বিশেষ সংবাদদাতা
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট দেবেন ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে ভোট গ্রহণ। ভোট শেষে সেখানেই গণনা শুরু হবে এবং প্রাথমিক ফল ঘোষণা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতসহ ১১ দলীয় ঐক্যের কর্নেল (অব:) অলি আহমদ বীর বিক্রম। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দুই প্রার্থীর কেউই প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় হচ্ছে ভোটের লড়াই। নির্বাচনীকর্তা ও সিইসি বলেন, এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বৈচিত্র্য হলো প্রকাশ্য বা ‘ওপেন’ ব্যালটে ভোটদান। ব্যালটপত্রে ভোটার ও প্রার্থীদের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। ফলে একজন এমপি কাকে ভোট দিয়েছেন, তা ভোটকক্ষে উপস্থিত অন্যদের কাছে দৃশ্যমান হবে।
বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ‘নির্বাচনী কর্তা’ এ এম এম নাসির উদ্দিন এই তথ্য জানান।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর। এরপর বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপতি পদে একক প্রার্থী থাকায় সংসদ সদস্যদের ভোট দেয়ার প্রয়োজন হয়নি। ফলে এবারের নির্বাচন প্রায় সাড়ে তিন দশক পর সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রত্যাবর্তন।
ভোটের জন্য বৈঠক আহ্বান সিইসির
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য জাতীয় সংসদ অধিবেশন চলমান থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে বলা আছে, সংসদ অধিবেশনের বাইরে অন্য কোনো সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজন হলে স্পিকারের সাথে আলোচনা করে ভোটের দিন ঠিক করবে নির্বাচন কমিশন। ভোট গ্রহণের দিনে সংসদ সদস্যদের বৈঠক আহ্বান করা হবে। এ বৈঠকটি আহ্বান করেন সিইসি। ওই বৈঠকে সভাপতিত্বও করবেন তিনি। সেই বিধান অনুযায়ী সিইসি ও নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন গত ১১ আগস্ট বৈঠক আহ্বান করে প্রজ্ঞাপন জারি করেন। সিইসির পক্ষে ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমদের সই করা এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
গোপন নয়, প্রকাশ্য ব্যালট
এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো ভোটের ধরন। এমপিরা গোপন ব্যালটে ভোট দেবেন না। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর বিধান অনুযায়ী প্রকাশ্য ব্যালটেই ভোট হবে। ব্যালট পেপারের একটি অংশে থাকবে ক্রমিক নম্বর, সংসদ সদস্যের নাম ও বিভক্তি নম্বর। এই অংশে পূর্ণনাম স্বাক্ষর করে ব্যালট গ্রহণ করবেন সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য। মূল ব্যালট অংশে প্রার্থীদের নাম থাকবে বাংলা বর্ণমালার ক্রমানুসারে। প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে সংসদ সদস্যকে পূর্ণনাম স্বাক্ষর করে ভোট দিতে হবে। পরে ব্যালট নির্ধারিত বাক্সে জমা দিতে হবে। সাধারণ নির্বাচনের মতো ভোটের পছন্দ গোপন থাকবে না। কে কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা ভোটের প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান থাকবে। নির্বাচন কমিশন এই পদ্ধতিকে আইনসম্মত এবং স্বচ্ছতার অংশ হিসেবে দেখছে।
এর আগে ব্যালট পেপারের গঠন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, প্রতিটি ব্যালট পেপারে দুটি অংশ থাকবে-মুড়ি অংশ এবং মূল ব্যালট। মুড়ির অংশে প্রার্থীর ক্রমিক নম্বর, ভোটারের নাম, বিভক্তি নম্বর ও স্বাক্ষরের ঘর নির্ধারিত থাকবে। ডানদিকের মূল ব্যালটে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম থাকবে এবং পাশে থাকা ফাঁকা স্থানে ভোটার সংসদ সদস্য তার পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে পূর্ণনাম লিখে স্বাক্ষর করবেন। ভোটার সংসদ সদস্যদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে কক্ষে তিনটি স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স স্থাপন করা হবে, যার যেকোনো একটিতে তারা ভোট কাস্ট করতে পারবেন।
দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোটের সুযোগ নেই
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোটের স্বাধীনতা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বহাল থাকায় এমপিরা নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারবেন না বলে এর আগে জানিয়েছেন সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে এমপি পদ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে ভোট প্রকাশ্য হওয়ায় ফলাফলের পাশাপাশি দলীয় সিদ্ধান্তের সাথে এমপিদের ভোটের সামঞ্জস্যও সহজেই দৃশ্যমান হবে।
ভোট শেষে দ্রুত ফল
এই নির্বাচনী কর্তা বলেন, জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ করা হবে। ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই শুরু হবে গণনা। কতজন সংসদ সদস্য ভোট দিয়েছেন, কতটি ভোট বৈধ ও বাতিল হয়েছে এবং কতটি ব্যালট অব্যবহৃত রয়েছে- গণনার সময় এসব হিসাব করা হবে। সর্বাধিক বৈধ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে প্রাথমিকভাবে বিজয়ী ঘোষণা করবেন প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তা। পরে এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করা হবে। ভোটগ্রহণ ও গণনার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের ভোটদান ও ফল গণনার অংশ বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে।
সংসদকক্ষেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায়
প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট হয়নি। একক প্রার্থী থাকায় পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনগুলো কার্যত ভোট ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচন শুধু নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; দীর্ঘ বিরতির পর সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক ঘটনা। ৩৪৯ সংসদ সদস্যের ভোটে আজ নির্ধারিত হবে কে হচ্ছেন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। দুপুরের পর শুরু হওয়া ভোটের ফলও জানা যাবে একই দিন।
নির্বাচনী কর্তার আশাবাদ
নাসিরউদ্দিন বলেন, অন্যান্য প্রস্তুতি ও ব্যয় সংকোচন স্পিকারের সাথে পরামর্শ করে সমস্ত সূচি চূড়ান্ত করা হয়েছে। ভোটের দিন সংসদ ভবনের ভেতরে কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না। এ ছাড়া নির্বাচনকে ঘিরে অতিরিক্ত কোটি টাকা ব্যয়ের আলোচনাকে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়ে সিইসি জানান, নিয়মিত প্রক্রিয়া ও কিছু স্টেশনারি ছাড়া বড় কোনো অতিরিক্ত বাজেট বা আর্থিক ব্যয় হচ্ছে না। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেরও এই নির্বাচনের দিকে বিশেষ নজর রয়েছে উল্লেখ করে সিইসি। তিনি বলেন, একটি সুন্দর ও ঐতিহাসিক নির্বাচন উপহার দেয়ার দৃঢ় আশাবাদ।



