নতুন বছরে ঘুরে দাঁড়াতে পারে দেশের পুঁজিবাজার

এএফসির পূর্বাভাস

মন্দা ও আস্থার সঙ্কট কাটিয়ে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এশিয়া ফ্রন্টিয়ার ক্যাপিটাল (এএফসি)। সংস্থাটির মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্বস্তি ফিরে আসা, মুদ্রাস্ফীতি কমার সম্ভাবনা এবং তুলনামূলক কম মূল্যায়নের কারণে আগামী বছর দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

দীর্ঘ দিনের মন্দা ও আস্থার সঙ্কট কাটিয়ে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এশিয়া ফ্রন্টিয়ার ক্যাপিটাল (এএফসি)। সংস্থাটির মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্বস্তি ফিরে আসা, মুদ্রাস্ফীতি কমার সম্ভাবনা এবং তুলনামূলক কম মূল্যায়নের কারণে আগামী বছর দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।

হংকং-ভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠান তাদের সর্বশেষ বাজার বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৫ সাল বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের জন্য একটি হতাশার বছর হলেও ২০২৬ থেকে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে। যদিও এশিয়ার অন্যান্য ফ্রন্টিয়ার বাজার টানা তৃতীয় বছরের মতো শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। বাংলাদেশ সেখানে পিছিয়ে পড়েছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নীতিগত অস্থিরতা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তের কারণে।

এএফসির তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিকভাবে সবচেয়ে দুর্বল পারফরম্যান্স করা শেয়ারবাজারগুলোর একটি ছিল বাংলাদেশ, যেখানে সূচক প্রায় ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যায়। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালেও এই নেতিবাচক ধারা পুরোপুরি কাটেনি। ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত বাজারে প্রায় ৮ শতাংশ নেতিবাচক রিটার্ন লক্ষ করা গেছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে আরো দুর্বল করেছে।

তবে এই নেতিবাচক প্রবণতার মধ্যেই ২০২৬ সালকে ঘিরে নতুন করে আশার কথা শোনাচ্ছে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। এএফসি মনে করছে, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।

সংস্থাটির মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা শুধু শেয়ারবাজার নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘ দিন ধরেই অপেক্ষায় রয়েছেন একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমেয় বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য, যা ২০২৬ সালে ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে।

ম্যাক্রো অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এএফসি আশা করছে, আগামী বছর দেশে মুদ্রাস্ফীতির চাপ কিছুটা কমবে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগত সুদের হার কমানোর সুযোগ পেতে পারে। সাধারণভাবে সুদের হার কমলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়ে; কারণ ব্যাংক ও স্থির আয়ের খাতের তুলনায় শেয়ারবাজারে সম্ভাব্য রিটার্ন বেশি হয়ে ওঠে।

বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক বছর ধরে উচ্চ সুদের হার পুঁজিবাজারের জন্য বড় বাধা হিসেবে কাজ করেছে। সুদের হার কমার সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের বাজারে ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের আরেকটি বড় ইতিবাচক দিক হলো এর তুলনামূলক কম মূল্যায়ন। ইবিএল সিকিউরিটিজের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজারের গড় প্রাইস টু আর্নিং রেশিও মাত্র ৮ দশমিক ৭। একই সময়ে ভারতের বাজারে এই অনুপাত ২৪ দশমিক ৫, ইন্দোনেশিয়ায় ২১ দশমিক ৪, ভিয়েতনামে ১৬ দশমিক ৫ এবং শ্রীলঙ্কায় ১০ দশমিক ৭।

বিশ্লেষকদের মতে, এত কম মূল্যায়নে বাজার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় প্রবেশদ্বার তৈরি করেছে। বিশেষ করে বড় ও প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো তাদের ঐতিহাসিক গড় দামের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ছাড়ে লেনদেন হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে মূল্য সংশোধনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

এশিয়া ফ্রন্টিয়ার ক্যাপিটাল মূলত স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ফ্রন্টিয়ার মার্কেট হিসেবে বিবেচনা করে। এই শ্রেণীভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ টানা দুই বছর সবচেয়ে দুর্বল পারফরমার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর বিপরীতে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে।

২০২৫ সালে পাকিস্তানের শেয়ারবাজার প্রায় ৪৭ শতাংশ রিটার্ন দিয়েছে, আর শ্রীলঙ্কার বাজারে প্রায় ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এসব দেশে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, সুদের হার হ্রাস, অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ার ফলে বাজার চাঙ্গা হয়েছে বলে মনে করছে এএফসি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রাইম সূচক জুনের পর থেকে প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে বছরের প্রথমার্ধে সূচক ৭ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এটি বাজারে আস্থার ধীরে ধীরে ফিরে আসার একটি প্রাথমিক সঙ্কেত।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারে সংস্কারমূলক বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন নতুন মার্জিন ঋণ নীতিমালা অনুমোদন করে, যার মাধ্যমে অতিরিক্ত ঝুঁকি কমিয়ে বাজারে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করা হয়। তবে এসব সিদ্ধান্ত স্বল্পমেয়াদে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলেও মত রয়েছে। এ ছাড়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের একীভূতকরণ এবং তাদের শেয়ারের মূল্য বাতিলের সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এর ফলে বাজারে আস্থার সঙ্কট আরো গভীর হয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের গবেষণা বিভাগের প্রধান সালিম আফজাল শাওন বলেন, ২০২৫ সালের বাজার পারফরম্যান্স প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল ছিল। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিয়ন্ত্রক সংস্কারের কারণে বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সতর্কতা বেড়েছে। তবে তিনি মনে করেন, ২০২৬ সালে পরিস্থিতির উন্নতির বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।

তার মতে, দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে এবং ব্যবসায়িক খাতে অর্থায়নের চাহিদা জমে আছে। সঠিক অবকাঠামো ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা থাকলে এই অর্থায়নের একটি বড় অংশ পুঁজিবাজারের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব।

এশিয়া ফ্রন্টিয়ার ক্যাপিটাল মনে করছে, শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো এশীয় ফ্রন্টিয়ার মার্কেটই একটি বহু বছরের ঊর্ধ্বমুখী চক্রে প্রবেশ করছে। কম সুদের হার, সহায়ক রাজস্বনীতি, মুদ্রার স্থিতিশীলতা এবং উন্নত শাসনব্যবস্থা এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।

সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের পরিচালিত তহবিল ২০২৫ সালে প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ রিটার্ন অর্জন করেছে, যা টানা তৃতীয় বছরের মতো দ্বিঅঙ্কের প্রবৃদ্ধি। এই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স এশীয় ফ্রন্টিয়ার বাজারগুলোর সম্ভাবনার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরো জোরদার করেছে।

সব মিলিয়ে দীর্ঘ দিনের অস্থিরতা ও হতাশার পর বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ২০২৬ সালে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত পাচ্ছে। যদিও সামনে এখনো নানামুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং আকর্ষণীয় মূল্যায়ন বাজারে নতুন করে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারে বলে মনে করছেন দেশী-বিদেশী বিশ্লেষকরা।