নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। আদেশের পর ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ শেষ হলেও কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে না দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এর আগের দিন গত বুধবার সন্ধ্যায় পরোয়ানামূলে রাজধানীর গুলশানের বাসভবন থেকে লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। বৃহস্পতিবার বেলা ১টার পর ডিবির একটি ডাবল-কেবিন মাইক্রোবাসে করে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীতে তাকে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে আনা হয়। এ সময় ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে তার ছোট ভাই ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী উপস্থিত ছিলেন।
বেলা পৌনে ২টার দিকে বিচারকাজ শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম শুনানি করেন। তিনি বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জারি করা পরোয়ানামূলে আসামিকে গ্রেফতার করে হাজির করা হয়েছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাঁকে কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন।’
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল হারুন ভূঁইয়া ওকালতনামায় স্বাক্ষর ও হাজতখানায় আসামির সাথে পরামর্শের জন্য আবেদন জানান। ট্রাইব্যুনাল দু’টি আবেদনই মঞ্জুর করেন। শুনানিকালে আসামিপক্ষ থেকে কোনো জামিনের আবেদন করা হয়নি।
শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। বিচারকরা এজলাস ত্যাগ করার জন্য আসন থেকে উঠতেই কাঠগড়ার চেয়ার ছেড়ে সশব্দে দাঁড়িয়ে যান লতিফ সিদ্দিকী।
সামনে থাকা মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে তিনি বেশ কয়েকবার উচ্চারণ করেন, ‘মহামান্য আদালত, আমি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’ তবে ততক্ষণে বিচারিক কাজ শেষ হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘কে কথা বলছে? তাকে কথা বলার জন্য কে অনুমতি দিয়েছে? আজকের মতো এখানেই স্টপ।’ বিচারকরা এজলাস ত্যাগ করার পর ক্ষুব্ধ লতিফ সিদ্দিকী বলে ওঠেন, ‘হায়রে হায়! এই যদি হয় আদালত, আমি কোথায় যাব!’
এ সময় এজলাসে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা তার কাছ থেকে মাইক্রোফোন সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন এবং তাকে শান্ত হয়ে বসতে বলেন। এতে তিনি আরো উত্তেজিত হয়ে উঠে উচ্চস্বরে বলেন, ‘চুপ! আমি বসে থাকব নাকি দাঁড়িয়ে থাকব, এটা আমার বিষয়। তোমরা বলার কে?’
হাজতখানায় নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ বেষ্টনীর মধ্য থেকেই তিনি চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘আদালতকে বলতে চাইলাম ফাঁসি দিয়ে দেন, আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত আছি। কিন্তু আদালত শুনতেই চাইল না!’
এ সময় লতিফ সিদ্দিকীর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেন কাদের সিদ্দিকী। কিন্তু নিরাপত্তা বিধির কারণে পুলিশ সদস্য ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে বাধা দিলে আসামিপক্ষের সমর্থকদের সাথে পুলিশ সদস্যদের কিছুটা ধাক্কাধাক্কি ও বাগি¦তণ্ডার সৃষ্টি হয়।
এজলাস কক্ষের সেই নাটকীয় ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পর লতিফ সিদ্দিকীকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দেখা যায় একেবারে ভিন্ন চিত্র।
অন্য একটি মামলায় ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানকে। লতিফ সিদ্দিকীকে হাজতখানায় নেয়ার পর এই দুই হাই-প্রোফাইল আসামির দেখা হয়। এজলাসের ক্ষোভ ভুলে সেখানে লতিফ সিদ্দিকীকে বেশ খোশমেজাজে জিয়াউল আহসানের সাথে আলোচনা করতে দেখা যায়।
এ সময় জিয়াউল আহসানের হাতে একটি আমের বাটি ছিল। তিনি বেশ হেসে হেসেই লতিফ সিদ্দিকীর সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেন এবং কুশল বিনিময় করেন। এজলাস কক্ষের তীব্র উত্তেজনার পর হাজতখানার এই আনঅফিশিয়াল দৃশ্যটি উপস্থিত সাংবাদিকদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
পরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘৮৭ বছর বয়সী একজন প্রবীণ মানুষকে অন্যায়ভাবে আসামি করা হয়েছে। তবে হাতকড়া পরা নিয়ে আমাদের কোনো ক্ষোভ নেই। রাজনৈতিক জীবনে হাতকড়াকে বহুবার দেখেছি বিয়ের সময় নববধূর হাতে যেমন চুড়ি পরানো হয়, আমাদের জন্য হাতকড়াও তেমনই।’
শাপলা চত্বরের এই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার অভিযোগপত্র গত সোমবার আমলে নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে, যার মধ্যে লতিফ সিদ্দিকীসহ ১১ জন বর্তমানে গ্রেফতার রয়েছেন।
চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম বলেছেন, এই মামলায় কনস্টেবল বা পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়নি। যে ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তারা কোনোভাবেই তাদের দায় এড়াতে পারবে না।



