লবণ উৎপাদনে ধস, নীতিমালা বাস্তবায়ন : মূল্য নির্ধারণ দাবি

Printed Edition
মাঠে উৎপাদিত লবণের স্তূপ : নয়া দিগন্ত
মাঠে উৎপাদিত লবণের স্তূপ : নয়া দিগন্ত

এস এম রহমান পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)

দেশের একমাত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ লবণ শিল্প বর্তমানে গভীর সঙ্কটে পড়েছে। জাতীয় লবণ নীতিমালা-২০২২ পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়া, উৎপাদিত লবণের সরকারি পাইকারি মূল্য নির্ধারণের অভাব এবং শিল্পকারখানার প্রয়োজনে বিদেশ থেকে লবণ আমদানিতে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় এ শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চলতি মৌসুমের উৎপাদনে। মৌসুম শুরুর ৩০ দিনে মাঠে লবণ উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৯৯৫ মেট্রিকটন, যা গত মৌসুমের একই সময়ের তুলনায় অত্যন্ত কম।

বিসিক সূত্রে জানা যায়, গত মৌসুমে (২০২৪-২৫) ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত লবণ উৎপাদন হয়েছিল ১২ হাজার ৮৬৩ মেট্রিকটন। অর্থাৎ চলতি মৌসুমে উৎপাদন কমেছে ১২ গুণেরও বেশি। অথচ চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে সরকার ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ মৌসুমে প্রথম লবণ উৎপাদন হয় ১২ নভেম্বর, তাও মাত্র ৩০ মণ।

বিসিক লবণ প্রকল্পের জেনারেল ম্যানেজার জাফর ইকবাল ভূঁইয়া জানান, ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছিল ১১১ মেট্রিক টন। সব মিলিয়ে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট উৎপাদন দাঁড়ায় ৯৯৫ মেট্রিক টনে। তিনি আরো জানান, বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে লবণের পাইকারি দাম প্রতি মণ ২২৫ টাকা। অন্যদিকে লবণ চাষিরা বলছেন, চলতি মৌসুমে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মাঠপর্যায়ে প্রকারভেদে প্রতি মণ লবণ উৎপাদনে খরচ পড়ছে গড়ে ৩০০ টাকার বেশি। অথচ বাজারে তারা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। যে কারণে উৎপাদিত লবণ বিক্রি করে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এ কারণে অনেক চাষি মাঠে লবণ উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন। চাষিদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই তারা মাঠে উৎপাদিত লবণের সরকারি পাইকারি বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু এখনো সে দাবি বাস্তবায়ন হয়নি। গত মৌসুমে প্রায় তিন লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন লবণের ঘাটতি নিয়ে মৌসুম শেষ হলেও সারা বছর লবণের দাম কম ছিল। চাহিদার তুলনায় ঘাটতি থাকলেও লবণের পাইকারি মূল্য না বাড়ায় চাষিরা প্রতি মণে ৭০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনেছেন।

এদিকে উৎপাদন ঘাটতির পরও মাঠপর্যায়ে প্রায় দুই লাখ মেট্রিক টন এবং মিলারদের কাছে আরো দেড় লাখ মেট্রিক টন লবণ মজুদ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, উৎপাদন কম হলেও এত বিপুল পরিমাণ লবণ মজুদ এলো কোথা থেকে?

লবণ মিল মালিক সমিতির নেতারা দাবি করেন, জাতীয় লবণ নীতিমালা-২০২২ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন না হওয়া এবং মিস ডিক্লারেশনের মাধ্যমে অতিরিক্ত সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানির কারণেই এ সঙ্কট তৈরি হয়েছে। শিল্পকারখানার প্রয়োজনে যে পরিমাণ সোডিয়াম সালফেট ও সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানির অনুমতি দেয়া হয়, তা তরল বা রঙিন ফরম্যাটে বাধ্যতামূলকভাবে আনার প্রস্তাব দেন তারা, যাতে তা বাজারজাত করা কঠিন হয়। জানা গেছে, দেশে শিল্পকারখানায় বছরে পাঁচ থেকে ছয় লাখ মেট্রিক টন সোডিয়াম সালফেটের প্রয়োজন হয়, যা দেশে উৎপাদিত হয় না। পাশাপাশি সোডিয়াম ক্লোরাইডও বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এই সুযোগে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি করে তা বাজারে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিসিক সূত্রে জানা যায়, গত ২০২৪-২৫ মৌসুমে ২৬ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছিল ২২ লাখ ৫১ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন। সে সময় চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, পটিয়া এবং কক্সবাজার জেলায় ৬৩ হাজার ১৯৮ একর জমিতে ৪১ হাজার ৩৫৫ জন চাষি লবণ চাষে যুক্ত ছিলেন।

এদিকে সরকার প্রায় এক লাখ মেট্রিক টন লবণ বিদেশ থেকে আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নীতিমালা বাস্তবায়ন ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে দেশের লবণ শিল্প আরো সঙ্কটে পড়বে।