ইউএনজিএ সভাপতি হলো বাংলাদেশ

Printed Edition
ইউএনজিএ সভাপতি হলো বাংলাদেশ
ইউএনজিএ সভাপতি হলো বাংলাদেশ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতি নির্বাচনে বাংলাদেশ জয়ী হয়েছে। বাংলাদেশের প্রার্থী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাইপ্রাসের বহুপক্ষীয়বিষয়ক বিশেষ দূত ও রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেয়াস এস. কাকুরিসের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন, যার কার্যক্রম ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। ২২ সেপ্টেম্বর বিশ্বনেতাদের ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক।

গতকাল নিউ ইয়র্কে ইউএনজিএ সভাপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে জাতিসঙ্ঘের সদস্যভুক্ত ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১৯০টি দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। ইউএনজিএ সভাপতি পদে জয়ের জন্য সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হয়। গতকালের হিসাবে প্রয়োজন ছিল ৯৬ ভোট। ভোটাভুটিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান পেয়েছেন ৯৯ ভোট। আর সাইপ্রাসের আন্দ্রেয়াস এস. কাকুরিস পেয়েছেন ৯১ ভোট। অর্থাৎ আট ভোটের ব্যবধানে বাংলাদেশ জয়ী হয়েছে। এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের এই নির্বাচন থেকে ফিলিস্তিন সরে যাওয়ায় বাংলাদেশের সাথে সাইপ্রাসের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। এই সভাপতিত্বের মেয়াদ হবে এক বছর।

১৯৮৬ সালে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। খলিলুর রহমান দ্বিতীয় বারের মতো এই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পক্ষে সভাপতিত্ব করবেন।

ইউএনজিএর বর্তমান সভাপতি এবং জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন। এ সময় জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতারেজ উপস্থিত ছিলেন।

ইউএনজিএ জাতিসঙ্ঘের প্রধান নীতিনির্ধারক অঙ্গ। সব সদস্যরাষ্ট্র নিয়ে গঠিত এই পরিষদটি জাতিসঙ্ঘের সনদে অন্তর্ভুক্ত সব আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে বহুপক্ষীয় আলোচনার জন্য একটি অনন্য মঞ্চ প্রদান করে। জাতিসঙ্ঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রত্যেকটির সমান ভোটাধিকার রয়েছে। ইউএনজিএ জাতিসঙ্ঘের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যার মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশে মহাসচিব নিয়োগ, নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচন এবং জাতিসঙ্ঘের বাজেট অনুমোদন। এই পরিষদ প্রতি বছর সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নিয়মিত অধিবেশনে মিলিত হয় এবং এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী অধিবেশন চলে। এটি নির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি বা উপ-আলোচ্যসূচির মাধ্যমে বিশেষ বিষয় নিয়ে আলোচনা করে, যার ফলস্বরূপ প্রস্তাবনা (রেজুলেশন) গৃহীত হয়।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর টেকনোক্রেট কোটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে দায়িত্ব নেন আগের অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন ড. খলিলুর রহমান। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের কিছু দিনের মধ্যেই তিনি জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচনের জন্য সক্রিয় তৎপরতা শুরু করেন। সরকার গঠনের মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় খলিলুর রহমান ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) নির্বাহী কমিটির জরুরি সভায় যোগ দিতে প্রথম বিদেশ সফরে সৌদি আরব যান। এই সভার সাইডলাইনে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে ফিলিস্তিনকে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদের লড়াই থেকে সফলভাবে সরিয়ে দেয়া হয়। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী কমনওয়েলথ মন্ত্রী পর্যায়ের সভায় যোগ দিতে লন্ডন এবং ভারত মহাসাগর সম্মেলনে যোগ দিতে মরিশাস সফরের সময় সাইডলাইন বৈঠকগুলোতে তার প্রার্থিতার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। তুরস্ক সফরের মধ্য দিয়ে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর শুরু করেন, যার সাথে সাইপ্রাসের রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে। এ ছাড়া ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাসেলস এবং ইথিওপিয়া সফরের সময় দ্বিপক্ষীয় ইস্যুর পাশাপাশি খলিলুর রহমান নিজ প্রার্থিতার পক্ষে সমর্থন চেয়েছেন। ইউএনজিএর সভাপতি পদে নির্বাচনের কাজে তিনি গত মাসের মাঝামাঝি থেকেই নিউ ইয়র্ক অবস্থান করছেন। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও ইউএনজিএতে বাংলাদেশের প্রার্থিতার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের সব দূতাবাস ও হাইকমিশনকে এ জন্য কাজে লাগানো হয়েছে। ঢাকায় সব বিদেশী মিশন প্রধানদের কাছে সমর্থন চাওয়া হয়েছে।

গত ১৩ মে নিউ ইয়র্কে সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে প্রার্থীদের মধ্যে সাথে জাতিসঙ্ঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর একটি অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময় সংলাপ হয়। এতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, নির্বাচিত হলে আমি কোনো পক্ষের নই, সবার জন্য সমানভাবে গ্রহণযোগ্য একজন নিরপেক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ সভাপতি হবো। জাতিসঙ্ঘ সনদ সমুন্নত রাখা, ছোট দেশগুলোর কণ্ঠস্বর জোরদার করা এবং বৈশ্বিক মতপার্থক্যের মধ্যেও ঐকমত্য গড়ে তোলাই হবে আমার প্রধান লক্ষ্য।

এ সময় তিনি সাধারণ পরিষদের পূর্ণকালীন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পরিকল্পনার কথাও জানান। এ ব্যাপারে অ্যান্ডোরার প্রতিনিধি জানতে চেয়েছিলেন, সাধারণ পরিষদের পূর্ণকালীন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হলে তাকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে কি না। জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, পদত্যাগই একমাত্র বিকল্প নয়; বরং তিনি ছুটিতেও যেতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, পূর্ণকালীন দায়িত্ব হিসেবে এই পদটি গ্রহণের জন্য তাকে এক বছরের জন্য রেহাই দেয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন

জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার রাতে প্রধানমন্ত্রী তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া এক বার্তায় এ অভিনন্দন জানান।

অভিনন্দন বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই অর্জন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অবদান ও বিশ্বাসযোগ্যতারই প্রতিফলন। আমরা বিশ্বাস করি, তিনি গর্বের সাথে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং বহুপক্ষীয় ও অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সংযোগ, সংলাপ ও সহযোগিতা গড়ে তুলবেন। এই নতুন দায়িত্বে আমরা তার সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করি।