শেখ হাসিনাকে রক্ষায় দিল্লির চেষ্টা ঢাকাকে চীনের দিকে ঠেলে দেবে

অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান

শেখ হাসিনার ঢাকায় ফেরার সাম্প্রতিক প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের জন্য অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, তবে এর আরো ব্যাপক পরিণতি ভারতের জন্যও রয়েছে। দিল্লি যখন ঢাকার সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে, তখন ভারতে হাসিনার অব্যাহত উপস্থিতিকে বাংলাদেশে ভারত ও চীনের প্রভাব বিস্তারের বৃহত্তর প্রতিযোগিতা থেকে আলাদা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

কূটনৈতিক প্রতিবেদক
Printed Edition

অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্য লোয়ি ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ঢাকায় ফেরার সাম্প্রতিক প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের জন্য অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, তবে এর আরো ব্যাপক পরিণতি ভারতের জন্যও রয়েছে। দিল্লি যখন ঢাকার সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে, তখন ভারতে হাসিনার অব্যাহত উপস্থিতিকে বাংলাদেশে ভারত ও চীনের প্রভাব বিস্তারের বৃহত্তর প্রতিযোগিতা থেকে আলাদা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যখন নতুন করে সাজানো হচ্ছে, তখন বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক প্রসারিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরের জন্য চীনকে বেছে নেন। তিনি অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীনের সমর্থন চাইতে জুনে রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সাথে সাক্ষাৎ করেন। বেইজিংয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, ‘অধিকাংশ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়ে উভয় দেশের দৃষ্টিভঙ্গি একই রকম’। এ কারণে হাসিনার প্রত্যাবর্তন কেবল একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পদক্ষেপের চেয়েও বেশি কিছু। এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক প্রতিবেশীর সাথে ভারতের সম্পর্কের আরেকটি পরীক্ষা। দিল্লিকে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হাসিনাকে আশ্রয় দেয়া অব্যাহত রাখলে তা সাবেক মিত্রের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করবে, কিন্তু এতে তারেক রহমান সরকারের সাথে অবিশ্বাস আরো গভীর হওয়ার এবং বাংলাদেশকে বেইজিংয়ের আরো কাছে ঠেলে দেয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

এতে বলা হয়েছে, গত ৩০ বছরের মধ্যে প্রায় ২০ বছর শাসন করার পর ছাত্র- নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাত হলে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। গণ-অভ্যুত্থানে তার সরকারের সহিংস দমনপীড়নের দায়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে মৃতুদণ্ড দেয়। জাতিসঙ্ঘের এক তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় এক হাজার ৪০০ জন নিহত হন, যাদের সিংহভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে মারা যান। হাসিনা এই অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে ‘ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া’-তে ভার্চুয়ালি উপস্থিত হয়ে বাংলাদেশের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী জানান, তিনি ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরতে চান।

ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক উন্নত করার জন্য ভারত কাজ করে আসছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। তারেক রহমানের কর্তৃত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে হাসিনার প্রত্যাবর্তন দেশটির জন্য চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ঢাকা বারবার ভারত থেকে হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়েছে। দিল্লি তাতে সায় দেয়নি। ফলে ভারতে হাসিনার উপস্থিতি দুই প্রতিবেশীর মধ্যে উত্তেজনার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করেছে। অনুষ্ঠানটি হতে দেয়ায় বাংলাদেশ সরকার ক্ষুব্ধ হয়েছে। অন্য দিকে ভারতীয় কর্মকর্তারা বলেছেন যে সরকার এই ব্যক্তিগত আয়োজনে জড়িত ছিল না। এর পরে বাংলাদেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়।

এতে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরে হাসিনা সত্যিই ফিরবেন কি না, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর এর প্রভাবের চেয়ে বরং ভারতে তার উপস্থিতি কিসের প্রতিনিধিত্ব করে, তার ওপরই বেশি নির্ভর করতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের অমীমাংসিত উত্তরাধিকার এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের উপস্থিতি নিয়ে ঢাকার দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ রয়েছে।