আবদুল কাদের তাপাদার সিলেট ব্যুরো
সিলেটে প্রচলিত আইনকানুন ও আদালতের রায় উপক্ষো করে টিলা ও পাহাড় কেটে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ঘরবাড়ি নির্মাণের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন উপজেলার পাহাড়-টিলা বেষ্টিত এলাকায় অবাধে বাড়িঘর নির্মাণ করে বসবাস এক বিপজ্জনক ও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য হেরিটেজ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের পরিসংখ্যানে জানা গেছে, শুধু সিলেট জেলায় পাহাড়-টিলায় বা টিলার নিচে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন প্রায় ১২ হাজার মানুষ। ফলে প্রতি বছর টিলা ধসে প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটছে। বর্ষাকালে অবিরাম বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড় ও টিলার মাটি নরম হয়ে মাটি চাপা পড়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেই হইচই শুরু হয়। তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। গণমাধ্যমে ঘটনার সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে।
এ দিকে জেলা প্রশাসক পরিদর্শনে যান। ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এর সবই থেমে যায়। সিলেট শহরতলীর পাহাড়ি টিলা বেষ্টিত এলাকা ছাড়াও জেলার সিলেট সদর, গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, বিয়ানীবাজার, কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুরসহ সিলেট বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় পাহাড়-টিলায় গত দেড় দশকে গড়ে উঠেছে অবৈধ বসতি। দিন দিন এসব এলাকায় পাহাড়-টিলা কেটে অথবা টিলার পাদদেশে এক ভয়ঙ্কর বসতি গড়ে উঠেছে। টিলা ও পাহাড় কেটে টিনের আধা পাকা কিংবা পাকা দালান তোলা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে যখন একাধারে বৃষ্টি হয় তখন ঘরবাড়ি ধসে পড়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সিলেটে টিলা ও পাহাড় নিয়ে কাজ করছে পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। এ সংস্থার সিলেটের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ শাহেদা আখতার নয়া দিগন্তকে সোমবার তথ্য জানিয়ে বলেন, গত এক যুগে পাহাড়-টিলা ধসে ৬২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তিনি জানান, ‘সিলেটে প্রায় প্রতি বছর বর্ষাকালে টিলা ও পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। পাহাড়-টিলার পাদদেশে বসবাস করা পরিবারগুলো সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য নেই সিলেট জেলা প্রশাসনের কাছে। প্রতি বছর টিলাধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে তদন্ত কমিটি গঠন করেই দায়িত্ব পালনের অনেকটা ইতি টানে প্রশাসন। অথচ গত ২০১২ সালে টিলার পাদদেশের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার উচ্চ আদালতের আদেশ গত এক যুগেও বাস্তবায়ন হয়নি।’
গত রোববার সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার লক্ষণাবন্দ এলাকায় টিলাধসে ঘুমন্ত একটি পরিবারের স্বামী-স্ত্রী ও দুই সন্তানের প্রাণহানি ঘটনা ঘটলে সমগ্র সিলেটে শোকাভিভূত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মাটি চাপাপড়া চারজনের লাশ দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টায় সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় উদ্ধার করা হয়। টনক নড়ে ওঠে জেলা প্রশাসন। কর্তাব্যক্তিরা নিহতদের বাড়িতে যান এবং ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেন। গত বছরের ১০ জুন সিলেট নগরের মেজরটিলা চামেলিবাগ এলাকায় টিলাধসে স্বামী-স্ত্রী ও তাদের এক সন্তানের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটে। ২০২২ সালের ৬ জুন সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়নের পূর্ব সাতজনি গ্রামে টিলাধসে একই পরিবারের চারজনের প্রাণহানি ঘটে। এভাবে প্রতি বছর টিলাধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। সিলেট জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহমুদ মুরাদ সোমবার নয়া দিগন্তকে জানান, ‘এই বছর মে মাসের মাঝামাঝিতে পাহাড়-টিলার পাদদেশে বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নিদের্শ দেয়া হয়েছে। এলাকাগুলোতে মাইকিং করে তাদের বলা হলে অনেকে সরে যান। কিন্তু কেউ কেউ প্রশাসনের এই নির্দেশকে উপেক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাস করছিলেন। গোলাপগঞ্জে চারজনের প্রাণহাণির ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের সাথে নিয়ে মাইকিংয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন পাহাড়-টিলায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেভ দ্য হেরিটেজ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে সিলেটে টিলার পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস করা মানুষের পরিসংখ্যান নিয়ে একটি জরিপ করে। জরিপে দেখা গেছে, সিলেট শহরতলী ও বিভিন্ন উপজেলায় টিলা কেটে পাদদেশে ১০ হাজার মানুষ ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাস করছে। এরপর আর কোনো জরিপ চালানো হয়নি। বর্তমানে এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
সেভ দ্য হেরিটেজ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের প্রধান সমন্বয়ক আবদুল হাই নয়া দিগন্তকে জানান, ‘আমরা যখন জরিপ চালিয়েছি এরপর অনেক টিলা কেটে ঘরবাড়ি বানানো হয়েছে। এই সংখ্যা আরো দুই থেকে তিন হাজার বাড়তে পারে।’ তিনি বলেন, জরিপের সময় আমরা দেখেছি প্রভাবশালী মহল টিলার একাংশ কেটে সাথে সাথে টিনের আধা পাকা কিংবা পাকা দালান তৈরি করেন। বর্ষা মৌসুমে যখন মুষলধারে বৃষ্টি হয় তখন টিলা ধসে ঘরবাড়িতে আছড়ে পড়ে। তখন মাটিচাপায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ শাহেদা আখতার জানান, ১৩ বছর আগের উচ্চ আদালতের রায় দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক বরাবরে চিঠি দেয়া হয়েছে। অথচ থামেনি টিলা কাটা। থামেনি টিলার পাদদেশের বাসিন্দাদের মাটিচাপা পড়ে প্রাণহানির ঘটনা।
‘টিলা কাটা রোধে উচ্চ আদালতের রায়, আদেশসংবলিত সাইনবোর্ড লাগানো প্রসঙ্গ’ শিরোনামে জেলা প্রশাসককে দেয়া বেলার ওই চিঠিতে সিলেট সদর, গোয়াইনঘাট, বিয়ানীবাজার, কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় বিদ্যমান পাহাড়, টিলা কর্তন রোধে ২০১১ সালে একটি জনস্বার্থমূলক মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ১ মার্চ আদালতের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, পাহাড়, টিলা কর্তন থেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করে আদালত। একই সাথে পাহাড়, টিলা কর্তনের সাথে জড়িতদের শাস্তি প্রদান, পাহাড়ে বিদ্যমান দখলদার উচ্ছেদ এবং পুনরায় অবশিষ্ট পাহাড়, টিলা কর্তন রোধ ও পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। সেই সাথে আইন অনুযায়ী উল্লিখিত এলাকার স্থানীয় জনসাধারণের স্বার্থ, জীবনের ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশও ছিল আদালতের। এমন নির্দেশনার পরও কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় সিলেট সদর উপজেলার টুকের বাজার ইউনিয়নের জাহাঙ্গীরনগর, খাদিম, বালুচর, জৈন্তাপুর উপজেলার গোয়াবাড়ী, শ্রীপুর, হরিপুর, ঠাকুরের মাটি এলাকায় টিলা কাটা চলছে বলে দাবি করে বেলা।
এ ব্যাপারে সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ নয়া দিগন্তকে বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুসারে আমরা আমাদের তৎপরতা অব্যাহত রেখেছি। মে মাসের মাঝামাঝি থেকে মাইকিং, দফায় দফায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। শিগগিরই আরো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেট সদর উপজেলার আখালিয়া, ব্রাহ্মণশাসন, দুসকি, টিলারগাঁও, মেজরটিলা, খাদিমনগর, খাদিমপাড়া, বালুচর, পাঠানটুলা গুয়াবাড়ি জাহাঙ্গীরনগর, আখালিয়া বড়গুল এলাকার মুক্তিযোদ্ধা টিলাসহ পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে ঘর বানিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে বসবাস করছে সহস্রাধিক পরিবার। বাসিন্দারা কেউ ঘর ভাড়া নিয়েছেন, কেউ নামমাত্র টাকা দিয়ে দখলদারদের কাছ থেকে জায়গা কিনেছেন।
ফেঞ্চুগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, গোলাপগঞ্জ ও জৈন্তাপুর উপজেলাসহ সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় রয়েছে বেশ কিছু পাহাড়-টিলা। পরিবেশ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে সিলেটের ৬১টি টিলা নিশ্চিহ্ন হয়েছে। জেলার ৪১২টি পাহাড়-টিলার মধ্যে এখন টিকে আছে মাত্র ৩৫১টি। সরকারি হিসাবে ধ্বংস হওয়া টিলার সংখ্যা ৬১টি বলা হলেও পরিবেশ নিয়ে কাজ করছে- এমন বেসরকারি সংস্থাগুলোর দাবি, গত দেড় দশকে শতাধিক টিলা নিশ্চিহ্ন হয়েছে।
পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেটের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগে এক হাজার ৭৪৫টি টিলা রয়েছে। টিলাভূমির পরিমাণ দুই হাজার ৭৪৯ দশমিক ৫০ একর। এর মধ্যে সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে বেশির ভাগ টিলা। সুনামগঞ্জের ছাতক, দোয়ারাবাজার, ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলায় ১০৫টি টিলা রয়েছে। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে ৬১৫টি টিলা রয়েছে। এর মধ্যে ১৯১টি টিলা খাস খতিয়ানভুক্ত।
সিলেট সিটি করপোরেশন, সদর উপজেলা, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ ও জৈন্তাপুরে এক হাজার ২৫টি টিলা রয়েছে এবং ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মাইজগাঁও এবং সদর ইউনিয়নে ২৫১ একর টিলাভূমি রয়েছে। এসএ রেকর্ড অনুযায়ী, সিলেট জেলায় ২০০৯ সালে টিলার সংখ্যা ছিল এক হাজার ২৫টি আর বর্তমানে এর সংখ্যা মাত্র ৫৬৫টি।



