পাহাড়ে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোপন তৎপরতা আরাকানের

অরক্ষিত সীমান্তে ত্রিমুখী সঙ্কট

উদ্বেগের বিষয় হলো- বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পাহাড়ি যুবক ও স্থানীয় আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মির’ (এএ) পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নতুন করে ঘনীভূত হচ্ছে গভীর নিরাপত্তা সঙ্কট। গোয়েন্দা সংস্থা ও সীমান্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর সাম্প্রতিক তথ্যে এই চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। ওই সূত্র জানায়, পাহাড়ের সশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠন ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীগোষ্ঠীগুলো প্রায় সেনাবাহিনীকে লক্ষ করে গুলি করে। মূলত এসব অবৈধ অস্ত্র-গোলাবারুদ অবৈধ পথে আনার ফলে পাহাড়কে অশান্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠছে সন্ত্রাসীগোষ্ঠীগুলো।

এস এম মিন্টু
Printed Edition

  • রাখাইনে লড়ছে পাহাড়ের যুবকরা, ওপার থেকে আসছে ভারী অস্ত্র
  • প্রশিক্ষণ নিয়ে আধুনিক অস্ত্রসহ দেশে ফিরছে তরুণরা
  • পাহাড়ি যুবকদের আরাকান আর্মিতে যোগ দেয়া
  • আরাকান আর্মিতে যোগ দেয়া এবং ভারী অস্ত্র নিয়ে ফিরে আসা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি ‘রেড অ্যালার্ট’ : মেজর জে. (অব:) রোকন উদ্দিন

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর হাতছাড়া হওয়া মংডু ও বুথিডংয়ের কৌশলগতভাবে বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চল। অন্য দিকে এই সুযোগে সীমান্তের ওপার থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ঢুকছে অত্যাধুনিক ভারী অস্ত্রের চালান। মিয়ানমার সীমান্তের অরক্ষিত অংশ ও নাফ নদী ব্যবহার করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মির মাধ্যম রকেট লঞ্চার, একে-৪৭, হ্যান্ড গ্রেনেড এবং মাইনের মতো ভারী অস্ত্র পাচার হচ্ছে বলে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সূত্র জানিয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো- বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পাহাড়ি যুবক ও স্থানীয় আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মির’ (এএ) পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নতুন করে ঘনীভূত হচ্ছে গভীর নিরাপত্তা সঙ্কট। গোয়েন্দা সংস্থা ও সীমান্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর সাম্প্রতিক তথ্যে এই চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। ওই সূত্র জানায়, পাহাড়ের সশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠন ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীগোষ্ঠীগুলো প্রায় সেনাবাহিনীকে লক্ষ করে গুলি করে। মূলত এসব অবৈধ অস্ত্র-গোলাবারুদ অবৈধ পথে আনার ফলে পাহাড়কে অশান্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠছে সন্ত্রাসীগোষ্ঠীগুলো।

ওপারের রাজ্য হারিয়ে কোণঠাসা মিয়ানমার বাহিনী দীর্ঘ সঙ্ঘাতের পর রাখাইন রাজ্যের মংডু এবং বুথিডং অঞ্চলের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। আরাকান আর্মি এই অঞ্চলগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়ায় সেখানে জান্তা বাহিনী চরম কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। তবে সামরিক জান্তা ও আরাকান আর্মির এই রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাতের জেরে বাংলাদেশ সীমান্তে সৃষ্টি হয়েছে এক জটিল ভূরাজনৈতিক শূন্যতা। এই শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র এবং অস্ত্র চোরাকারবারিরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

পার্বত্য যুবকদের রাখাইন যাত্রা ও অস্ত্রের অনুপ্রবেশ অনুসন্ধানে জানা গেছে, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম, রুমা এবং থানচির দুর্গম সীমান্ত পথ ব্যবহার করে পাহাড়ি তরুণদের একটি অংশ রাখাইনে প্রবেশ করছে। সেখানে জাতিগত ও আদর্শিক সমীকরণের দোহাই দিয়ে তাদের আরাকান আর্মির ক্যাম্পে যুক্ত করা হচ্ছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই যুবকেরা সেখানে ভারী অস্ত্র চালনা এবং আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বিষয় হলো- প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধ শেষে এই তরুণরা অত্যাধুনিক ও ভারী আগ্নেয়াস্ত্রসহ পুনরায় বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে ফিরে আসছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

পার্শ্ববর্তী দেশের গোপন তৎপরতা ও সীমান্তবর্তী একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, শুধু মিয়ানমারের ওপার থেকেই নয়, বরং পার্শ্ববর্তী দেশের সীমান্তসংলগ্ন রুটের একাংশ ব্যবহার করেও পাহাড়ে অস্ত্রের গোপন সরবরাহ আসছে। দুর্গম পাহাড়ি ট্রেইল ও নজরদারির বাইরের রুটগুলোকে ব্যবহার করে পাহাড়ে সক্রিয় আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, গ্রেনেড ও রকেট লঞ্চারের মতো ভারী অস্ত্রের মজুদ বাড়াচ্ছে। এতে করে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভেতরের শান্তিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের বিস্ফোরণের মুখে পড়তে পারে।

ত্রিমুখী সঙ্কট ও জাতীয় নিরাপত্তার সামগ্রিক ঝুঁকি

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বাংলাদেশের পাহাড়ি যুবকদের আরাকান আর্মিতে যোগ দেয়া এবং অস্ত্রসহ ফিরে আসা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি ‘রেড অ্যালার্ট’। তিনি বলেন, রাখাইন রাজ্যে জান্তাবাহিনীর পতনের পর সেখানে যে নতুন শক্তির উত্থান ঘটেছে, তা সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই সশস্ত্র যুবকেরা যখন যুদ্ধের মানসিকতা নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে ফিরবে, তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিতে পারে। আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি ও বিজিবির টহল আরো জোরদার করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞ, ড. ইমতিয়াজ আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘মংডু ও বুথিডং হাতছাড়া হওয়া মিয়ানমার জান্তার জন্য বড় ধাক্কা। কিন্তু এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। আরাকান আর্মি এখন বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা যদি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র বা জনবলের দিক থেকে মদদ দেয়, তবে তা এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিকে আরো উত্তপ্ত করবে। সরকারকে এখনই কূটনৈতিক ও কৌশলগতভাবে এই সঙ্কট মোকাবেলায় কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বর্তমান সরকারকে ভাবতে হবে রোহিঙ্গাদের বিষয়টা জটিল থেকে জটিলতর হতে যাচ্ছে। রোহিঙ্গারাও বর্তমানে ফেরার বিষয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাদের নিজেদের ভেতরে জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বাড়ছে অস্থিরতা। তাদের একটা নিশ্চয়তা না দিলে তারা তৃতীয় পক্ষের হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আরো মরিয়া হয়ে উঠবে। বাইরের যারা শক্তি আছে তারা ঘোলা পানির মধ্যে মাছ শিকার করবে। রোহিঙ্গাদের অস্ত্র দিয়ে মাদক দিয়ে ব্যবহার করবে। শুধু তাই নয়, ওই শক্তিগুলো ভেতর-বাইরেও নানা ধরনের ষড়যন্ত্রের সুযোগ নেবে।

তিনি আরো বলেন, বড় কিছু ঘটার আগেই সরকার বা রাষ্ট্রকে এখনই বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। এটা শুধু মুখে বললেই হবে না। সরকার কি করছে তা রোহিঙ্গারা দেখবে যে তাদের ফেরার একটা আলোচনা হচ্ছে। এটাও খেয়াল রাখতে হবে যে, ঘরের ভেতর এবং বাইরের অপশক্তি অনেকেই সরকারের ইতিবাচক সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে চাইবে না। এ ধরনের সঙ্কট বাড়বে। এমন একটা কাঠামো থাকা দরকার যে মিয়ানমার সরকারও রোহিঙ্গা বিষয়টা ইতিবাচক হিসেবে দেখেন।

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ আরো বলেন, সম্প্রতি চীনের কাছ থেকে প্রস্তাব এসেছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার করিডোর করার। আমার মনে হয় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়া বিষয়ে চীনের সরকার ইতিবাচক। চীনের রাষ্ট্রদূত সাংবাদিকদের বলেছিলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হতে পারে এই এই করিডোরের মাধ্যমে। আমরা যত তাড়াতাড়ি চীনের প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক করিডোরের বিষয়ে গবেষণা করতে পারি তত ভালো। গবেষণা হতে পারে, জলপথ, রেলপথ বা স্থলপথ। যে পথই হোক প্রস্তাবটা কাজে লাগানো উচিত। এই কাজ করতে চতুরদিক থেকে বাধা আসবে। করিডোরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য সম্পর্ক এবং ভূরাজনৈতিক সমস্যা সমাধানেরও সম্ভাবনা রয়েছে।

নিরাপত্তা ও সীমান্তবিষয়ক গবেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত জটিল। দুর্গম পাহাড়ের সুযোগ নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশের কিছু অংশে এবং ওপার থেকে অস্ত্রের যে গোপন তৎপরতা চলছে, তা দমনে যৌথ বাহিনীর চিরুনি অভিযান প্রয়োজন। পাহাড়ি তরুণেরা কেন উগ্রবাদে বা বিদেশী সশস্ত্র গোষ্ঠীতে ধাবিত হচ্ছে, সেই রিক্রুটমেন্ট চেইনটি দ্রুত ভেঙে দিতে হবে। তা না হলে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।

এ দিকে সীমান্তে কঠোর নজরদারিতে উদ্ভূত পরিস্থিতির পর বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) এবং কোস্টগার্ড নাফ নদীসহ সমগ্র পার্বত্য সীমান্তে তাদের নজরদারি ও টহল কয়েক গুণ বৃদ্ধি করেছে। অরক্ষিত সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সীমান্ত দিয়ে কোনো প্রকার অবৈধ অনুপ্রবেশ বা অস্ত্রের চোরাচালান বরদাশত করা হবে না বলে প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে।