ডিজিটাল সেবার বিস্তারে বাড়ছে তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি

ডিজিটাল সেবার বিস্তারের সাথে বাংলাদেশে বাড়ছে সাইবার হামলা, তথ্য চুরি ও নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি। সরকারি ওয়েবসাইট, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যভাণ্ডারও সাইবার অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তু। শুধু ওয়েবসাইট অচল বা বিকৃত করা নয়, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ফোন নম্বর, পাসপোর্টের তথ্য, আর্থিক হিসাব ও প্রবেশের গোপন তথ্য চুরি করে প্রতারণা ও পরিচয় জালিয়াতির ঝুঁকিও বাড়ছে।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

  • প্রধান লক্ষ্যবস্তু নাগরিক তথ্য ও আর্থিক খাত
  • প্রয়োজন নিরাপত্তা নিরীক্ষা ও দক্ষ জনবল

ডিজিটাল সেবার বিস্তারের সাথে বাংলাদেশে বাড়ছে সাইবার হামলা, তথ্য চুরি ও নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি। সরকারি ওয়েবসাইট, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যভাণ্ডারও সাইবার অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তু। শুধু ওয়েবসাইট অচল বা বিকৃত করা নয়, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ফোন নম্বর, পাসপোর্টের তথ্য, আর্থিক হিসাব ও প্রবেশের গোপন তথ্য চুরি করে প্রতারণা ও পরিচয় জালিয়াতির ঝুঁকিও বাড়ছে।

টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত দেশে অন্তত ৬৮টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬টি সরকারি ও ৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির হামলার চেয়ে পুরনো সফটওয়্যার, দুর্বল পরিচয় যাচাই, অনিরাপদ সংযোগ ও অপর্যাপ্ত নজরদারিই সাইবার অপরাধীদের প্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছে।

সরকারের কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিমের (সিআইআরটি) বিভিন্ন সতর্কবার্তাতেও একই ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের এক বার্তায় ওয়েবভিত্তিক ব্যবস্থার দুর্বলতা কাজে লাগানো, তথ্যভাণ্ডার থেকে তথ্য বের করে নেয়া, ওয়েবসাইট বিকৃত করা, প্রতারণামূলক বার্তার মাধ্যমে তথ্য হাতিয়ে নেয়া, মুক্তিপণের জন্য তথ্য জিম্মি করা এবং সার্ভার অচল করে দেয়ার প্রবণতার কথা জানানো হয়। সরকারি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা খাতকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সিআইআরটির পৃথক পরামর্শে তথ্যভাণ্ডারের সফটওয়্যারের দুর্বলতা, অননুমোদিত প্রবেশের সুযোগ, নিরাপত্তাহীন সংযোগ, দুর্বল পরিচয় যাচাই, পুরনো সফটওয়্যার এবং নিয়মিত নিরাপত্তা হালনাগাদ না করাকে বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কার্যক্রমের পর্যাপ্ত রেকর্ড সংরক্ষণ ও নজরদারির ঘাটতিকেও গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে ব্যাংক, বিদ্যুৎ ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামোসহ উচ্চ-প্রভাবসম্পন্ন খাতে বড় ধরনের সাইবার হামলার আশঙ্কায় সতর্ক করা হয়। এ সময় ২৪ ঘণ্টা নজরদারি, একাধিক ধাপে পরিচয় যাচাই, বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন হিসাব নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত নিরাপত্তা হালনাগাদ, সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্তকরণ ও নিরাপদ সংরক্ষণ ব্যবস্থা জোরদারের পরামর্শ দেয়া হয়।

২০২৬ সালে ঝুঁকির ধরন আরো বিস্তৃত হয়েছে। বিভিন্ন নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা যন্ত্রের গোপন তথ্য চুরি, ক্লাউডভিত্তিক ই-মেইল হিসাব লক্ষ্য করে প্রতারণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সামাজিক প্রতারণা, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ক্ষতিকর সফটওয়্যার এবং মুক্তিপণের জন্য তথ্য জিম্মি করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। ফলে এখন শুধু ওয়েবসাইট নয়, কর্মীদের পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য, অনলাইন হিসাব, মোবাইল ব্যাংকিং ও জৈবিক পরিচয়ও ঝুঁকিতে পড়ছে।

নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ২০২৩ সালে। সরকারি একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে। এতে নাম, ফোন নম্বর, ই-মেইল ও জাতীয় পরিচয়পত্র-সংক্রান্ত তথ্য উন্মুক্ত হওয়ার কথা প্রকাশিত হয়।

অথবা টেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, এটি শুধু একটি ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা ব্যর্থতা নয়; বরং পুরো সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতার বিষয়টি সামনে এনেছে। সংবেদনশীল তথ্য সংরক্ষণ, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, তথ্য সংকেতায়ন এবং তথ্য ব্যবস্থাপনায় যুক্ত কর্মীদের প্রশিক্ষণ- সব স্তরেই নিরাপত্তা জোরদার প্রয়োজন। তার মতে, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অপরাধীদের হাতে গেলে ভুয়া ব্যাংক হিসাব খোলা বা ঋণ নেয়ার মতো অপরাধে তা ব্যবহার করা সম্ভব।

আর্থিক খাতে সাইবার ঝুঁকির বড় উদাহরণ ২০১৬ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক সাইবার হামলা। কর্মীর প্রবেশের গোপন তথ্য চুরি করে হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় ক্ষতিকর সফটওয়্যার স্থাপন করে আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। ৩৫টি অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশ পাঠানো হলেও পাঁচটি সফল হয়। এতে ফিলিপাইনের হিসাবে আট কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চলে যায়। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে ক্ষতিকর সফটওয়্যার, প্রবেশের গোপন তথ্য চুরি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দুর্বলতার সমন্বিত ব্যবহারের কথা উঠে আসে।

বিডি জবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সাইবার বিশেষজ্ঞ ফাহিম মাশরুর নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকারি অর্থে তৈরি কোনো তথ্যভাণ্ডার বা অনলাইন সেবা নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা ছাড়া পরিচালিত হলে বড় প্রযুক্তি বিনিয়োগও কাক্সিক্ষত নিরাপত্তা দিতে পারে না। তার মতে, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর নয়, সফটওয়্যার তৈরির শুরু থেকেই পরিচয় যাচাই, তথ্য সংকেতায়ন, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, কার্যক্রমের রেকর্ড সংরক্ষণ ও হামলা মোকাবেলার পরিকল্পনা রাখতে হবে।

তিনি আরো বলেন, দক্ষ জনবল ও জবাবদিহিতার ঘাটতিও বড় সমস্যা। সাইবার নিরাপত্তাকে শুধু তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে ঝুঁকি থেকে যায়। তথ্য ফাঁস হলে কত দ্রুত তা শনাক্ত হয়েছে, কার গাফিলতিতে ঘটেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের কিভাবে জানানো হয়েছে- এসব বিষয়েও জবাবদিহি প্রয়োজন।

এ দিকে সরকার সাইবার নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করছে। ২০২৫ সালে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ও ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়। ২০২৬ সালে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির তালিকায় সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-ও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এর কার্যকর প্রয়োগ, স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং তথ্য ফাঁসের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

ড্রিম টেকের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন নাজিম নয়া দিগন্তকে বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নাম্বার, আর্থিক তথ্য বা জৈবিক পরিচয় একবার ফাঁস হলে তা সহজে পরিবর্তন করা যায় না। তাই নিয়মিত স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা, দুর্বলতা পরীক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং তথ্য ফাঁস হলে দ্রুত নাগরিককে অবহিত করার ব্যবস্থা প্রয়োজন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের জন্য দুই হাজার ৪৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বরাদ্দের পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তায় প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়, নিরাপত্তা সক্ষমতা এবং দুর্বলতা সংশোধনের অগ্রগতিও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন। কারণ ডিজিটাল অর্থনীতি যত বিস্তৃত হচ্ছে, সাইবার হামলার সম্ভাব্য ক্ষতিও তত বাড়ছে।