সাক্ষাৎকার : ড. মাহদি মৌলায়ী আরানি

ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে কেউ কি ছিল না ফিলিস্তিনিদের পাশে

রাশিদুল ইসলাম
Printed Edition
ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে কেউ কি ছিল না ফিলিস্তিনিদের পাশে
ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে কেউ কি ছিল না ফিলিস্তিনিদের পাশে

ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কাউন্সিলর ড. মাহদি মৌলায়ী আরানি বলেছেন, গাজায় ৮০ হাজার ফিলিস্তিনিকে ইসরাইল নির্মমভাবে হত্যা করেছে কিন্তু তা মোকাবেলায় বিশ্ব কিছুই করতে পারেনি। আগামী ৫০ বছর পর যখন ইতিহাস লেখা হবে তখন মানুষ প্রশ্ন করবে, ফিলিস্তিনিদের হত্যার সময় মুসলিম বিশ্বে কি কোনো নেতা ছিল না, কোনো বুদ্ধিজীবী ছিল না, মানবতাবাদিরা ছিল না, তারা কী করেছে, এত মানুষকে কিভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে? বিশ্বে তখন এত মুসলমান ছিল তারা কী করেছে?

ড. মাহদি ইরানে এক আলেম সমাবেশে শহীদ আয়াতুল্লা খামেনীর বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, গাজায় যে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হয়েছে, পরকালে আল্লাহ আমাদের ফিলিস্তিনি ভাইবোনদের হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে অবশ্যই প্রশ্ন করবেন। এবং এর জবাব আমাদেরকে অবশ্যই দিতে হবে। বিশ্বে দুই বিলিয়নের বেশি মুসলমান থাকার পরও ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে, আমরা শুধু কষ্ট পেয়েছি, সমবেদনা জানাচ্ছি কিন্তু তাদের বাঁচাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। সম্প্রতি মার্কিন সেনারা সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইরানের সিরিক শহরের কুহেস্তাক এলাকার এক সম্মানিত পরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠানে সরাসরি বিমান হামলা চালিয়ে আনন্দের আয়োজনকে শোকের অনুষ্ঠানে পরিণত করেছে।

মার্কিন বাহিনীর ওই বর্বরোচিত হামলায় কমপক্ষে পাঁচজন শহীদ হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরো অন্তত ৭০ জন। ইসলামের শত্রুদের এমন বর্বরোচিত হামলা এটাই প্রথম নয়।

অতীতে ইরাক, ইয়েমেন ও আফগানিস্তানে বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলা করে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। এ ধরনের হামলার প্রথমেই যদি বিশ্বের মানবতাবাদী মানুষ প্রতিবাদ জানাতো, দুর্বার প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতো, তাহলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি করার সাহস কেউ পেত না। ইহুদিবাদী ইসরাইল গাজা, সিরিয়া ও লেবাননসহ বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে হামলা, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের অব্যাহত এ আগ্রাসন থেকে এটা সবার কাছে স্পষ্ট যে, ইহুদিবাদী ইসরাইল মুসলমানদের অভিন্ন শত্রু। মুসলমানদের দুর্বল করতে এমন কোনো ষড়যন্ত্র নেই যে তারা করে না। তবে বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের পক্ষে ইরানের ভূমিকা ও অবস্থান বিশ্বের মানুষ দেখছে।

ড. মাহদি নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন।

মক্কা প্যাক্টকে ইতিবাচক উদ্যোগ অভিহিত করে তিনি বলেন, ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশগুলোর এ ধরনের চিন্তাকে স্বাগত জানাই। কয়েক বছর আগে ইরান মুসলিম দেশগুলোকে এ ধরনের প্রস্তাবের আহ্বান জানিয়েছিল। ঢাকায় ইরানি রাষ্ট্রদূত এ চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। যে তিনটি দেশ মক্কা প্যাক্টে চুক্তি করেছে তাদের মধ্যে কোনো বিজাতীয় দেশ নেই। সব মুসলিম দেশের উচিত এই প্যাক্টে যোগ দেয়া। ইরানকে এ প্যাক্টে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানালে ইরান অবশ্যই বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে। মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে এটা নিঃসন্দেহে একটা ভালো দিক। মুসলিম উম্মাহ ঐক্যব্ধ হলে কোনো অপশক্তিই মুসলমানদের ক্ষতি করতে পারবে না।

নয়া দিগন্ত : মক্কা প্যাক্ট কতদূর যেতে পারবে?

ড. মাহদি : অনেক মুসলিম দেশ এখন এ উপলব্ধিতে পৌঁছতে পারছে যে, তারা ঐক্যবদ্ধ হলে নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে। নিরাপত্তার জন্য বিজাতীয়দের সহায়তার প্রয়োজন হবে না। ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এই চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গী থেকে যখন সব মুসলিম দেশ মক্কা প্যাক্টে যোগ দেবে তখন তা কার্যকর হয়ে উঠবে এবং ইসলামের শত্রুদের যেকোনা ষড়যন্ত্র তারা মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে।

নয়া দিগন্ত : প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ দাবি করে বলছেন এ প্রণালীর নাম ট্রাম্প প্রণালী হওয়া উচিত?

ড. মাহদি : বিশ্ব দেখছে হরমুজ প্রণালী কাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ট্রাম্পের এমন প্রস্তাবে মানুষ অবাক, এমন দাবি হাস্যকর। এখন মিডিয়ার হেডলাইন পরিবর্তনের চেষ্টা হচ্ছে। যুদ্ধ শুরু করার সময় মাইক্রোফোনের সামনে এসে ট্রাম্প বলেছিলেন, ২/৩ দিনের মধ্যে বা সর্বোচ্চ এক সপ্তাহের মধ্যে ইরান শেষ হয়ে যাবে। অথচ এখন পর্যন্ত আমেরিকার কোনো লক্ষ্যই অর্জিত হয়নি। তারা এমন এক জালে আটকে গেছে যে, সেখান থেকে আর বের হতে পারছে না। হরমুজ প্রণালী তো কোনো দিন অবরুদ্ধ ছিল না। সব দেশের জাহাজ চলাচলের জন্যে খোলা ছিল। আমেরিকার কারণেই এখন হরমুজ আটকে গেছে। চার মাস ধরে ট্রাম্প বলেই যাচ্ছেন তিনি হরমুজ প্রণালী খুলে দেবেন। এই সঙ্কটের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনই দায়ী।

যারা বিশ্বে সবচেয়ে ক্ষমতাধর বলে দাবি করে তারা এখন হরমুজ সমস্যার সমাধান করতে পারছে না। এটা তাদের জন্য লজ্জাজনক পরাজয়। তাদের এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে বিশ্বের মুসলমানদের উপলব্ধি করার সময় এসেছে যে, ঈমান ও আল্লাহর শক্তিতে বলিয়ান হলে যেকোনো অন্যায় মোকাবেলা করা করা সম্ভব। শত্রু যত শক্তিশালীই হোক না কেন। ইরানি জাতির এ বিশ্বাস মুসলিম দেশগুলো ধারণ করে রুখে দাঁড়ালে মুসলমানরা যেকোনো আগ্রাসন মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে।

নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশের মানুষের প্রতি আপনার বার্তা কি?

ড. মাহদি : ভ্রাতৃপ্রতিম এ দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে। এটা কেউ বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। বাংলাদেশের মানুষ রাস্তায় নেমে এসে যুদ্ধে ইরানের পক্ষে সমর্থন দিয়েছে। এ দেশের গণমাধ্যমগুলো ইরানের পক্ষে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করেছে। ইরানি জাতির পক্ষ থেকে আমরা এজন্য বাংলাদেশের সরকার, জনগণ ও সংবাদিক ভাইদের আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। দু’টি দেশের মধ্যে রাজনীতি ও অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে এবং তা নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। নয়া দিগন্ত প্রকৃত সত্য সাহসিকতার সাথে তার পাঠকের কাছে তুলে ধরছে, এ ক্ষেত্রে সব ধরনের বাধা উপেক্ষা করে আপনারা অসহায় বঞ্চিত মানুষের কথা তুলে ধরছেন। দেখুন ইরানের মিনাবে স্কুলে শিক্ষার্থীরা বর্বরোচিত হামলা থেকে রেহাই পায়নি। স্কুলটি সুন্নী অধ্যুষিত এলাকায়। এখানে কোনো শিয়া সুন্নীর বিষয় নেই। ওরা অমানবিকভাবেই হামলা করে যাচ্ছে।

বছরের পর বছর ইসরাইল ফিলিস্তিনে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে গেলেও কোনো বাধার মুখে পড়েনি। এখন ইরান ইসরাইল ও আমেরিকার আক্রমণকে রুখে দেয়ার পর, শক্ত জবাব দেয়ার পর সারা বিশ্বের মানুষ বুঝতে পারছে, তারাই বিশ্বের একক শক্তির অধিকারী নয়। তাদেরও রুখে দেয়া সম্ভব। সাত/আট মাস আগেও যদি কেউ প্রশ্ন করত ইরানের সাথে আমেরিকা ও ইসরাইলের যুদ্ধ হলে এর ফলাফল কি হবে? মোটামুটি সবাই একবাক্যে বলত এক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হবে। মানুষের এই ধারণা তৈরিতে বড় ভূমিকা পালন করে গণমাধ্যম। কোনো দেশের অভিমুখে মার্কিন যুদ্ধ জাহাজ রওনা দিলে এমন ধারণা দেয়া হয় আর রক্ষা নাই। কিন্তু ইরান অভিমুখে মার্কিন যুদ্ধ জাহাজ রওনা দিয়ে ফের পালিয়েছে। এসব ঘটনায় বিশ্বের মুসলমানরা বাস্তব ও প্রকৃত ঘটনা উপলব্ধি করতে পারছে। পশ্চিমা গণমাধ্যম, আমেরিকা ও ইসরাইলের গণমাধ্যমগুলো পরাশক্তিগুলো সম্পর্কে এক ধরনের ভয়ের ধারণা উৎপাদন করে যা ইরান ভেঙে দিয়েছে। মানুষের প্রকৃত বাস্তবতা বোঝার সময় এসেছে। আগ্রাসী শক্তির মোকাবেলায় প্রতিরোধ করা সম্ভব এ ধারণা বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে।

নয়া দিগন্ত : যুদ্ধ পুরোপুরি থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, ইরানের শক্তির উৎস কোথায়?

ড. মাহদি : আমেরিকা ও ইসরাইল তাদের এই পরাজয়ের শোধ নিতে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করবে। ২০১৮ সালে আরব বসন্তকে ব্যর্থ করতে সিরিয়ায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল সৃষ্টি করা হয়। এখন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ আনছে। অথচ এসব দেশে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতেই কেবল ইরান হামলা করেছে, কারণ ওসব ঘাঁটি থেকে ইরানে হামলা করা হয়েছে। ইরান এ ব্যাপারে আগেই সাবধান করেছিল। বিশ্বের বৃহৎ শক্তিধর দেশগুলো একত্র হয়ে একটা দেশের ওপর হামলা চালাল এবং সেই হামলায় সর্বোচ্চ নেতা, শীর্ষ সামরিক কমাণ্ডার, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যক্তি, বিজ্ঞানীরা শহীদ হলো। সাধারণত কোনো যুদ্ধে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব মারা গেলে অন্য সেনারা পিছু হটে যায়। কিন্তু ইরান তারপরও ঘুরে দাঁড়িয়ে শক্ত জবাব দিয়েছে, বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছে। পবিত্র কুরআনের বাণীর ওপর বিশ্বাস রেখেই ইরানি জাতি এ যুদ্ধ মোকাবেলা করেছে। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, সম্মান দেয়ার মালিক আল্লাহ এবং ইজ্জত তার হাতেই রয়েছে। আয়াতুল্লাহ খামেনী শহীদ হওয়ার পরও ওনার চেতনা ও শাহাদতের প্রেরণা থেকে ইরানিরা যুদ্ধ করেছে। খোদায়ী শক্তির সাহায্য নিয়ে যারা মোকাবেলা করে তারা কখনো পরাজিত হয় না। ইরানের শক্তিশালী সাহিত্য, সংস্কৃতি আগ্রাসন মোকাবেলায় ভূমিকা রেখেছে। শাহনামায় বলা হয়েছে, ইরানের অস্তিত্ব না থাকলে আমার দেহের কোনো মূল্য নেই। এই কবিতা ইরানিদের অনুপ্রেরণা দিয়েছে। এখানে কোনো শিয়া সুন্নী বিভেদ নেই। তাদের চেতনা হচ্ছে জীবনের চেয়ে দেশের মূল্য অনেক বেশি। এ যুদ্ধে প্রাচ্য জয়ী হয়েছে এবং কয়েক দশকে এমন ঘটনা ঘটেনি। দেখুন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইরানিরা পালায়নি, তারা রাস্তায় নেমে উদ্ধার কাজে অংশ নিচ্ছে। দেশ ছেড়ে পালায়নি। বরং অন্য দেশ থেকে অসংখ্য ইরানি দেশে ফিরেছে। বিমান চলাচল বন্ধ থাকলেও সড়ক পথে তারা ফিরেছে। মানুষের মনোবল, তাদের সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের ওপর যুদ্ধের জয়পরাজয় নির্ভর করে। তারা ইরাকে, আফগানিস্তানে, ভিয়েতনামে পরাজিত হয়েছে। ইরানিরা কখনোই বিজাতির কাছে পরাজয়বরণ করেনি।