বাংলাদেশের আর্থিক বাস্তবতার অন্তর্লেখা

সুদের ভারে ধুঁকছে বাজেট, উন্নয়ন ব্যয়ে ধীরগতি

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের চলতি অর্থবছর ২০২৫-২৬-এর প্রথম প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আর্থিক চিত্র এক জটিল কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরছে। একদিকে পরিচালন ব্যয়ের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেও অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয়ের গতি উদ্বেগজনকভাবে ধীর। একই সাথে সুদ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ বাজেট কাঠামোর ভেতরে এক ধরনের ‘নীরব সঙ্কট’ তৈরি করছে, যা অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথচলাকে প্রভাবিত করতে পারে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিচালন ব্যয়ের জন্য মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় মাঝারি হারে বৃদ্ধি পেলেও প্রকৃত চিত্র লুকিয়ে আছে ব্যয়ের গঠনে এবং ব্যবহারের ধরনে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই খাতে ব্যয় হয়েছে মোট বরাদ্দের ১৬.৯ শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সামান্য বেশি। এটি প্রাথমিকভাবে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত মনে হলেও গভীরে গেলে দেখা যায়- এই ব্যয়ের বড় অংশই যাচ্ছে এমন খাতে, যা অর্থনীতিতে সরাসরি উৎপাদনশীলতা বাড়ায় না।

সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো সুদ পরিশোধ খাত, যেখানে মোট পরিচালন ব্যয়ের ৩৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। অর্থাৎ, সরকারের আয় থেকে একটি বড় অংশ সরাসরি ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে, যা নতুন কোনো অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি করছে না।

সুদের ফাঁদ : বাজেটের নীরব সঙ্কট

সুদ পরিশোধের এই উচ্চ হার কেবল একটি সংখ্যাগত বিষয় নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত সঙ্কেত। যখন একটি দেশের বাজেটের বড় অংশ ঋণের সুদে ব্যয় হয়, তখন তা ঋণ পরিষেবার বোঝা হিসেবে পরিচিত হয় এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে- সুদ পরিশোধে ব্যয় : ২৬.২% (বরাদ্দের তুলনায়) এবং মোট ব্যয়ের অংশ : ৩৫%। এটি নির্দেশ করে যে, সরকারের ঋণনির্ভরতা বেড়েছে এবং নতুন ঋণ গ্রহণের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

খাতভিত্তিক বৈষম্য : কোথায় ব্যয়, কোথায় ঘাটতি?

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কিছু খাতে তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যয় হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয়ের গতি ধীর।

উচ্চ ব্যয়ের খাতের মধ্যে রয়েছে- কৃষি : ২৮.০%, শিক্ষা : ১৯.৩%, জননিরাপত্তা : ১৭.৯%, সংস্কৃতি ও ধর্ম : ১৭.৬%।

নিম্ন ব্যয়ের খাতের মধ্যে রয়েছে- স্বাস্থ্য, আবাসন, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ এবং পরিবহন ও যোগাযোগ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে- যেখানে স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও জ্বালানি খাত দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে কেন এই খাতগুলোতে ব্যয় তুলনামূলক কম?

প্রশাসনিক ব্যয়ের আধিপত্য : ব্যয়কে বৃহৎ খাতে ভাগ করলে দেখা যায়, প্রশাসনিক খাত এখনো বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে আছে। অর্থবছর ’২৬-এর বাজেটে প্রশাসনিক খাতের অংশ ৪৩.৩ শতাংশ, যা বিবেচ্য সময়ে বাস্তব ব্যয়ে কিছুটা কমে ৩১.৩ শতাংশ হলেও এখনো বড় অংশ।

অন্যদিকে সামাজিক অবকাঠামো (শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা) খাতে ব্যয় ২২.১ শতাংশ, যা তুলনামূলকভাবে কম।

এই প্রবণতা দেখায় যে, বাজেট কাঠামো এখনো প্রশাসনিক ব্যয়নির্ভর, যা উন্নয়নমুখী অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

সামাজিক সুরক্ষা নাকি অর্থনৈতিক চাপ?

অর্থনৈতিক শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী পরিচালন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ (৩৯%) যাচ্ছে ভর্তুকি ও নগদ সহায়তায়। এটি একদিকে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়ক হলেও অন্যদিকে এটি বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

বিশেষ করে, যদি এই ভর্তুকি যথাযথভাবে লক্ষ্যভিত্তিক না হয়, তবে এটি অপচয় ও অদক্ষতা তৈরি করতে পারে।

উন্নয়ন ব্যয় : ধীরগতির দীর্ঘ ছায়া

উন্নয়ন ব্যয়ের চিত্র আরো উদ্বেগজনক। অর্থবছর ’২৬-এ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ দুই লাখ ৪৫ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা হলেও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র ৪.৩২ শতাংশ।

এটি কিছুটা আগের বছরের তুলনায় উন্নত হলেও সামগ্রিকভাবে খুবই কম। সাধারণত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বছরের শুরুতে ধীরগতিতে শুরু হলেও এই হার থেকে বোঝা যায় প্রকল্প বাস্তবায়নে কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে।

উন্নয়ন খাতে অগ্রগতি : কোথায় আলোর রেখা?

যদিও সামগ্রিক চিত্র ধীর, কিছু খাতে অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়- কৃষি ও সংশ্লিষ্ট খাত : ১১.৪৩%, শিল্প ও বাণিজ্য : ১১.২১%, শিক্ষা : ৬.৩%, গৃহায়ন : ৭.২২%।

এগুলো দেখায় যে, উৎপাদনমুখী ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে।

বড় প্রকল্পে ধীরগতি : সম্ভাবনার অপচয়

পরিবহন ও যোগাযোগ, জ্বালানি, বড় অবকাঠামো প্রকল্প- এসব খাতে ব্যয়ের হার কম হওয়া অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।

কারণ, এসব খাত সরাসরি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সাথে যুক্ত।

উন্নয়ন ব্যয়ের বৃহৎ খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়- সামাজিক অবকাঠামো : ৪৮.২%, ভৌত অবকাঠামো : ২১.৫%, কৃষি : ১৯.৮%।

এটি দেখায় যে, সরকার মানবসম্পদ উন্নয়নকে গুরুত্ব দিচ্ছে, কিন্তু অবকাঠামো উন্নয়ন এখনো কাক্সিক্ষত গতিতে এগোচ্ছে না।

অর্থনীতির জন্য তিনটি বড় বার্তা

১. ঋণের চাপ বাড়ছে : সুদ পরিশোধের উচ্চ হার ইঙ্গিত দেয় যে, ঋণ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য প্রয়োজন। অন্যথায় এটি ভবিষ্যতে রাজস্ব ঘাটতি বাড়াতে পারে।

২. উন্নয়ন বাস্তবায়নে সংস্কার জরুরি : প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি দূর করতে প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানো জরুরি।

৩. ব্যয়ের গুণগত মান গুরুত্বপূর্ণ : শুধু ব্যয়ের পরিমাণ নয়, এর কার্যকারিতা ও প্রভাব নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সামনে কোন পথে অর্থনীতি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান আর্থিক চিত্র একটি সন্ধিক্ষণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে সামাজিক সুরক্ষা ও পরিচালন ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিকে গতিশীল করতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- সুদ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ। এটি যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তবে ভবিষ্যতে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংকুচিত হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রধান করণীয়- ঋণ ব্যবস্থাপনায় কৌশলগত সংস্কার; উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বৃদ্ধি এবং ভর্তুকি ও সামাজিক ব্যয়ে দক্ষতা নিশ্চিত করা।

অর্থনীতির এই জটিল সমীকরণে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সাথে সবচেয়ে বড় সুযোগ।