নিজস্ব প্রতিবেদক
সুন্নাহ থেকে সরে যাওয়াই মুসলিম উম্মাহর বর্তমান বিপর্যয়, অবক্ষয় ও লাঞ্ছনার মূল কারণ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা:-এর আদর্শ অনুসরণ করলেই মানবতার কল্যাণ সম্ভব। সিরাতচর্চা কেবল পুরস্কার বা সনদ পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজিত জাতীয় সিরাত পাঠ প্রতিযোগিতা ‘রোড টু সিরাহ’২৬’-এর চূড়ান্ত পরীক্ষা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ সা:-কে সমগ্র বিশ্বজাহান ও সৃষ্টির জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। জীবনের যে ক্ষেত্রেই দিকনির্দেশনা প্রয়োজন হোক না কেন, মুহাম্মদ সা:-এর জীবনই অনুসরণীয় আদর্শ।
তিনি বলেন, অতীতে যারা রাসূলুল্লাহ সা:-এর আদর্শ ধারণ করেছে, তারা সম্মানিত হয়েছে এবং পৃথিবীর নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে মুসলিম উম্মাহর বিপর্যয়ের মূল কারণ আল্লাহর দেয়া বিধান ও রাসূল সা:-এর দেখানো পথ থেকে সরে যাওয়া। এ পথ ছেড়ে দেয়ার কারণেই মুসলমানরা পরাজিত হচ্ছে এবং নিজেদের দেশেই পরবাসীতে পরিণত হয়েছে।
প্রতিযোগীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সিরাতচর্চার মাধ্যমে তাদের হৃদয় হেদায়েতের আলোয় আলোকিত হয়েছে। এ অংশগ্রহণ যেন শুধু পার্থিব পুরস্কার বা সনদ পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং এটি যেন সারা জীবনের আলোকিত পথচলার সূচনা হয় এবং অর্জিত মেধা মানবতার কল্যাণে কাজে লাগে।
সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ১০০ নম্বরের চূড়ান্ত মেধা যাচাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিকেল ৩টায় একই ভেন্যুতে সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হয়। ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিযোগিতায় তিনটি গ্রুপে মোট ১৩ হাজার ৪৫৬ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেন। এর মধ্যে ‘ক’ গ্রুপে তিন হাজার ৫৮২, ‘খ’ গ্রুপে তিন হাজার ১৯৭ এবং ‘গ’ গ্রুপে পাঁচ হাজার ২৪৩ জন। প্রথম ধাপের অনলাইন এমসিকিউ পরীক্ষার পর ‘ক’ গ্রুপের ২২১, ‘খ’ গ্রুপের ২০৮ এবং ‘গ’ গ্রুপের ২০৬ জনসহ মোট ৬৩৫ জন চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হয়। ‘ক’ গ্রুপে প্রথম হন বরিশাল বিভাগের খাদিজা তুবান শারা। তিনি ৬০ হাজার টাকা শিক্ষাবৃত্তি, বই, ক্রেস্ট ও সনদ পান। পরে ডা: শফিকুর রহমান বিশেষ ঘোষণা দিয়ে তাকে তার পিতাসহ পবিত্র ওমরাহ পালনের সুযোগ দেয়ার কথা জানান।
‘খ’ গ্রুপে প্রথম হন ঢাকা বিভাগের রঈসুল ইসলাম এবং ‘গ’ গ্রুপে প্রথম হন রাজশাহী বিভাগের আতিয়া বিলকিস তামান্না। তারা ওমরাহ পালনের সুযোগ, বই, ক্রেস্ট ও সনদ লাভ করেন।
দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারীরা হলেন-‘ক’ গ্রুপে ঢাকা বিভাগের তালহা যুবায়ের, ‘খ’ গ্রুপে ঢাকা বিভাগের মাসরাত জাহান ইফতি এবং ‘গ’ গ্রুপে ঢাকা বিভাগের শামিম আহমেদ সবুজ। তারা প্রত্যেকে ল্যাপটপ, বই, ক্রেস্ট ও সনদ পান।
তৃতীয় স্থান অর্জনকারীরা হলেন-‘ক’ গ্রুপে চট্টগ্রাম বিভাগের নাবিল বিন হোসাইন, ‘খ’ গ্রুপে ঢাকা বিভাগের হামিম আহমাদ এবং ‘গ’ গ্রুপে রাজশাহী বিভাগের মো: নীরব আলী। তারা প্রত্যেকে ২৫ হাজার টাকা শিক্ষাবৃত্তি, বই, ক্রেস্ট ও সনদ পান।
এ ছাড়া তিন গ্রুপের চতুর্থ থেকে দশম স্থান অর্জনকারীদের প্রত্যেককে ১৫ হাজার টাকা এবং একাদশ থেকে পঁচিশতম স্থান অর্জনকারীদের প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা শিক্ষাবৃত্তি, ক্রেস্ট ও সনদ দেয়া হয়। বিভাগীয় পর্যায়ে উত্তীর্ণ প্রথম পাঁচজনকেও বিশেষ শিক্ষাবৃত্তি, ক্রেস্ট ও সনদ দেয়া হয়।
বিশেষ পুরস্কার হিসেবে ‘ক’ গ্রুপে ১৯তম স্থান অর্জনকারী ময়মনসিংহ বিভাগের এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে তার পিতাসহ পবিত্র ওমরাহ পালনের সুযোগ দেয়ার ঘোষণা দেন ডা: শফিকুর রহমান।
সভাপতির বক্তব্যে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম বলেন, সিরাত পাঠের উদ্দেশ্য শুধু পুরস্কার বা সনদ অর্জন নয়; রাসূলুল্লাহ সা:-এর পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে ধারণ করা। তিনি বলেন, রাসূল সা:-এর পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা গ্রহণের মধ্যেই জাতির মুক্তি নিহিত।
নুরুল ইসলাম আরো বলেন, ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। রাসূল সা:-এর জীবনাদর্শ ধারণ করে তা সমাজের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ আল্লামা কামাল উদ্দিন জাফরী বলেন, মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহ ও তার রাসূল সা:-এর সিরাত ও দেখানো তরিকা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।
তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদিন বলেন, কুরআন ও রাসূলের জীবনাদর্শের মধ্যেই মানবজাতির দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নিহিত রয়েছে।
ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক শামছুল আলম বলেন, সিরাতচর্চা শুধু রবিউল আউয়াল মাসকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয়। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূল সা:-এর আদর্শ ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বিরোধীদলীয় হুইপ মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, রাসূলুল্লাহ সা:-এর পুরো জীবন ছিল নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের। তিনি আদর্শ পিতা, নানা, নেতা ও রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। তাই তার সামগ্রিক জীবনকেই আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-হাদিস ও ইসলামী শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, আবাবিল হজ কাফেলার চেয়ারম্যান আলহাজ আবু ইউসুফ, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদসহ বর্তমান ও সাবেক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া অভিভাবক, শিক্ষাবিদ, ওলামায়ে কেরামসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার ব্যক্তিরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।



