- দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতের লুটেরারা অধরা
- ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিদ্যুৎ না দিয়েই ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা লোপাট
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে ‘কুইক রেন্টাল’ শব্দটি এখন আর শুধু একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার নাম নয়; এটি পরিণত হয়েছে একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংস্কৃতিতে। জরুরি বিদ্যুৎ উৎপাদনের অজুহাতে আওয়ামী দুঃশাসনের দেড় দশকে (২০০৯-২০২৪) যে কুইক রেন্টাল চুক্তিগুলোর সূচনা হয়েছিল, সেগুলোর বেশির ভাগের মেয়াদ শেষ হলেও এর উত্তরাধিকাররা এখনো বহাল। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায় শুধু ক্যাপাসিটি চার্জের নামেই হাতিয়ে নেয়া হয়েছে এক লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই জনগণের পকেট থেকে এ অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেয়ার সাথে জড়িত লুটেরারা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের কালো আইন বাতিল করলেও এ কালো আইনের মাধ্যমে যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো স্থাপন হয়েছে সেগুলোর বেশির ভাগেরাই চুক্তি এখনো সংশোধন হয়নি। যার মধ্যে ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধ হয়েছে এমন বিদ্যুতের জন্য, যা আদৌ উৎপাদিত হয়নি। প্রশ্ন উঠছে, বিদ্যুৎ খাতের এই বিপুল লুটের দায় নেবে কে? কুইক রেন্টাল চুক্তি শেষ হলেও কারা এখনো এর সুবিধা ভোগ করছে, আর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কি সত্যিই শেষ হয়েছে?
তৎকালীন সরকারের দাবি ছিল, এসব কেন্দ্র হবে স্বল্পমেয়াদি তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য। বড় ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হলে কুইক রেন্টাল বন্ধ করে দেয়া হবে। বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। একের পর এক চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে একই উদ্যোক্তারা নতুন নামে ও নতুন শর্তে আবার চুক্তি পেয়েছেন। ফলে জরুরি ব্যবস্থা ধীরে ধীরে স্থায়ী কাঠামোয় রূপ নেয়।
কারা লাভবান : বিদ্যুৎ না দিয়েই মুনাফা
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সঙ্কটকে ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার ছাড়াই বিশেষ বিধান আইনের আওতায় কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেয়া হয়। একই সাথে প্রণয়ন করা হয় দায়মুক্তি আইন, যার ফলে চুক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো অনিয়ম হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও সরকারি নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, কুইক রেন্টাল খাত থেকে লাভবান হয়েছে নির্দিষ্ট একটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠী। এদের মধ্যে রয়েছে, প্রভাবশালী শিল্পগ্রুপ, যাদের বিদ্যুৎ, জ্বালানি, এলএনজি ও অবকাঠামো খাতে একাধিক বিনিয়োগ, রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী পরিবার, যারা ক্ষমতাসীন দলের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক বজায় রেখেছে ও বিদেশী অংশীদারত্বে পরিচালিত কোম্পানি, যাদের স্থানীয় অংশীদাররা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী। এই প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন করুক বা না করুক, ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ নামের নিশ্চয়তাপূর্ণ পরিশোধের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ পেয়েছে। অনেক কেন্দ্র বছরের অধিকাংশ সময় অলস পড়ে থাকলেও সরকারকে নিয়মিত বিল পরিশোধ করতে হয়েছে।
ক্যাপাসিটি চার্জ : বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই টাকা
ক্যাপাসিটি চার্জ এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক, নির্দিষ্ট সক্ষমতা প্রস্তুত রাখার জন্য কেন্দ্র মালিককে অর্থ দেয়া হয়। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার যুক্তিতে এ ব্যবস্থা চালু হলেও বাস্তবে এটি বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অপচয়ের বাজার সৃষ্টি করেছে।
শ্বেতপত্র অনুযায়ী, ২০১০-১১ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ে বেসরকারি খাতে ক্যাপাসিটি ও রেন্টাল বাবদ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু অব্যবহৃত বা অতিরিক্ত সক্ষমতার জন্যই গুনতে হয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি।
২০১৮-২৪ এই পাঁচ বছরে দেশের পুরো বিদ্যুৎব্যবস্থার গড় প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর ছিল মাত্র ৪২ থেকে ৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ স্থাপিত সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে, অথচ পুরো সক্ষমতার জন্যই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।
তেলভিত্তিক কেন্দ্র : সবচেয়ে ব্যয়বহুল অধ্যায়
শ্বেতপত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে এইচএসডি ও এইচএফওভিত্তিক তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিয়ে। ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে বিশেষ বিধান আইনের আওতায় অনুমোদিত এসব কেন্দ্র-এইচএসডি কেন্দ্রগুলো পেয়েছে ১৫ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা ও এইচএফও কেন্দ্রগুলো পেয়েছে ৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ। অথচ আলোচ্য পাঁচ বছরে এইচএসডি কেন্দ্রগুলোর গড় প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর ছিল মাত্র ৩২ শতাংশ, আর এইচএফও কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে তা নেমে এসেছে ৯.২২ শতাংশে। অর্থাৎ অধিকাংশ সময় এসব কেন্দ্র বসে থেকেছে, কিন্তু মালিকেরা নিয়মিত অর্থ পেয়েছেন।
১০০০ মেগাওয়াট, বিদ্যুৎ নেই : ২০১৮ সালে পাঁচ বছরের জন্য অনুমোদিত ছয়টি এইচএসডি ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ছিল ১,০০০ মেগাওয়াট। প্রতিটি কেন্দ্রের জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ করা হয় প্রায় ২০ ডলার প্রতি কিলোওয়াট-মাস। বাস্তবে এসব কেন্দ্র গড়ে ১০ শতাংশেরও কম সক্ষমতায় চালানো হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন ছাড়াই ৯০ শতাংশ সক্ষমতার বিপরীতে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। শ্বেতপত্রের মতে, এসব কেন্দ্র শুধু চরম পরিস্থিতিতে ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি; বিদ্যমান এইচএফও কেন্দ্র দিয়েই চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল।
‘উইন্ডফল প্রফিট’ ও ক্রনি ক্যাপিটালিজম : ২০১০-১১ সালে অনুমোদিত রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো স্বাভাবিকভাবে ১৫ শতাংশ মুনাফার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক কেন্দ্র ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত লাভ করেছে। এতে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার উইন্ডফল প্রফিট অর্জিত হয়েছে।
শ্বেতপত্রে সরাসরি অভিযোগ তোলা হয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র বরাদ্দে রাজনৈতিক বিবেচনা, আড়ালের লেনদেন ও স্বজনপ্রীতিমূলক পুঁজিবাদ (ক্রনি ক্যাপিটালিজম) বিদ্যমান ছিল। প্রকৃত চাহিদা ও জ্বালানি সংস্থান নিশ্চিত না করেই কেন্দ্র অনুমোদন দেয়ায় একদিকে অতিরিক্ত সক্ষমতা সৃষ্টি হয়েছে, অন্য দিকে গ্যাস সঙ্কটে অনেক কেন্দ্র অলস পড়ে থেকেছে।
রাষ্ট্রীয় ক্ষতি ও ভোক্তার বোঝা : এই ব্যবস্থার চূড়ান্ত বোঝা গিয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা, বিদ্যুতের দাম একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে, আর চাপ বেড়েছে জাতীয় বাজেটে। বিদ্যুৎ থাকলেও জ্বালানি সঙ্কটে উৎপাদন সম্ভব না হওয়ায় জনগণের প্রশ্ন আরো তীব্র হয়েছে; বিদ্যুৎ না পেলে বিল কেন দিতে হবে?
কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎব্যবস্থা আজ আর অতীতের গল্প নয়; এটি এখনো বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান বাস্তবতার অংশ। চুক্তির নাম বদলেছে, আইনি কাঠামো আংশিক বদলেছে, কিন্তু সুবিধাভোগী ও নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রবিন্দু প্রায় একই রয়ে গেছে। শ্বেতপত্র স্পষ্ট করে দিয়েছে বিদ্যুৎ খাতের মূল সমস্যা সক্ষমতার ঘাটতি নয় বরং অদক্ষ পরিকল্পনা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও জবাবদিহিহীন ক্যাপাসিটি চার্জ ব্যবস্থা। প্রশ্ন একটাই- এই ব্যয়ের দায় নেবে কে, আর ভবিষ্যতে কি এই চক্র সত্যিই ভাঙা যাবে নাকি কুইক রেন্টালের গল্প নতুন মোড়কে চলতেই থাকবে?



