ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক এবং সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মায়মুল আহসান খান তরুণদের জুলাই আন্দোলনের পর বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখা স্পষ্ট করার তাগিদ দিয়ে বলেছেন, তরুণ সমাজ যে সাহসিকতা দেখিয়েছে তা প্রশংসনীয়, তবে শুধু ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার ‘শর্টকাট’ পথ খুঁজলে এই অভ্যুত্থান দীর্ঘমেয়াদে সফল নাও হতে পারে। তরুণদের ভূমিকা প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক বিষয় ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেন, তাদের দেশব্যাপী অভিজ্ঞ নেতৃত্ব ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু একক কোনো দল বা জোটে তরুণদের নির্ভরশীল না থেকে সমাজের প্রবীণ শিক্ষাবিদ, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিজীবীদের অভিভাবকত্ব বা পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। শর্টকাট পদ্ধতিতে রাজনীতি না করে তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে।
নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক মায়মুল আহসান খান বলেন, তরুণদের একদিকে অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রেখে তাদের বিরুদ্ধে দেশী ও বিদেশী ষড়যন্ত্র রোধ করতে জানতে হবে। তরুণদের নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া বা ‘সিনক্রোনাইজেশন’-এর অভাব দূর করতে হবে, অন্যথায় দেশী-বিদেশী ভূ-রাজনৈতিক চক্রান্ত তাদের আন্দোলনকে দুর্বল করে দিতে পারে।
তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশকে একক প্রভাবে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন তরুণ প্রজন্মকে আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা এবং বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে এই আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত এই গবেষক ও লেখক বলেন, ভারতে বিজেপির উত্থান, ইসরাইল-ভারত সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে চরমপন্থী হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবেলায় বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে আবেগনির্ভর শর্টকাট পথের বদলে দীর্ঘমেয়াদি ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দল তরুণদের ধ্বংসাত্মক পথে ঠেলে দিতে পারে কিন্তু তরুণদের পচা শামুকে পা কাটলে চলবে না।
নয়া দিগন্ত : তরুণদের জুলাই আন্দোলনে প্রধান ভূমিকা থাকলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে এনসিপি হামলার শিকার হচ্ছে কেন?
মায়মুল আহসান খান : তরুণরা যেটা করছে, এককভাবে করছে, এটা ডেঞ্জারাস হয়ে যাচ্ছে। ভলতেয়ার ফরাসি বিপ্লবের আগে তরুণদের বলছিল যে ‘তোমরা ঈশ্বরের নামে হলেও কিছু গুরুজন রাখো।’ তরুণরা বলল, ‘আমরা তো আপনাকে গুরুজনের মতো রাখি।’ ভলতেয়ার বলল, ‘আমি তো তোমাদের একটা-দুইটা সেন্টেন্স লিখে দেয়া ছাড়া আর কিছু করতে পারব না। কিন্তু তোমরা কাজটা করার পরে দেশটা চালানোর জন্য যদি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উন্নত মানুষদের আনতে না পারো, তাহলে এই বিপ্লব সংঘটিত হলেও সার্থক হবে, সাংস্কৃতিক হবে না।’ তো আমাদের তরুণরা যে কাজটা করছে, এটার সহযোগী হওয়ার জন্য কিন্তু মানুষ খুব মুখিয়ে আছে এখন, সাধারণ মানুষ। এখন এই সাধারণ মানুষকে অ্যাবজর্ব বা আত্মস্থ করার মতো কোনো মেকানিজম তারা বের করতে পারে নাই।
নয়া দিগন্ত : তরুণদের সাথে তো আপনার কথাবার্তা হয়।
মায়মুল আহসান খান : ওদের সাথে যখন আমি কথা বলি, এটার প্রয়োজনীয়তাটাই তারা বুঝতে পারে না। যে তোমরা যেখানেই যাবে, সেখানেই কলেজের অধ্যাপক হোক বা মাদরাসার হেড মুহাদ্দিস হোক এসব লোক তোমাদের এক ধরনের অভিভাবক হয়ে কাজ করবে সাময়িকভাবে হলেও। এই জিনিসটা ওরা পাত্তা দেয় না।
নয়া দিগন্ত : পাত্তা দেয় না মানে কী? আর দে মিসগাইডেড? নাকি তারা মনে করে ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়া, সংসদে যাওয়া বা স্থানীয় সরকার নির্বাচন, এগুলোর মাধ্যমেই সহজ পথ খুঁজছে?
মায়মুল আহসান খান : হ্যাঁ, ওরা শর্টকাট! ওরা শর্টকাট কোনো একটা পদ্ধতিতে ক্ষমতার শীর্ষে উঠতে চাচ্ছে। কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার এরকম শর্টকাট পদ্ধতি পৃথিবীর কোথাও নাই এবং ওই শর্টকাট পদ্ধতিতে শেষ পর্যন্ত কোনো লাভ বা আদর্শের জয় হয় নাই। আপনাকে লং-টার্ম একটা ব্যবস্থা রাখতে হবে। মুরুব্বিদের কথা শোনার অর্থ এই নয় যে সবসময় তাদের কথা শুনতে হবে। তারা একটা ছাতার মতো কাজ করবে। সারা দেশে যখন ওরা ঘুরে বেড়াবে, তখন সব জায়গায় বয়স্ক লোকেরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে নিজেদের সন্তানের মতো দেখবে। এবং তারাও আচরণটা এমন করবে যে আপনাদের পরামর্শেই আমরা কাজ করব। এই জিনিসটা তাদের মধ্যে গড়ে উঠছে না। এবং ওরা ভয় পাচ্ছে যে ওদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যায় কি না! মুরুব্বিরা ঢুকলে পরে ওদের মধ্যে ভাগাভাগি। কারণ ওরা তো একেকটা ইন্ডিভিজুয়াল ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’। ওদের প্রত্যেকের মধ্যেই হাসনাত বলেন, নাহিদ বলেন ওদের মধ্যে যে খুব সিনক্রোনাইজেশন আছে তা না। মাঝে মধ্যে গণ্ডগোল হলে সিনক্রোনাইজেশনটা দেখা যায়, গণ্ডগোল শেষ হয়ে গেলে আবার সিনক্রোনাইজেশন নষ্ট হয়ে যায়।
নয়া দিগন্ত : হবিগঞ্জে, গোলাপগঞ্জে বা এর আগে বরিশালে তারা বাধার মুখে পড়ছে। তৃণমূল পর্যায়ে গেলে তারা যে বাধার মুখে পড়ছে, এটা তারা কিভাবে ডিঙ্গাবে বা মোকাবেলা করবে?
মায়মুল আহসান খান : না, এটা তো এই দুই বছরেই ডিঙ্গানোর রাস্তা বের করে ফেলার কথা ছিল। কিন্তু তারা তো বের করতে চাইল না! তারা উচ্চাভিলাষী হয়ে গেল, তারা শর্টকাট পদ্ধতি খুঁজতে শুরু করল। তারা তো লাস্ট মোমেন্টে যদি জামায়াতের সাথে আমি তো তাদেরকে রীতিমতো গালমন্দ করেছি জামায়াতের সাথে যদি একসাথে না যায় তাহলে আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলছিলাম যে একটা সিটও যদি আপনারা পান, আমার কান কেটে ফেলবেন! আপনারা একা দাঁড়িয়ে যদি একটা সিট পান! বড়জোর হাসনাত পাইতে পারে, আর বাকি কেউ সিট পাবেন না। আমি ওদেরকে এভাবে বলেছি।
নয়া দিগন্ত : এখন শোনা যাচ্ছে তারা জোট থেকে বের হয়ে যাবে, এটার পেছনে কি কোনো চক্রান্ত আছে নাকি? এই ইয়ং ফোর্সটাকে দুর্বল করে দেয়ার কোনো চক্রান্ত আপনি দেখতে পাচ্ছেন?
মায়মুল আহসান খান : হ্যাঁ, দেশী-বিদেশী দুই চক্রান্ত এখানে কাজ করছে, একটা না।
নয়া দিগন্ত : কিন্তু ভারতেও তো তেলাপোকা জনতা পার্টি রাজপথে নেমেছে, বাংলাদেশের এক তরুণ নেতা তো বলেই ফেললেন এখান থেকে বারুদ ছড়িয়ে পড়–ক।
মায়মুল আহসান খান : ভারতের ‘হিন্দুত্ববাদী’ রাজনীতি ও বৈশ্বিক অক্ষ বুঝতে হবে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ও বিজেপির রাজনৈতিক ভিত্তি অত্যন্ত সুসংগঠিত ও ক্যাডারভিত্তিক। ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার মতো ঘটনার পরও আন্তর্জাতিক স্তরে ফান্ডিং সংগ্রহ ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে বিজেপি ভারতের ক্ষমতা দখল করে। এটি ভারতীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চরম বিচ্যুতির উদাহরণ এবং ফ্যাসিস্ট হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা অনেকটা জায়োনিজমের মতো বর্ণবাদী ও গণমানুষের আদর্শবিরোধী। ঐতিহাসিকভাবে ভারত ফিলিস্তিনের সমর্থক হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইলের সাথে কৌশলগত ও আদর্শিক ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে। ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা ভারতকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ‘সুপার পাওয়ার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতেই ফিলিস্তিন নীতিতে ইউ-টার্ন নিয়েছে এবং ইসরাইলের সাথে প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করেছে।
নয়া দিগন্ত : প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমাদের সচেতন থাকার প্রয়োজন কোথায়?
মায়মুল আহসান খান : প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়েই ভারত আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখার জন্য কলকাঠি নেড়েছে। ভারতের এমন আঞ্চলিক আগ্রাসী মানসিকতার কারণে ভারতের নিজস্ব অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বও ভবিষ্যতে ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ভারতের গণতন্ত্র মৃত। কারণ গণতন্ত্র আগাছা সাফ করে মোটামুটি ভালো মানুষদের একটা হাইওয়ে তৈরি করে দেয়, যাতে করে তারা প্রতিযোগিতা করে ক্ষমতায় যেতে পারে। কিন্তু ফ্যাসিস্ট হিন্দুত্ববাদ এখন ভারতে ইসরাইলের ইহুদিবাদ থেকে বেরিয়ে আসা জায়োনিজমের মতো। এটি বর্ণবাদী, নৈরাজ্যবাদী এবং গণমানুষ বিরোধী একটা শক্তি। ভারতের অনুভূতিটা হচ্ছে সুপারপাওয়ার অনুভূতি। ভারত আমেরিকাকে বুঝাতে পেরেছিল সে যদি বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করে তাহলে চায়নিজদের মোকাবেলা করলে বিষয়টি আমেরিকার পক্ষেই যাবে। কিন্তু ভারতে হিন্দুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি এতই নি¤œমানের যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেই ফেললেন, ঞযব হধংঃরবংঃ পড়ঁহঃৎু রহ ঃযব ড়িৎষফ, ফরৎঃরবংঃ পড়ঁহঃৎু রহ ঃযব ড়িৎষফ, সবচেয়ে মিজারেবল ও হরিবল লিডার মোদি, যে কোনো স্ট্যান্ডার্ডের মধ্যেই পড়ে না।
নয়া দিগন্ত : জিয়াউর রহমান তো ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
মায়মুল আহসান খান : ফিলিস্তিন যেমন ইসরাইলের সাথে একটা অসম যুদ্ধে আছে, আমরাও ভারতের বিরুদ্ধে একটা অসম যুদ্ধে আছি। তবে ভারত যদি হিন্দুস্তানি তন্ত্র-মন্ত্র নিয়ে এভাবে অগ্রসর হয়, তাহলে ভারতের ইন্টিগ্রিটি থাকবে না এবং ভারত ভাগ হয়ে যাবে। ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সৃষ্টি করার পর বলেছিলেন আমি ভারতকে ১২ খণ্ড হওয়া থেকে রক্ষা করলাম। মোরারজি দেশাইকে জিয়া বলেছিলেন বারবার যে, ‘আমাকে মেরে আপনাদের কী লাভ হবে?’ তখন মোরারজি দেশাই বলেছিলেন, ‘আমাদের তো এরকম কোনো ইচ্ছা নাই। আপনি তো একজন প্রগতিশীল মানুষ, বিশ্বসভায় ভূমিকা রাখার মতো মানুষ।’ জিয়া যখন বললেন, ‘ভারতের অ্যাক্টিভ প্ল্যান আছে আমাকে মেরে ফেলার’, তখন মোরারজি দেশাই ‘র’ -এর কাছ থেকে ওই ফাইলগুলো আনায়। যে ফাইলগুলোতে জিয়া হত্যার পরিকল্পনা ছিল। এবং ফাইলগুলো এনে উনি উনার অফিসে আটকে দেন। ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় এসেই ওই ফাইলগুলো আবার ‘র’-এর কাছে ফিরিয়ে দেন। তাই জিয়ার মৃত্যু তখন অবধারিত হয়ে গিয়েছিল। জিয়া তখনও তার সাথে কমপ্রোমাইজ করার চেষ্টা করেছেন। বলেছেন যে আপনাদের সাথে আমরা ভালো সুসম্পর্ক চাই। তখন উনি (ইন্দিরা) বলেছেন, সুসম্পর্ক করতে হলে হাসিনাকে দেশে ঢুকতে দিতে হবে, রাজনীতি করতে দিতে হবে। শেষ পর্যন্ত জিয়া এই ট্র্যাপে পড়ে গেলেন।
নয়া দিগন্ত : এই সময়ের প্রেক্ষাপটটা কেমন?
মায়মুল আহসান খান : হাসিনা যে ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠল, এটার পেছনে তো দায়-দায়িত্ব অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর আছে। কারণ ৮১ সাল থেকে এরশাদের সাথে মিলে হাসিনা যে ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠবে এটা ৯০ সালে এদেশের মানুষ বুঝতে পেরেই খালেদা জিয়াকে সমর্থন দিয়েছিল। তারা তো অনেক সুযোগ পেয়েছিল এদেরকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করে নিঃশেষ করে দেয়ার, কিন্তু তারা সেই পথে যায় নাই। কারণ তাদের ঐক্যটা খুবই বাহ্যিক। তাদের ঐক্যটা আদর্শিকও না, মনস্তাত্ত্বিকও না, এজন্য এটা ভেঙেও গেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতাটা রয়ে গেছে সাংঘাতিকভাবে। ভারত আমাদেরকে এখনো করদরাজ্য হিসেবেই দেখে। ড. ইউনূস ওদের চোখে চোখ রেখে কথা বলেছেন, কিন্তু এখন যারা ক্ষমতায় এসেছে এদেরকে তারা গণনায় ধরে না। ভারত মনে করে অবস্থা ঠিক হলেই এরা আবার হাসিনাকে যেভাবে কন্ট্রোল করেছে, সে ধরনের লোকদের দিয়েই বাংলাদেশ চালাবে।



