দৌলতপুরে ‘সাদা সোনা’ চাষে বদলেছে কৃষকের ভাগ্য

আহাদ আলী নয়ন, দৌলতপুর (কুষ্টিয়া)
Printed Edition

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় তুলা চাষ এখন শুধু একটি ফসল নয়- এটি হয়ে উঠেছে শত শত কৃষক পরিবারের ভাগ্য বদলের প্রধান হাতিয়ার। সীমান্তঘেঁষা আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের ধর্মদহ গ্রামে মাঠের পর মাঠজুড়ে সাদা তুলার দৃশ্য এখন দৌলতপুরের অর্থনীতির নতুন পরিচয়। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের কারিগরি সহায়তা, ভালো বাজারদর ও লাভজনক উৎপাদনের ফলে এ অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকেরা ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মধ্যে কুষ্টিয়া জেলায় সর্বাধিক তুলা চাষ হয়। তবে এ জেলার মধ্যে দৌলতপুর উপজেলা তুলা উৎপাদনে শীর্ষে এবং এর ভেতরে আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের ধর্মদহ গ্রাম দেশসেরা তুলা চাষ এলাকা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর জেলা নিয়ে গঠিত কুষ্টিয়া তুলা উন্নয়ন জোনে চলতি মৌসুমে প্রায় চার হাজার ৮৯৫ হেক্টর জমিতে তুলার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে দৌলতপুর উপজেলাতেই দুই হাজার ৪৩৪ হেক্টর জমিতে তুলা চাষ হয়েছে, যা জোনের মোট আবাদি জমির প্রায় অর্ধেক।

কুষ্টিয়া তুলা উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে দৌলতপুর উপজেলায় দুই হাজার ৫০ জন তুলা চাষিকে সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনা হয়েছে। বীজ, সার, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে তাদেরকে তুলা আবাদে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। এখানে মূলত হাইব্রিড জাতের তুলা- হোয়াইট গোল্ড-১ ও ২, রূপালী-১, ডিএম-৪ সহ বোর্ডের নিজস্ব সিবি হাইব্রিড ও দেশী উফসি জাতের তুলা চাষ করা হয়। প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে তিন হাজার থেকে তিন হাজার ২০০টি গাছ রোপণ করা যায় এবং সঠিক পরিচর্যায় বিঘাপ্রতি ১৫ মন থেকে ১৬ মন তুলা উৎপাদন করা সম্ভব হয়।

তুলা একটি দীর্ঘমেয়াদি ফসল। সাধারণত জুলাই-আগস্টে বীজ রোপণ করা হয় এবং ডিসেম্বরের শেষ থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তুলা সংগ্রহ চলে। সরকার নির্ধারিত মূল্যে স্থানীয় প্রাইভেট জিনিং মিল মালিক সমিতির প্রতিনিধিদের মাধ্যমে কৃষকেরা সরাসরি তুলা বিক্রি করতে পারেন। বর্তমানে প্রতি মন তুলা প্রায় চার হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি তুলা চাষে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, আগাছা পরিষ্কার ও তুলা উত্তোলনে শ্রমিকের ব্যয় বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই তুলা বিক্রি করতে হয়। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজার না থাকায় দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। কৃষকদের দাবি, বাজারে একাধিক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান থাকলে তারা আরো বেশি লাভবান হতে পারতেন।

ধর্মদহ গ্রামের তুলা চাষি লাভলু জানান, বিঘাপ্রতি ২০ হাজার থেকে ২২ হাজার টাকা খরচ হলেও ভালো ফলন হলে ৭৫ হাজার টাকা থেকে ৮০ হাজার টাকার তুলা বিক্রি করা যায়। যা অন্যান্য ফসলের তুলনায় বেশি লাভজনক। আদাবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও তুলা চাষি মো: রুস্তম আলী বলেন, প্রশাসন যদি আধুনিক হারভেস্টার ও আগাছা দমন যন্ত্রের প্রণোদনা দেয়, তাহলে উৎপাদন খরচ কিছুটা কমে আসত এবং ফলনও বাড়ত। কুষ্টিয়া তুলা উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা শেখ আল মামুন বলেন, দৌলতপুর উপজেলার ধর্মদহসহ আশপাশের গ্রামে দুই হাজারের বেশি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে তুলা চাষের সাথে যুক্ত। নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার মাধ্যমে কৃষকদের সহযোগিতা করা হচ্ছে।

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উপপরিচালক মো: কুতুব উদ্দীন জানান, বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তুলা আমদানিকারক দেশ। বিদেশী নির্ভরতা কমাতে দেশে তুলা উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। চলতি মৌসুমে সারা দেশে ১৮ কোটি টাকার প্রণোদনা দেয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের আশা, শুধু দৌলতপুর উপজেলা থেকেই চলতি মৌসুমে প্রায় ১০০ কোটি টাকার তুলা উৎপাদন হবে, যা দেশের বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল জোগান ও কৃষকের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে।