দেড় দশকের রাজনৈতিক অচলাবস্থা পেরিয়ে দেশের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে ঘিরে শহর থেকে গ্রাম সবখানেই বইছে নির্বাচনী হাওয়া। তবে এবারের নির্বাচন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, এবারের ভোটের ফল নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে তরুণ ভোটাররা, বিশেষ করে ‘জেন-জি’ প্রজন্ম।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখের বেশি। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী তরুণ ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৫৬ লাখ, যা মোট ভোটারের প্রায় ৪৪ শতাংশ। এই বিশাল ভোটব্যাংকই এবারের নির্বাচনের ‘গেম চেঞ্জার’ হতে পারে বলে ধারণা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
২০০৮ সালের পর যারা ভোটার হয়েছেন, তাদের বড় একটি অংশ গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেয়ার সুযোগ পাননি। এ কারণে অনেক তরুণ এবারের নির্বাচনকে দেখছেন নাগরিক অধিকার ফিরে পাওয়ার সুযোগ হিসেবে। তরুণ ভোটার আবরার ইয়াসির বলেন, গত ১৫ বছরে তিনি ভোটার হলেও কখনো ভোট দিতে পারেননি। তার ভাষায়, “এবারের ভোট আমার কাছে শুধু নির্বাচন নয়, এটা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার পক্ষে অবস্থান নেয়ার সুযোগ।”
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৯০ শতাংশ তরুণ ভোট দিতে আগ্রহী। এই আগ্রহ রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য যেমন আশাব্যঞ্জক, তেমনি একটি বড় চ্যালেঞ্জও।
দল নয়, প্রার্থী মুখ্য
মাঠপর্যায়ের আলোচনা, ক্যাম্পাসের আড্ডা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কথোপকথন বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, তরুণদের ভোটের মানদণ্ডে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে দলীয় প্রতীক বা ‘মার্কা’ ছিল মুখ্য, সেখানে এবার প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, সততা ও কাজের ইতিহাসকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তরুণরা।
তরুণ ভোটারদের মতে, শিক্ষাগত যোগ্যতা, দুর্নীতিমুক্ত ভাবমর্যাদা এবং জনসংযোগই হবে ভোট দেয়ার প্রধান ভিত্তি। অনেকেই বলছেন, পেশিশক্তি বা কালো টাকার প্রভাব থাকা প্রার্থীদের তারা প্রত্যাখ্যান করবেন।
সংস্কার ও জবাবদিহির দাবি
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান তরুণদের রাজনৈতিক ভাবনায় বড় প্রভাব ফেলেছে। অনেক তরুণের কাছে এবারের নির্বাচনের মূল প্রশ্ন হলো পুরনো স্বৈরাচারী ধারা বা ফ্যাসিবাদ যেন আর ফিরে না আসে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারিহা তাসনিম বলেন, আমরা এমন দল বা প্রার্থী চাই, যারা মত প্রকাশের স্বাধীনতা দমিয়ে রাখবে না এবং পুলিশ বা প্রশাসনকে দলীয় বাহিনী বানাবে না।
তরুণরা চান, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি সংসদে গিয়ে প্রশাসনিক, বিচারিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের পক্ষে কথা বলবেন। পাশাপাশি এমপিদের এলাকায় উপস্থিতি ও জবাবদিহির বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বড় এজেন্ডা
রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিষয়গুলোও তরুণদের ভোটের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখছে। বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং কর্মসংস্থানের অভাব তরুণদের উদ্বিগ্ন করছে। তাদের দাবি সরকারি ও বেসরকারি খাতে শতভাগ মেধাভিত্তিক নিয়োগ, উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা।
একাধিক তরুণ ভোটার জানান, বড় প্রকল্পের চেয়ে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের স্পষ্ট পরিকল্পনাই তাদের ভোট টানবে।
তরুণী ভোটারদের বদলে যাওয়ার হিসাব
তরুণী ভোটারদের মধ্যেও এবার চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এসেছে। নিরাপত্তা, হয়রানি ও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে বাস্তব পদক্ষেপ না থাকায় অনেকেই দলীয় পরিচয়ের বাইরে এসে প্রার্থী দেখেই ভোট দেয়ার কথা বলছেন। তাদের মতে, যাদের কাজে নারী অধিকার রক্ষার প্রমাণ আছে, তারাই পাবেন সমর্থন।
নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা : এত আগ্রহের মধ্যেও তরুণদের মনে শঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা ও ভোটের পর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। মফস্বল এলাকার তরুণরা বিশেষ করে নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। তাদের মতে, সেনাবাহিনী মোতায়েন ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকা ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে সহায়ক হবে।
তরুণ ভোটার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ বলেন, তিনি এমন প্রার্থীকে ভোট দিতে চান যিনি সৎ ও যোগ্য এবং যার কথা ও কাজের মধ্যে অতীতে মিল পেয়েছেন। তার মতে, দলীয় প্রার্থীর ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ও আমানতদারিতা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি তরুণ, কর্মস্পৃহাসম্পন্ন ও বিবেকবান নেতৃত্বকে প্রাধান্য দিতে চান তিনি। চারিত্রিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ প্রার্থীকেই ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাতুল আহম্মেদ শ্রাবন বলেন, একজন সৎ প্রার্থী কেবল একটি আসনের উন্নয়ন করতে পারেন, কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত দল ক্ষমতায় গেলে পুরো দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বলেন, যে দল চাঁদাবাজিতে জড়িত, দলের ভেতরে কোন্দল রয়েছে, নিয়ন্ত্রণহীন এবং যেখানে পরিবারতন্ত্র বিদ্যমান সেই দলকে তিনি ভোট দেবেন না।
তরুণ ভোটার লিমন হোসাইন জানান, প্রার্থীর সততা, যোগ্যতা ও চরিত্রকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবেন। একই সাথে জনগণের জন্য অতীতে করা কাজ এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা বিবেচনায় নেবেন। দলীয় পরিচয়ের চেয়ে দেশের স্বার্থ, গণতন্ত্র ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে প্রাধান্য দিয়েই আমি ভোট দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
তরুণ ভোটার শাকিব বলেন, প্রার্থীর সততা, যোগ্যতা ও জনসেবার মানসিকতাই মুখ্য। অপরাধমুক্ত ভাবমর্যাদা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রার্থীর অঙ্গীকারই হবে তার ভোট দেয়ার প্রধান ভিত্তি। দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষায় যিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তাকেই তিনি সমর্থন দেবেন।
ভোটার রায়হান জানিক বলেন, ভোট দেয়ার আগে তিনি প্রার্থীর সাথে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক, এলাকায় সহজলভ্যতা, আচরণ ও বাচনভঙ্গি যাচাই করবেন। পাশাপাশি এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়ার পরই তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান।
বিশ্লেষকদের চোখে তরুণ ভোট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম শামীম রেজা বলেন, ‘এবারে তরুণ ভোটার (প্রায় ৬ কোটি) বিরাট একটা সংখ্যা। তাদের উপস্থিতি এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের স্বতস্ফূর্ত ভোট প্রদান ব্যালটের হিসাব পালটে দিতে পারে। তারা যদি যথেষ্ঠ উৎসাহী না হন ভোট দিতে, তাহলে ভোটার উপস্থিতির হার কমে যাবে; যা গণতন্ত্রের জন্য ভালো বার্তা নয়। এর সাথে গণভোটও আছে, তাই সবারই আগ্রহ থাকা উচিত ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে।’
সমাজ বিশ্লেষক ড. রাশেদা রওনক খান বলেন, ‘বাংলাদেশই শুধু নয়, সারা পৃথিবী এখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের দিকে যাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা এমন প্রার্থীকে খুঁজছেন, যিনি নতুন চিন্তা, নতুন সম্ভাবনা সামনে আনতে পারবেন।’
এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তরুণদের জন্য শুধু ভোট দেয়ার সুযোগ নয়। এটি রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দেয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। প্রতীক নয়, যোগ্যতা ও সংস্কার- এই বার্তাই যেন তরুণ ভোটাররা এবার ব্যালটের মাধ্যমে দিতে প্রস্তুত।



