্ষমতা) খুবই কম। এই ধরনের ভেজা বর্জ্য পোড়াতে অতিরিক্ত জ্বালানির প্রয়োজন হয়। সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো, প্লাস্টিক ও অন্যান্য রাসায়নিকযুক্ত বর্জ্য অপরিকল্পিতভাবে পোড়ানোর ফলে বাতাসে ‘ডাইঅক্সিন’ ও ‘ফিউরান’-এর মতো মারাত্মক ক্যান্সার সৃষ্টিকারী বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে বর্জ্যরে স্তূপের দুর্গন্ধ থেকে সাময়িক মুক্তি মিললেও তা ঢাকার বাতাসকে আরো দীর্ঘমেয়াদি ও মারাত্মক বায়ু দূষণের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ডিএসসিসির পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের আশা : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অপেক্ষাকৃত টেকসই একটি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ডিএসসিসি তাদের প্রতিদিনের উৎপাদিত ৩২০০ থেকে ৩৫০০ টন বর্জ্যকে শুধু পুড়িয়ে ফেলার পরিবর্তে তা থেকে মূল্যবান সম্পদ সৃষ্টির পরিকল্পনা করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার খ্যাতনামা কোম্পানি বিএন্ডএফের সাথে যৌথ উদ্যোগে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। এই মহাপরিকল্পনায় ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় চার হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো বর্জ্যকে শতভাগ পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা। কোরিয়ান কোম্পানির নকশা অনুযায়ী, ঢাকার বর্জ্য থেকে কোনো ক্ষতিকর ধোঁয়া না উড়িয়ে, আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সাত ধরনের বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে : বর্তমানে সংগৃহীত ৩২০০ থেকে ৩৫০০ টান বর্জ্য থেকে প্রতিদিন ২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন, ৪১০ টন পরিবেশবান্ধব জৈব সার, ২০ টন বিএসএফ প্রোটিন (পোলট্রি ফিড ও ফিশ ফিড), ১১.৫২ টন বিএসএফ তেল (কসমেটিক শিল্পের কাঁচামাল), ৪৭ হাজার ৭৭৫ লিটার পাইরোলাইসিস তেল (পেট্রলিয়াম জ¦ালানি), ৭.৩৫ টন পাইরোলাইসিস ব্লাক কার্বন (শিল্পজাত দ্রব্য), সলিড রিকভারড ফুয়েল (এসআরএফ) ২৫৫ টন, ইকো ব্রিকস ১২৮ টন উৎপাদন হবে।

ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো এটি বাতাসে ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করবে, যার পরিমাণ বছরে ৯ লাখ ৮৫ হাজার ৭০০ টন (ঃঈঙ২ব)। এটি একটি গ্রিন প্রজেক্ট বা পরিবেশবান্ধব প্রকল্প হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আগস্টেই শুরু হচ্ছে কাজ, লভ্যাংশ পাবে সিটি করপোরেশন : ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অত্যন্ত আশাবাদী যে, আগামী আগস্টের মধ্যেই এ বিশাল প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা সম্ভব হবে। আর উৎপাদন শুরু হবে আগামী জানুয়ারি থেকেই। প্রকল্পের মেয়াদ হবে ১৫ বছর। চুক্তি অনুযায়ী, জমি সরবরাহ ছাড়া এই প্রকল্পে ডিএসসিসির সরাসরি বড় কোনো আর্থিক বিনিয়োগ নেই, পুরো বিনিয়োগটিই আসছে বিদেশী উৎস থেকে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এই প্রকল্প থেকে উৎপাদিত পণ্য বিক্রির মোট লভ্যাংশের ২০ শতাংশ সরাসরি আয় করবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এ ছাড়া প্রতি মাসে জায়গার ভাড়া থেকে আরো ৫০ হাজার টাকা পাবে ডিএসসিসি। লভ্যাংশের এই বিপুল আয়ের পাশাপাশি রাজধানীর রাস্তাঘাট, ডাস্টবিন ও উন্মুক্ত স্থান থেকে ময়লা-আবর্জনার চিরতরে বিলুপ্তি ঘটবে। ফলে দক্ষিণ ঢাকার পরিবেশ হবে দুর্গন্ধমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য।

ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো: মাহবুবুর রহমান তালুকদার নয়া দিগন্তকে বলেন, কোরিয়ান একটি কোম্পানির সাথে আমাদের চুক্তি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তাদেরকে ১০ একর জায়গা বুঝিয়ে দিয়েছি। এরপর মোট ৪৫ একর জায়গা দেয়া হবে। আগামী মাসের মাঝামাঝি সময়ে অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শুরু করবে তারা। আমরা যে বর্জ্য সংগ্রহ করি এগুলো কনভার্ট করে সব জিরো হয়ে যাবে। এখান থেকে ফিশ ফিড, ব্যায়োগ্যাস, কম্পোস্ট সার, জ¦ালানি তেলসহ সাতটি আইটেম তৈরি হবে। তিনি বলেন, এ প্রকল্প চালু হলে আমাদের ময়লার চাহিদা আরো বেড়ে যাবে। তখন রাস্তা-দোকানপাট থেকে আরো বেশি ময়লা সংগ্রহ করা হবে। পাঁচ কেজির ওপরে ময়লা হলেই আমরা গ্রাহকদের ৫০ টাকা দিবো। এজন্য ফুটপাথে ময়লার বিন বসানো হচ্ছে। প্রথমে ৯ নম্বর ওয়ার্ডে এ কাজ শুরু হবে। সেখানে সার্ভে চলছে। এরপর পর্যায়ক্রমে সব ওয়ার্ডে হবে। এতে পুরো ডিএসসিসি এলাকা ময়লা থেকে মুক্ত হবে বলে আশা করছি।

বিশেষজ্ঞদের মত ও নাগরিক প্রত্যাশা : পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করার এই কোরিয়ান মডেলটি যদি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা বাংলাদেশের সামগ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটাবে। তবে তারা ডিএনসিসির চীনা প্রকল্পটির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পরিবেশগত নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখার তাগিদ দিয়েছেন, যেন বিদ্যুৎ তৈরি করতে গিয়ে ঢাকার বাতাস বিষাক্ত হয়ে না পড়ে। এই বাস্তবতায় সাধারণ নগরবাসীর একটাই চাওয়া কাগজে-কলমে থাকা এই মেগা প্রকল্পগুলো যেন দ্রুত আলোর মুখ দেখে। ঢাকার বাতাস যেন দুর্গন্ধ ও বিষাক্ত ধোঁয়া থেকে মুক্তি পায় এবং নাগরিকরা যেন একটি সুস্থ, পরিচ্ছন্ন ও রোগমুক্ত উন্নত নগরী ফিরে পায়।