- মেয়াদ বৃদ্ধিতে খরচ বাড়ল ২০৫ কোটি টাকা
- দেড় বছর মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে
শুধু প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের সম্ভাব্য প্রাক্কলনে গাণিতিক যোগে ভুলের কারণে ধনুয়া থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়ল ১৯২ কোটি ১৪ লাখ টাকা। একদফা মেয়াদ বাড়ানোর পর এসে গাণিতিক ভুল চোখে পড়ে। দেড় বছর মেয়াদ বাড়ানোয় পুরো প্রকল্পের বাস্তবায়ন খরচ বাড়ল ২০৪ কোটি ৭৯ লাখ ৪৭ হাজার টাকা বা ৩২.০৭ শতাংশ। মেয়াদ আরেক দফায় ছয় মাস বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মে মাসের ১৩ তারিখে অনুমোদন পেয়েছে বলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে। সার্বিকভাবে প্রকল্পে জমি ছাড়াও, পাইপলাইন ও নদী ক্রসিং, সিডি ভ্যাট, সুদ পরিশোধ, প্রকল্পের জনবলের বেতন ও ভাতাসহ সম্মানী খাতে খরচ বেড়েছে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে এবং দেশের সামগ্রিক গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করতে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) কর্তৃক ৪২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ডুয়েল ফুয়েল (গ্যাস/এইচএসডি) কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এই কেন্দ্রটি চালু এবং সচল রাখতে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রয়োজন। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস নিরবচ্ছিন্নভাবে নিশ্চিত করতেই এই পাইপলাইন প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়। গাজীপুরের ধনুয়া স্টেশনটি বাংলাদেশের গ্যাস গ্রিডের একটি অন্যতম প্রধান হাব। সেখান থেকে উচ্চচাপে গ্যাস এনে ময়মনসিংহের বিদ্যুৎকেন্দ্রে সংযোগ দেয়ার লক্ষ্যেই এই রুটটি বেছে নেয়া হয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ ২০ ইঞ্চি ব্যাসের গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। এই পাইপলাইন চালু হলে রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিসিএল) বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে এবং উচ্চমূল্যের তরল জ্বালানির ব্যবহার কমে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জানা যায়, ২০২২ সালে অনুমোদনের সময় প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৫৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা। তখন লক্ষ্য ছিল ধনুয়া থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের মাধ্যমে ময়মনসিংহে নির্মাণাধীন কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। জুলাই ২০২২ সাল থেকে তিন বছরের জন্য জুন ২০২৫ সাল পর্যন্ত মেয়াদ ধরা হয়। পরে আবার বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত চার বছর করা হয়। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের জটিলতার কারণে প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানো হয় ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত। আর জমির সম্ভাব্যতা প্রাক্কলনে গাণিতিক যোগে ভুলের কারণে ব্যয় বাড়ে এক লাফে ১৯২ কোটি ১৪ লাখ টাকা। প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা হলো, রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) ও ডিপোজিটরি ওয়ার্ক হিসেবে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)।
খরচ বাড়ল যেসব খাতে : জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্র ও সংশোধিত ডিপিপি বলছে, ডিপিপি প্রণয়নের সময় গাজীপুর ও ময়মনসিংহ ডিসি অফিস হতে ভূমি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল খাতের সম্ভাব্য প্রাক্কলন ২০১৯-২০ সালের মৌজা রেট অনুসারে প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু বর্তমানে গাজীপুর ও ময়মনসিংহ ডিসি অফিস হতে প্রাপ্ত ভূমির চূড়ান্ত প্রাক্কলন ২০২৩-২৪ সালের মৌজা রেট অনুসরণ করে অধিগ্রহণতব্য ভূমির চূড়ান্ত প্রাক্কলন প্রদান করা হয়েছে। উল্লেখ্য ময়মনসিংহ ডিসি অফিস হতে প্রেরিত ভূমির সম্ভাব্য প্রাক্কলনে গাণিতিক যোগে ভুল ছিল। ফলশ্রুতিতে, ভূমির মূল্য বাবদ ১৯২ কোটি ১৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে।
নির্মাণকালীন সুদ খাতে ব্যয় বৃদ্ধি : প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে বাস্তবায়নের মেয়াদ জুলাই, ২০২২ থেকে জুন ২০২৫ এর পরিবর্তে জুলাই ২০২২ থেকে জুন, ২০২৬ পর্যন্ত অর্থাৎ এক বছর মেয়াদ বর্ধিতকরণের প্রস্তাব গত ২৩.০৭.২০২৫ তারিখে বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। এ ছাড়া গত ৩০.১২.২০২৫ তারিখে পিইসি সভায় প্রকল্পের মেয়াদ আরো ছয় মাস বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ দেড় বছর বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্মাণকালীন সুদ খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকল্পের নির্মাণকালীন সুদ বৃদ্ধির পরিমাণ ১১ কোটি ১৯ লাখ ৬৯ হাজার টাকা বেড়েছে।
সিডি ভ্যাট অঙ্গের ব্যয় বৃদ্ধি : মার্কিন ডলারের বিনিময় হার মূল ডিপিপিতে ৮৬.২০ টাকা বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে, বর্তমানে প্রস্তাবিত প্রথম সংশোধিত ডিপিপিতে মার্কিন ডলারের বিনিময়ের ক্ষেত্রে হালনাগাদ হার ১২২ টাকা বিবেচনা করা হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদিত ডিপিপিতে সিডি-অ্যাট খাতে ৬৫ কোটি চার লাখ টাকা সংস্থান ছিল। ডিপিপিতে প্রকৌশল মালামাল খাতে প্রাক্কলনের ওপর ৩৯.৩০ শতাংশ হারে সিডি ভ্যাট নির্ধারিত ছিল। কিন্তু কাস্টমস কর্তৃপক্ষ মালামালের ঘোষিত ইনভয়েস মূল্যের পরিবর্তে কাস্টম হাউজের তিন মাসের ডাটাবেজ অনুযায়ী নির্ধারিত হারে শুল্কায়ন করায় সিডি-ভ্যাটের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। ফলে, সিডি ভ্যাট খাতে ১৬ কোটি পাঁচ লাখ টাকা বৃদ্ধি পাবে।
পাইপলাইন নির্মাণ ও নদী ক্রসিং অঙ্গের ব্যয় বৃদ্ধি : প্রকল্প অনুমোদিত ডিপিপিতে পাইপলাইন নির্মাণ খাতে ৫১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা সংস্থান রয়েছে। জ্বালানি তেল, ঈড়হংঁসধনষব (ঊষবপঃৎড়ফব. ঈষবধহরহম চরম বঃপ.), মার্কিন ডলারের বিনিময় হার, মালামাল ও যন্ত্রপাতির মূল্য ভাড়া, শ্রমিকের মজুরি ইত্যাদি বৃদ্ধির কারণে পাইপলাইন নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ওই খাতে ২৩.৫২ কোটি টাকা বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া, এইচডিডি পদ্ধতিতে নদী ক্রসিং খাতে ১৬.৮২ কোটি টাকা সংস্থান রয়েছে। কিন্তু মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে ওই নদী ক্রসিং খাতে ১৮ লাখ টাকা বৃদ্ধি পাবে। ফলে পাইপলাইন নির্মাণ ও নদী ক্রসিং খাতে ২৩.৭০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পাবে।
পর্যবেক্ষণ তথ্য যা বলছে : প্রকল্প পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ১৯ জুলাই ২০২২ সালে। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী এটি এর আগেই শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে বাস্তবায়ন মেয়াদ বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি শুধু একটি পাইপলাইন নির্মাণ উদ্যোগ নয়; এটি ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। কারণ ময়মনসিংহে আরপিসিএলের ৩৬০ মেগাওয়াট ডুয়েল-ফুয়েল কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পও বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। যার সফল পরিচালনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ অপরিহার্য।
অর্থনীতিবিদ ও পরিকল্পনা কমিশনের মত: অর্থনীতিবিদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পর্যাপ্ত গ্যাসের জোগান নিশ্চিত করা। দেশে গ্যাস উৎপাদন ক্রমাগত কমছে এবং বিদ্যুৎ খাত, শিল্প খাত ও সার কারখানাগুলোর মধ্যে গ্যাস বণ্টন নিয়ে চাপ বাড়ছে। ফলে পাইপলাইন নির্মাণ শেষ হলেও গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।



