১৮ কোটি মানুষের মুক্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ২৪ চলবে

গণজোয়ারে ভীত হয়ে একটিদল অপপ্রচারে নেমেছে : ডা: শফিক

Printed Edition
শেরপুর পৌর পার্কে ১১ দলীয় জোটের জনসভায় বক্তব্য রাখেন ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত
শেরপুর পৌর পার্কে ১১ দলীয় জোটের জনসভায় বক্তব্য রাখেন ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত

শেরপুর প্রতিনিধি

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, এ মাসের ১২ তারিখ জাতির বাঁক পরিবর্তনের জন্য একটি বড় গুরুত্বপূর্ণ দিন। জাতি আজ এক কঠিন বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের পরিচয় হচ্ছে আমরা আল্লাহতায়ালার গোলাম। আল্লাহতায়ালার গোলামি যারা করে তারা আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে মাথা নত করে না। আল্লাহতায়ালার গোলামি যারা করে তারা কালো মেঘ দেখে ভয়ও পায় না। আল্লাহকে খুশি করার জন্য মানুষকে ভালোবাসে এবং সম্মান করে। ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করে মানুষের ভালোবাসা পাওয়া যায় না।

গতকাল রোববার দুপুরে শেরপুর শহীদ দারোগ আলী পৌর পার্কে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের বিশাল নির্বাচনী জনসভায় তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তিনি শেরপুর-১ (সদর) আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী হাফেজ রাশেদুল ইসলাম, শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনের প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া ভিপি, শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের হাতে নির্বাচনী প্রতীক দাঁড়িপাল্লা তুলে দেন।

যুবকদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ২৪ চলছে, চলবে। তত দিন চলবে যত দিন পর্যন্ত ১৮ কোটি মানুষের মুক্তি নিশ্চিত না হবে। জেগে থাকবেন, এখন থেকে পাহারা দিবেন, নির্বাচন নিয়ে কেউ যদি সন্ত্রাস চালাতে চায়, আল্লাহর ওপর ভরসা করে সমান পরিমাণ জবাব দিবেন। তবে নিজে জবাব দেয়ার আগে অবশ্যই যথাযথ কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনকে অবহিত করবেন।

জামায়াত আমির বলেন, উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত একটি মিটিং, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে স্পষ্ট দিবালোকে একজন বিশিষ্ট শিক্ষক অধ্যাপক রেজাউল করিম, যিনি উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ছিলেন, তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অবশ্য যারা হত্যা করেছেন, তাদের জন্য এটা নতুন না। তারাতো তাদের নিজের দলেরই দুই শতাধিক মানুষকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিয়েছে। যে রাজনীতি মানুষকে নিরাপত্তা দেয়ার পরিবর্তে মানুষকে খুন করে ফেলে। এ কোন রাজনীতি? তিনি জনগণকে প্রশ্ন করে বলেন, আপনারা কি এই রাজনীতি চান? অথচ এই রাজনীতিই ৫৪ বছর ধরে চলেছে। তিনি বলেন, রাজনীতির নামে মানুষ খুন ঘৃণা করে জামায়াত।

তিনি বলেন, মাওলানা রেজাউল করিমের হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত একজনকেও গ্রেফতার করা হলো না। এই খুনের সাথে যারা জড়িত আমরা তাদের অবিলম্বে গ্রেফতার দেখতে চাই। আমরা সভ্য ও ভদ্র। তাই বলে আমাদের দুর্বল ও কাপুরুষ ভাববেন না। আমরা নিজেরা কখনো আইনকে নিজেদের হাতে তুলে নিতে চাই না।

জামায়াত আমির বলেন, এই বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় মজলুম সংগঠনের নাম হচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এক এক করে সম্পূর্ণ মিথ্যা মামলায় জামায়াতের ১১ জন শীর্ষ নেতাদের ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে। হাজারেরও বেশি নেতাকে দুনিয়া থেকে বিনা বিচারে বিদায় করা হয়েছে, সাতশোর মতো সহকর্মীকে আয়না ঘরে বন্দী রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে আটজনের হদিস আমরা এখনো জানি না। তাদের মায়েরা জীবন্ত সন্তান অথবা একটা কবরের অপেক্ষায় আছেন। সন্তান যদি বেঁচে না থাকে তাহলে কবরটি কোথায়? সন্তানের কবর থেকে একটু মাটি বুকে লাগাতে চান, কপালে লাগাতে চান, একটু প্রশান্তি পেতে চান। এই মায়েদের কাছে আমাদের কোনো জবাব নাই। বিশেষ করে ২৪ এ যাদের নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে, তাদের পরিবারের কাছে আমাদের কোনো জবাব নাই। আমরা ঘুরে ঘুরে তাদের কাছে গিয়েছি। আমি তাদের চোখে পানি দেখি নাই, তাদের চোখে টকটকে রক্তের ফোটা দেখেছি।

তিনি বলেন, আমরা চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মামলা বাণিজ্যের সাথে জড়িত থাকব না বলে ঘোষণা দিয়েছিলাম, আমাদের কর্মীরা এসব কাজ করে নাই। তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন যায়গায় মা-বোনদের অসম্মানিত করা হচ্ছে, গায়ে পর্যন্ত হাত দেয়া হচ্ছে, কোনো কোনো উন্মাদ তো গায়ে থেকে কাপড় খুলে ফেলতে বলেছেন। যারা এ কাজটি করছেন তারাও মায়ের সন্তান। তাদের কাছে অনুরোধ প্লিজ আপনাদের মা, স্ত্রী, বোন, মেয়েকে সম্মান করতে শিখুন। আর তা না করতে পারলে আপনি মানুষ নামের কলঙ্ক। ওইসব মানুষকে সাবধান করে দিচ্ছি, মায়ের গায়ে হাত দিলে বাংলাদেশ বিস্ফোরিত হবে। শেরপুর জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক ড. সামিউল হক ফারুকী, জামায়াতের সাবেক জেলা আমির ডা: মুহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন, সাবেক সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল বাতেন, জেলা জামায়াতের মজলিশে শূরার সদস্য ডা: মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন, অধ্যাপক আবুবকর সিদ্দিক, ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক ইউসুফ ইসলাহী। এবি পার্টির জেলা শাখার আহ্বায়ক শাহজাহান মল্লিক, সাধারণ সম্পাদক মো: মুকসিতুর রহমান হীরা, এনসিপির জেলা সমন্বয়কারী ইঞ্জিনিয়ার মো: লিখন মিয়া, বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিশের শেরপুর জেলা সভাপতি মাওলানা শফিকুল ইসলাম, মাওলানা আব্দুল হালিম, ইসলামী ছাত্রশিবির শেরপুর জেলা শাখার সভাপতি আশরাফুজ্জামান মাসুম, জুলাই যোদ্ধা খোকন চন্দ্র বর্মন প্রমুখ। এ ছাড়াও এগারো দলীয় ঐক্যজোটের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

ডা: শফিকুর রহমান জনসমাবেশে যোগ দেয়ার আগে গড়জরিপা ইউনিয়নের গোপালখিলায় শায়িত শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি সদ্য শহীদ মাওলানা রেজাউল করিমের কবর জিয়ারত করেন এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সাথে কথা বলেন।

ফেব্রুয়ারির নির্বাচন দেশের বাঁক পরিবর্তনের নির্বাচন

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন দেশের বাঁক পরিবর্তনের নির্বাচন। এই নির্বাচন ১৪০০ শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে এবং প্রায় ৩৪ হাজার পঙ্গুত্ববরণকারী মানুষের ত্যাগের নির্বাচন।

আয়নাঘরের অন্ধকার জগতের অবসানের পর এই নির্বাচন নতুন বাংলাদেশের পথরেখা তৈরি করবে বলেন উল্লেখ করেন আমিরে জামায়াত।

গতকাল বেলা ২টায় জামালপুরের সিংহজানি হাইস্কুল মাঠে জেলা জামায়াত আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর দেশের মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। গুম, খুন, নির্যাতন ও ভয়ভীতির মধ্য দিয়ে একটি অন্ধকার সময় পার করেছে দেশ ও দেশের মানুষ ।

তিনি আরো বলেন, সেই দুঃসময়কে পিছনে ফেলে জনগণের সামনে এবার সত্যিকারের পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে ।

এই নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের নয়, বরং ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার নির্বাচন। জামায়াতের আমির আরো বলেন, যারা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন এবং যারা আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করেছেন, তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেয়া যাবে না।

জনগণের রায়ের মাধ্যমেই সেই ত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান তিনি। জামালপুর জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুস সাত্তারের সভাপতিত্বে জামালপুর সিংহজানি হাইস্কুল মাঠের নির্বাচনী জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ও জেলাপর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। তারা বলেন, জামালপুরসহ সারা দেশে নির্বাচনী মাঠে জনগণের ব্যাপক এই সাড়া পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে। বক্তারা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। সভায় জেলা জামায়াতের আমির, সেক্রেটারি জেনারেল , বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ বিপুল সংখ্যক সমর্থক উপস্থিত ছিলেন। জামায়াতের আমিরের জনসভাকে কেন্দ্র করে সভাস্থল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে শহরের আশপাশের এলাকায় জনস্রোতের সৃষ্টি হয়।

পরে ডা: শফিকুর রহমান জামালপুরের পাঁচটি আসনে জামায়াতের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা তুলে দেন।

এ সময় তিনি বলেন, এই দাঁড়িপাল্লা ন্যায় ও ইনসাফের প্রতীক। তাই তিনি দাঁড়িপাল্লায় ভোট জেলার পাঁচটি আসনেই জামায়াতের প্রার্থীদের বিজয়ী করার জন্য জামালপুরবাসীর প্রতি আহবান জানান।

গণজোয়ারে ভীত হয়ে একটিদল অপপ্রচারে নেমেছে

সারা দেশে ১১ দলের পক্ষে গণজোয়ার দেখে একটি দল ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, দাঁড়িপাল্লাসহ ১১ দলের পক্ষে সারা দেশে গণজোয়ার শুরু হয়েছে। এটি দেখে একটি দল ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কী করবে বুঝতে পারছে না। এজন্য তারা মিথ্যাচার, প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। নারীদের ওপর হামলা ও শেরপুরে একজন নেতাকে খুন করছে। ক্ষমতার জন্য তারা পাগল হয়ে গেছে।

গতকাল ঢাকা-১৫ আসনের নির্বাচনী জনসভায় তিনি এ কথা বলেন। জামায়াত আমির বলেন, জনগণ ইনসাফের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে। ইনশাআল্লাহ বিজয় আমাদেরই হবে, বিজয় জনগণের হবে, ১৮ কোটি মানুষের হবে। তিনি যুবকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট দিতে হবে, এরপর পাহারা দিতে হবে। তারপর হিসাব গুনে রেজাল্ট নিয়ে বাড়িতে যেতে হবে। রেজাল্ট হাতে না নিয়ে ফিরবেন না। কোনো ভোট ডাকাতকে ডাকাতি করতে দিবেন না। জালিয়াতিদের সুযোগ দিবেন না। ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং করতে দিবেন না। যুবকরা সজাগ আছো? ইনশাআল্লাহ আমরা তোমাদের সাথে নিয়ে সব অপকর্ম রুখে দেবো।

এলাকাবাসীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমি আপনাদেরই একজন। যত দিন আল্লাহ হায়াত দিয়েছেন, তত দিন আপনাদের সাথে আছি, পাশে আছি। বিগত সময়ে জেলে গিয়েছে কিন্তু দেশেই ছিলাম, আমি দেশ ছেড়ে কোথাও যাইনি।

এর আগে উত্তর কাফরুল ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব বাইশটেকি কবরস্থান মসজিদের সামনে থেকে ঢাকা-১৫ সংসদীয় আসনে আয়োজিত গণসংযোগ ও মিছিলপূর্ব সমাবেশে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, দুর্নীতি আমাদের চরিত্র ও খাসলতের সাথে যায় না। বরং জনগণের যে আমানত লুণ্ঠিত হয়েছে, তা তাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়াই আমাদের দায়িত্ব। জনগণের সম্পদে কখনো হাত দেয়া হবে না বলে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

গণসংযোগ ও মিছিলে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি লস্কর মোহাম্মদ তসলিম, কাফরুল দক্ষিণ থানা জামায়াতের আমির উপাধ্যক্ষ আনোয়ারুল করিম, থানা সেক্রেটারি মো: আবু নাহিদসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডের সভাপতি ও দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ। সমাবেশ শেষে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিলটি এলাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এ সময় অংশগ্রহণকারীরা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দেন।