রক্তরঞ্জিত জুলাই-২০

কারফিউ উপেক্ষা করে চলে বিক্ষোভ গুলিতে নিহত ৩৭

শুধু ঢাকায় পুলিশসহ নিহত ২৫

এদের মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই মৃত্যু হয় ২৫ জনের। বিপুলসংখ্যক রোগীকে একসাথে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।

আমিনুল ইসলাম
Printed Edition

ফ্যাসিস্ট সরকারের জারি করা কারফিউ উপেক্ষা করে রাজধানীসহ সারা দেশে চলতে থাকে ভয়াবহ সংঘর্ষ। একযোগে পুলিশ বিজিবি, র‌্যাব, আনসারের গুলিতে একের পর এক মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েন ৩৭ জন ছাত্র-জনতা। এদের মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই মৃত্যু হয় ২৫ জনের। এলোপাতাড়ি ব্রাশফায়ারে ঝাজরা হতে থাকে শত শত নিরীহ ছাত্র-জনতার দেহ। সেদিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ, মিরপুরের আলোক হেলথ কেয়ার, ডা: আজমল হসপিটাল, রামপুরার ফরাজী হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয় গুলিবিদ্ধদের। এত রোগীকে একসাথে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। এদিন যাত্রাবাড়ী এলাকায় নিহত হন দুই পুলিশ সদস্য।

ঢাকায় সরেজমিনে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ও সরকারের কারফিউ অচল করে দেয় গোটা রাজধানী। মালিবাগ, রামপুর, বাড্ডা, বারিধারা, প্রগতি সরণি। অপর দিকে কাঁচপুর থেকে শুরু করে কাজলা, যাত্রাবাড়ী, সায়দাবাদ, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর-১০, বেনারসী পল্লী, মিরপুর-১৩, সেনপাড়া পর্বতা, মানিকনগর, আগারগঁাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সাথে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও আনসার সদস্যদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। দফায় দফায় চলা বিক্ষোভে রাস্তায় টায়ার ও কাঠ জ্বালিয়ে বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিতে থাকে ছাত্র-জনতা। বৃহস্পতিবার রাতের আন্দোলন পুরোপুরি শেষ না হলেও কিছুটা নমনীয় ছিল। কিন্তু পরের দিন সকাল হতেই ফের রাস্তায় নামেন আন্দোলনকারীরা। তখনই গুলি ও টিয়ারশেল ছুড়তে থাকে পুলিশ। শুরু হয় দিনের প্রথম সংঘর্ষ। অপর দিকে মালিবাগ, রামপুরা থেকে বাড্ডা পর্যন্ত জ্বলতে শুরু করে প্রগতি সরণি সড়ক।

২০২৪ সালের ২০ জুলাই (শনিবার) দেশজুড়ে কারফিউ জারি ও সেনাবাহিনীর টহল জোরদার করা হয়। প্রথম দফায় ১৯ জুলাই (শুক্রবার) দিবাগত রাত ১২টা থেকে ২০ জুলাই (শনিবার) দুপুর ১২টা পর্যন্ত কারফিউ চলে। মাঝে দুই ঘণ্টার বিরতি দিয়ে বেলা ২টা থেকে আবার কারফিউ শুরু হয়। ২১ জুলাই (রোববার) বেলা ৩টা পর্যন্ত কারফিউ বলবৎ থাকবে বলে জানানো হয়। এ ছাড়া ২১ ও ২২ জুলাই সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ ২১ জুলাই থেকে সারাদেশে পোশাক কারখানা বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়।

২০ জুলাই তৃতীয় দিনের মতো সারা দেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখে সরকার। কারফিউ চলার সময় সারা দেশে যানবাহন চলাচলও বন্ধ থাকে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী এদিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে অন্তত ৩৭ জন নিহত হন। এর মধ্যে ঢাকায় নিহত হন দুই পুলিশসহ ২৫ জন। এ ছাড়া ময়মনসিংহ ও সাভারে ৪ জন করে, গাজীপুরে ২ জন এবং নরসিংদীতে ২ জন নিহত হন। এদিন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের সমর্থক সন্ত্রাসীরা জ্বালাও-পোড়াওসহ সহিংসতা চালাচ্ছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাধিক সমন্বয়ক বলেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তাদের ব্যানার ব্যবহার করে কেউ যদি রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চায়, ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাতে চায়, তাহলে এটা তারা সমর্থন করবেন না। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকার দমন-পীড়ন চালিয়ে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে না।’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘কোটা আন্দোলনে ভর করে বিএনপি-জামায়াত দেশের মা

২০ জুলাই রাজধানীর মিরপুরে সংঘর্ষ চলাকালে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পিকেটার ও পুলিশের সাথে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলে। এ সময় মেট্রোরেলের কাজীপাড়া স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। জননিরাপত্তার স্বার্থে মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে ও মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার বন্ধ ঘোষণা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কারফিউ জারির কারণে রাজধানীর প্রধান বিপণি বিতান ও প্রধান সড়কের পাশের দোকানপাট বন্ধ ছিল। সড়কে মানুষের উপস্থিতি ছিল একেবারেই কম। কারফিউ কেউ অমান্য করলে এক বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হবে বলে ডিএমপির গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। এদিন গভীর রাতে মিন্টো রোডের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিন সমন্বয়কের সাথে বৈঠক করেন সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী। এ সময় শিক্ষার্থীরা সরকারের কাছে আট দফা দাবি উত্থাপন করেন। এই আট দফা দাবি মানলেই কেবল কোটা সংস্কারের এক দফা দাবি বিষয়ে আলোচনা করতে সম্মত হবে বলে জানান তারা। বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যেসব দাবি করেছেন, তা যৌক্তিক এবং সমাধানযোগ্য।’

২০ জুলাই রাজধানীতে সহিংসতা ঠেকাতে র‌্যাবের হেলিকপ্টার টহল অব্যাহত ছিল। রাজধানীর বঙ্গভবন, গণভবন, বেতার ভবন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা অধিদফতর, সাব অফিস, থানা ভবন, জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাসভবন, সারা দেশের কারাগারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ব্যক্তিদের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

মোহাম্মদপুরের বসিলায়ও কোটা সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। বেলা ১১টার দিকে উত্তরার আজমপুর রেলগেট এলাকায় আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। দুপুর ১২টার দিকে আন্দোলনকারীরা আজমপুরে সেক্টর-৬-এ অবস্থিত হাইওয়ে পুলিশ সদর দফতরে আগুন দেয়ার চেষ্টা করেন। খবর পেয়ে পুলিশ তাদের টিয়ারগ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরে সন্ধ্যা পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশের থেমে থেমে সংঘর্ষ হয়। এদিন সিদ্ধিরগঞ্জে হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি ভবনে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় আন্দোলকারীরা। এতে ওই ভবনে থাকা হাইওয়ে পুলিশ সদস্যসহ শতাধিক মানুষ আটকা পড়ে যায়। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ গিয়ে হেলিকপ্টারের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করে। হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি ছাড়াও ওই ভবনে থাকা হাসপাতাল, ব্যাংক, চাইনিজ রেস্টুরেন্টসহ অর্ধশতাধিক দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় শনিবার দুপুরে পুলিশের সাথে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ ছাড়াও সভার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়েও হামলা-ভাঙচুর করা হয়। সাভার রেডিও কলোনিতে দফায় দফায় সংঘর্ষে আহত হন ২৫ জন। পরে সেনা সদস্যরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়া, কাজলায় রণক্ষেত্র পুলিশসহ ১২ জন নিহত : সেদিন শুধু যাত্রাবাড়ীর শনিরআখড়া, কাজলা এলাকায় গুলিতে নিহত ১৩ ছাত্র-জনতা। বুধবার রাত থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ একনাগাড়ে চলতে থাকে শনিবারও। মাঝে মধ্যে কিছুটা শিথিল হলেও ঘরে ফেরেনি কেউ। অলিগলিতে অবস্থান করে থেমে থেমে বিক্ষোভ করতে থাকে আন্দোলনকারীরা। যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়ার কাজলা থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত সড়কে চলা ভয়াবহ সংঘর্ষে এক পুলিশ সদস্যসহ দশজন নিহত হয়েছে। এরপরই শুরু হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভয়াবহ অ্যাকশন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মুহুর্মুহু গুলি-টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তাদের এলোপাতাড়ি ব্রাশফায়ারে কমপক্ষে ১২ জন নিহত হয়েছে। আহত হয় শতাধিক। এই এক স্থান থেকে একই সময়ে কমপক্ষে ১২ জনের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে।