- ৪০ হাজার খুচরা বিক্রেতা বাদ, ইউনিয়নে ডিলার তিনজন
- সংশোধিত নীতিমালা জারির এক সপ্তাহ আগে নতুন ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি নিয়ে প্রশ্ন
কৃষকের কাছে সার সরবরাহে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন নীতিমালা করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এতে একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির নামে সার ডিলারশিপ রাখার সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে। একই সাথে সার বিক্রির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের খুচরা বিক্রেতা ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে ডিলারের অধীনে বিক্রয় প্রতিনিধি নিয়োগের বিধান করা হয়েছে। ইউনিয়ন ও পৌরসভায় ডিলারের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। তবে পুরনো ডিলারশিপ বাতিল না করে নতুন ডিলার নিয়োগ এবং চলতি সার মৌসুমে হঠাৎ এ পরিবর্তন কার্যকর করায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার ডিলার সংরক্ষণ সংক্রান্ত নীতিমালা ২০২৫ (সংশোধিত)’ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে গত ৯ আগস্ট প্রজ্ঞাপন জারি করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অনুবিভাগ। একই দিনে সংশোধিত নীতিমালাটি অনুমোদন করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সার বিতরণে দীর্ঘদিন ধরে বিসিআইসি ও বিএডিসির পৃথক ব্যবস্থাপনা, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার একাধিক স্তর এবং একই পরিবারের একাধিক ডিলারশিপ নিয়ে নানা অভিযোগ ছিল। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে এসব সমস্যা দূর করার কথা বলা হলেও বাস্তবায়নের আগে বিদ্যমান ডিলারশিপের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, তা স্পষ্ট নয়।
এক নীতিমালার আওতায় সার বিতরণ
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী এখন থেকে একক নীতিমালার আওতায় সার বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় নির্ধারিত ডিলার ইউনিটের মাধ্যমে সার বিক্রি করা হবে।
প্রতিটি ইউনিয়নে তিনটি করে ডিলার ইউনিট থাকবে। পৌরসভাতেও থাকবে তিনটি ডিলার ইউনিট। আর সিটি করপোরেশন এলাকায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সুপারিশের ভিত্তিতে সার ডিলার সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি প্রয়োজনীয়সংখ্যক ডিলার ইউনিট নির্ধারণ করবে।
নীতিমালায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো- একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি সার ডিলারশিপের লাইসেন্সধারী হতে পারবেন না। এর ফলে একই পরিবারের মধ্যে ডিলারশিপ কেন্দ্রীভূত হওয়ার সুযোগ কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৪০ হাজার খুচরা বিক্রেতার ভবিষ্যৎ কী?
বর্তমানে সারা দেশে বিসিআইসি ও বিএডিসির তালিকাভুক্ত প্রায় ১১ হাজার ডিলারের অধীনে ৪০ হাজারের বেশি খুচরা বিক্রেতা বিভিন্ন ধরনের সার বিক্রি করে আসছেন।
নতুন নীতিমালায় অনিয়ন্ত্রিত সার ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা ব্যবস্থা রহিত করার কথা বলা হয়েছে। এর পরিবর্তে ডিলারের অধীনে বিক্রয় প্রতিনিধি রাখার বিধান করা হয়েছে। এসব বিক্রয় প্রতিনিধি মনোনয়ন করবেন সংশ্লিষ্ট ডিলার।
নীতিমালার এই পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এতদিন গ্রামের বাজার ও প্রত্যন্ত এলাকায় কৃষকদের কাছে সার পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের বাদ দিয়ে নতুন ব্যবস্থায় সার সরবরাহ কিভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা বাস্তবায়নের সময়ই স্পষ্ট হবে।
নতুন নীতিমালায় একই পরিবারের একাধিক ডিলারশিপের সুযোগ বন্ধ করা হলেও বর্তমানে যেসব পরিবারে একাধিক ডিলারশিপ রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে- এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সার দেশে এখনো অনেক পরিবারে একাধিক ডিলারশিপ রয়েছে। এসব ডিলারশিপ বাতিল না করে অতীতে পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নে স্থানান্তরের সুযোগ দেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা জারি করা হয়। নীতিমালা জারির পর থেকেই ডিলাররা বিভিন্ন বিষয়ে সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় এবার সংশোধিত নীতিমালা জারি করা হলো।
আগের নীতিমালা প্রণয়নের সময় কৃষি মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, নীতিমালা জারির আগেই একই পরিবারের একাধিক ডিলারশিপ লাইসেন্স বাতিল করা হবে। কিন্তু খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বাস্তবে ব্যাপকভাবে তা করা হয়নি।
তাদের দাবি, কিছু ডিলারশিপ বাতিল করে নতুন ডিলার নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছিল। আগে যেখানে একটি ইউনিয়নে একজন ডিলার ছিলেন, নতুন ব্যবস্থায় সেখানে তিনজন ডিলার নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে।
ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়েও খাতসংশ্লিষ্টদের আপত্তি রয়েছে। চলতি বছর পুরনো নীতিমালার আওতায় সারা দেশ থেকে ডিলারশিপের আবেদন নেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। এসব আবেদন চূড়ান্ত হওয়ার আগেই চলতি মাসের ২ আগস্ট নতুন করে ডিলারশিপের আবেদন চেয়ে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়।
অর্থাৎ সংশোধিত নীতিমালা জারির মাত্র এক সপ্তাহ আগে নতুন নীতিমালার আওতায় ডিলার নিয়োগের আবেদন চাওয়া হয়। ফলে কোন নীতিমালার ভিত্তিতে আগের আবেদন যাচাই হবে এবং নতুন আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- একই পরিবারের একাধিক ডিলারশিপ বন্ধের বিধান থাকলেও বিদ্যমান ডিলারশিপগুলো যাচাই বা বাতিলের বিষয়ে এখনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘মৌসুমের মধ্যে অরাজকতা সৃষ্টি হতে পারে’
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন নতুন নীতিমালা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, আগে একটি ইউনিয়নে একজন ডিলার ছিলেন। এখন সেখানে তিনজন ডিলার থাকবেন। তাদের সাথে ছয়জন বিক্রয় প্রতিনিধি থাকবেন। গুদাম থাকবে, কর্মচারী বাড়বে। অথচ বিক্রি কমবে। এ অবস্থায় পুরনো কমিশনে ডিলাররা কিভাবে ব্যবসা করবেন?
মোশাররফ হোসেন বলেন, মৌসুমের মধ্যে এ ধরনের সিদ্ধান্ত অরাজকতা সৃষ্টি করতে পারে। এর প্রভাব সার সরবরাহের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সরবরাহ পরিস্থিতিতে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আগেই সরকারের সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
তার মতে আগামী মাস পর্যন্ত কৃষিতে পিক সিজন। অন্তত এই সময় পর্যন্ত স্যারের ডিলারশিপ নিয়ে নতুন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না সরকারের। যদি নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে হয় তাহলে সবার সাথে পরামর্শ করে আগানো উচিত।
এক পরিবারের একাধিক ডিলারশিপ বাতিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার চাইলে এটি করতে পারে। তবে একটি গোছানো পদ্ধতিতে করতে হবে।
অনিয়মে ডিলারশিপ বাতিল না করেও পার
ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, বেশি দামে সার বিক্রি, এক স্থানের বরাদ্দ অন্য স্থানে সরিয়ে নেয়া, নির্ধারিত সময়ে সার উত্তোলন না করাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ডিলারশিপ বাতিল না করে শুধু জরিমানা করেই দায় শেষ করা হয়।
তাদের মতে, সার বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে শুধু নতুন ডিলার নিয়োগ করলেই হবে না। অনিয়মকারী ডিলারদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সংসদেও উঠেছিল পুরনো ডিলারদের আধিপত্যের অভিযোগ
সার ডিলার নিয়োগের বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচনায় এসেছে। চিফ হুইপ মো: নুরুল ইসলাম মনি সংসদে অভিযোগ করেন, আগের সরকারগুলোর সময়ে নিয়োগ পাওয়া ডিলারদের আধিপত্য এখনো বহাল রয়েছে।
তিনি বলেন, অনেক ডিলার ইচ্ছাকৃতভাবে সার উত্তোলন করেননি। এতে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে এবং কৃষকদের কাছে সার সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। তিনি বিদ্যমান ডিলারশিপ বাতিল করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নতুন ডিলার নিয়োগের দাবি জানান।
তার বক্তব্য সংসদ সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন পায়। বিভিন্ন দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে এতে সমর্থন জানান। জবাবে প্রধানমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করেন, সার বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নেবে। আগের সরকারের সময়ে দেয়া ডিলারশিপ বাতিল করে দ্রুত নতুন ডিলার নিয়োগের কথাও জানান তিনি।
দেশে মোট ডিলার প্রায় ১১ হাজার
বর্তমানে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) তালিকাভুক্ত ডিলার রয়েছেন প্রায় ৫ হাজার ৮০০ জন। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) তালিকাভুক্ত ডিলারের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার ২০০। সব মিলিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্ত ডিলার প্রায় ১১ হাজার। তাদের অধীনে কাজ করছেন ৪০ হাজারের বেশি খুচরা বিক্রেতা।
নতুন নীতিমালায় এই বিশাল খুচরা বিক্রেতা কাঠামো বাদ দিয়ে ডিলারের অধীনে বিক্রয় প্রতিনিধি চালুর ফলে সার বিপণন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে।



