বিশেষ সংবাদদাতা
- চীনের সাথে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে বড় চুক্তি সই হতে যাচ্ছে : চিফ হুইপ
- এই ক্ষেত্রে পাকিস্তানের কাছ থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়ার আছে : সিপিডি
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলমান চীন সফরে সোলার (সৌরবিদ্যুৎ) খাতের উন্নয়নে চীনের সাথে একটি বড় ধরনের চুক্তি সই হতে যাচ্ছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে চায়না আছেন। এখনো ডিসিশন হয়নি। আপনারা দেখবেন বড় চুক্তি হবে আমাদের সোলার ব্যাপারটা নিয়ে। সিপিডি বলছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরে বাংলাদেশকে পথ পাড়ি দিতে হবে। এই জায়গায় আমাদের মনে হয় পাকিস্তানের কাছ থেকে শিক্ষা নেয়ার আছে।
রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই কথা বলেন চিফ হুইপ। ‘পাকিস্তানে সৌর বিপ্লব : জাতীয় বাজেটের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়’ শীর্ষক এই সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। অনুষ্ঠানে দু’টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে ‘পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের গণজোয়ার : এর পরে কী এবং কারা অনুসরণ করছে?’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন পাকিস্তানের পরিবেশবান্ধব জ্বালানি সংস্থা ‘রিনিউয়েবলস ফার্স্ট’-এর প্রধান কর্মসূচি ও উদ্যোগ বিশেষজ্ঞ ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ বাসিত গৌরী।
চিফ হুইপ বলেন, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে এগিয়ে নিতে বিএনপি সরকার সব ধরনের সহযোগিতা করতে চায়। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কোনো সংসদ সদস্য যদি এ প্রসঙ্গে কথা বলতে চান, চিফ হুইপের জায়গা থেকে তিনি সহযোগিতা করবেন। তিনি বলেন, দেশে টেকসই ও সাশ্রয়ী বিদ্যুতের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি (রিনিউয়েবল এনার্জি) খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। একটি ‘ওয়েলফেয়ার স্টেট’ বা কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি তৈরিতে এই খাতকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।
মনি বলেন, সরকার ইতোমধ্যেই সব সরকারি ভবনের ছাদ (রুফটপ) ও শিল্পকারখানাগুলোকে সোলার সিস্টেমের আওতায় আনার টার্গেট নিয়েছে। এসবের পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকার সাধারণ মানুষের উপকারে এবং সেচ প্রজেক্টের খরচ কমাতে সব ধরনের পাওয়ার পাম্প ও টিউবওয়েলকে সোলার সিস্টেমে রূপান্তরের উদ্যোগও নিয়েছে সরকার।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, পাকিস্তানে সৌর বিপ্লব চলছে এবং তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারও জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় জীবাশ্ম জ্বালানির বাইরে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দেয়ার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ইতিবাচক উদ্যোগ। তিনি বলেন, এবারের বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিভিন্ন ধরনের কর ও রাজস্ব সুবিধা দেয়া হয়েছে। শুধু বিদ্যুৎ খাত নয়, বিদ্যুতায়িত অন্যান্য খাত, বৈদ্যুতিক যান (ইভি) এবং ব্যাটারি শিল্পের জন্যও প্রণোদনা রাখা হয়েছে। তবে কৃষি খাতে আরো বেশি মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন ছিল।
মোয়াজ্জেম বলেন, পাকিস্তান দেখিয়েছে কিভাবে একটি সঙ্কটকে সম্ভাবনায় রূপ দেয়া যায়। অল্প সময়ের মধ্যে দেশটিতে রুফটপ সোলারের বিস্তার ঘটেছে। বর্তমানে পাকিস্তানের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪১ শতাংশ আসে জীবাশ্ম জ্বালানির বাইরে থেকে। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ জলবিদ্যুৎ, ৯ শতাংশ পারমাণবিক এবং ৭ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদিত হচ্ছে।
মুহাম্মদ বাসিত গৌরী উপস্থাপনায় বলেন, পাকিস্তানের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে এই রূপান্তর মূলত জাতীয় গ্রিডের বাইরে নিজস্ব উদ্যোগে হয়েছে। এই পরিবর্তন কোনো নির্দিষ্ট খাতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বলেন, শহর ও গ্রামে বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় আবাসিক, শিল্প ও কৃষি খাতে এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। এই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করেছে দেশটিতে অতিরিক্ত বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে শুল্কমুক্ত সুবিধা ও সরকারি সহযোগিতা।
পাকিস্তানে এই খাতে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে উল্লেখ করে বাসিত গৌরী বলেন, এ অর্থ আইএমএফের ঋণের প্রায় দ্বিগুণ। বাংলাদেশের সাথে বড় পার্থক্য হলো এই টাকার বেশির ভাগই ব্যাংক থেকে আসেনি, পাকিস্তানের মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ মানুষ সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে (সেলফ ফিন্যান্স) এই বিনিয়োগ করেছেন। এর ফলে সেখানে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তার মতে, উচ্চ কর, অর্থায়নের সঙ্কট এবং নীতিগত জটিলতা এ রূপান্তরের পথে বড় বাধা।
বাসিত জানান, ২০২৫ অর্থবছরে পাকিস্তানে সৌর প্যানেল আমদানি ১৭ দশমিক ৯ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে, যা দেশটির মোট ইউটিলিটি-স্কেল গ্রিড সক্ষমতার চেয়েও বেশি। বর্তমানে দেশটিতে আনুমানিক ২৮ থেকে ৩৮ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপিত হয়েছে, যার প্রায় ৯৮ শতাংশই বিতরণ পর্যায়ে।
সিপিডির গবেষণা সহযোগী আতিকুজ্জামান সাজিদ তার উপস্থাপনায় বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে আমরা সচরাচর ৪ থেকে ৫ শতাংশ তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও গত এক থেকে দুই বছরে দেশে “নেট মিটারিং” ব্যবস্থায় ৩০০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। পরিমাণের দিক থেকে ছোট হলেও অত্যন্ত নীরবে এটি শিল্পকারখানা ও আবাসিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের বড় পার্থক্য হলো অর্থায়নের মানসিকতায়। আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে সোলার করার আগ্রহ কম। আমরা সব সময় ব্যাংক নির্ভর, কিন্তু পাকিস্তানে এটি মূলত নিজস্ব অর্থায়নে হয়েছে, যা থেকে আমাদের শেখার আছে।
বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের চেয়ে বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম কম। তাই গ্রাহক সস্তায় বিদ্যুৎ পাওয়ায় সোলার পদ্ধতিতে আগ্রহী হচ্ছে না। তিনি বলেন, পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশে সূর্যের আলো প্রায় ৫০ শতাংশ কম থাকায় এখানে সোলার উৎপাদন খরচ বেশি হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে বিপিডিবি বিপুল ঋণের মুখে রয়েছে। শুধু অন্যের সাফল্য দেখে ঝাঁপ না দিয়ে বাস্তবমুখী পলিসি ও বিদ্যুতের দামের যৌক্তিকীকরণ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, দেশে জ্বালানি আমদানিতে প্রতি বছর প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কটের মূল কারণ। তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারির ওপর থেকে সবার জন্য শুল্ক ও ট্যাক্স পুরোপুরি প্রত্যাহার করলে মানুষ নিজ উদ্যোগেই সোলার ব্যবহারে আগ্রহী হবে। তিনি আরো বলেন, গ্রিডের ক্ষতি না করেই ২০ শতাংশ পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করা সম্ভব, যা আমদানিনির্ভরতা কমাবে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সদস্য আশরাফুল আলম বলেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানির ওপর শুল্ক বৈষম্য দূর করতে সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। বর্তমানে ব্যাটারিতে শুল্ক ৬২ থেকে ৬৭ শতাংশ এবং সাধারণ আমদানিকারকদের জন্য সোলার প্যানেলে ২৯ শতাংশ, যা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে এনবিআরের সাথে আলোচনা চলছে। নতুন ট্যারিফ আগামী মাসেই প্রজ্ঞাপন (এসআরও) আকারে আসতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।



