জুলাই আন্দোলনে মূল আকাঙ্ক্ষা ‘পরিবর্তন’ ইস্যুতে রাজনৈতিক টানাপড়েন ও অসন্তোষ

‘নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু বিচার ও সংস্কার এখনো জনগণ পায়নি’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকার যদি বিরোধী দলগুলোকে সাথে নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ সচল করতে না পারে এবং জুলাই গণহত্যার আসামিদের বিচারিক রায় কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়, তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে পুনরায় দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা দেখা দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলেও রাষ্ট্রীয় সংস্কার, বিচার প্রক্রিয়া, জবাবদিহিতা ও জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপড়েন ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। সংবিধান ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলোকে বাদ দিয়ে একতরফাভাবে সরকারি দলের বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন, গণভোট মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে কেবল মৌখিক প্রতিশ্রুতি দেয়া, জবাবদিহিতা ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে ঐকমত্যহীনতা, জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার প্রক্রিয়া ও ট্রাইব্যুনালের রায়ে শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের অসন্তুষ্টি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সাথে জড়িতদের ওপর সরকারি দলের দমনপীড়নের মতো বিষয়গুলো রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তাপ সৃৃষ্টি করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকার যদি বিরোধী দলগুলোকে সাথে নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ সচল করতে না পারে এবং জুলাই গণহত্যার আসামিদের বিচারিক রায় কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়, তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে পুনরায় দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা দেখা দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সূত্র মতে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৎকালীন ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তীতে দীর্ঘ রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন প্রক্রিয়া, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার উদ্যোগ, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। এই দুই বছরের পরিক্রমায় রাষ্ট্র সংস্কারের গতিপ্রকৃতি, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, নতুন নির্বাচনোত্তর রাজনৈতিক দৃশ্যপট, জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীদের সাথে আচরণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার ও বিরোধী দলগুলোর অবস্থান এখন অনেকটা বিপরীত মেরুতে।

শিক্ষক ও গবেষক আসিফ বিন আলী বলেন, জুলাইয়ের দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য কেবল একটি সরকার সরানো ছিল না। জুলাইয়ের বিচার করতে হলে দেখতে হবে, বাংলাদেশ কি ব্যক্তি ও দলের মধ্যে পার্থক্য করতে শিখেছে? অপরাধের বিচার কি প্রমাণের ভিত্তিতে হচ্ছে? পুলিশ, আদালত, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন কি দলীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে বের হয়েছে? বিরোধী মত কি নিরাপদ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো পরিষ্কার নয়।

জানা গেছে, অভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। ১১টি পৃথক সংস্কার কমিশনের ৯ মাসের পর্যালোচনার পর দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই সনদ চূড়ান্ত করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে অভ্যুত্থানের দুই বছরের মাথায় এসে এর বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। জুলাই সনদ অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের কথা ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে এই পরিষদের প্রথম অধিবেশন বসার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে (১৫ মার্চ) রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে এই অধিবেশন আহ্বান করা সম্ভব হয়নি। সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপিসহ অন্যদের দাবি, বর্তমান সরকার সর্বদলীয় ঐকমত্যের জুলাই সনদকে একপাশে সরিয়ে রেখে নিজেদের মতো করে সংসদীয় কমিটি বা বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধনের চেষ্টা চালাচ্ছে। এর ফলে অভ্যুত্থানের মূল চেতনা তথা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন ব্যাহত হচ্ছে বলে তারা মনে করে। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রধানতম দাবি ছিল গণহত্যার বিচার এবং আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের দুঃশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। বিগত দুই বছরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং বিশেষ বিচারিক প্রক্রিয়া চালু করা হলেও এর অগ্রগতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনেক আহত যোদ্ধা এখনো সঠিক চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের সুযোগ পাননি বলে রাজপথে আন্দোলন এখনো চলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক এম গোলাম মোস্তফা ভূইয়া নয়া দিগন্তকে বলেন, মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রকে এবার জনগণের হাতে ফিরিয়ে না দিলে ইতিহাস আবার সাক্ষ্য দেবে, গণ-অভ্যুত্থানে সরকারের পরিবর্তন হলেও পরিবর্তিত ব্যবস্থায় গণমানুষের জায়গা সৃষ্টি হয়নি। এখনই সময়, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের ভেতরে গণ-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর। এখনই সময় সামাজিক শক্তিগুলোকে সংগঠিতভাবে রাজনৈতিক কাঠামোয় যুক্ত করার। সুযোগ কিন্তু বারবার আসে না। যদি এবারের সুযোগ জাতির হাতছাড়া হয়ে যায় তাহলে ভবিষ্যতে জনগণের আকফক্সক্ষা পূরণ করা কঠিন থেকে কঠিনতর হতে বাধ্য।

বিরোধী দলগুলো বলছে, নির্বাচনের মাধ্যমে কেবল ক্ষমতার বদল হয়েছে, কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন হয়নি। আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের সুযোগ দেয়ার অভিযোগের পাশাপাশি এই দলটির বিশাল ক্যাডার বাহিনী ও সুবিধাভোগী আমলাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ার সাথে সরকারি দল জড়িত। এ ছাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, তীব্র জ্বালানি সঙ্কটের মতো সমস্যাগুলোর সমাধানে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার, ভিন্ন মত বা রাজনৈতিক সমালোচনা নিয়ে এখনো নানা বিতর্ক ও সমাজ কাঠামোতে সরকারি দলের পরমতসহিষ্ণুতার অভাব দেখা যাচ্ছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নে সরকার সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের নামে শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। গণভোটে জনগণ রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও সরকার তা কার্যকর না করে জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। তাই জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মর্যাদা দিতে হলে গণভোটের রায়ের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আমাদের তিনটি দাবি ছিল- বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু বিচার ও সংস্কার এখনো জনগণ পায়নি। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে রাষ্ট্র সংস্কারের বিকল্প নেই। গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু সরকার সেই রায় বাস্তবায়ন না করে জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ঐক্যের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারের কর্মকাণ্ডে সেই আন্তরিকতার কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না। বরং সরকারি দলের লোকজন সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে।

রাজনৈতি বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলনে রাজপথের সবচেয়ে শক্তিশালী স্লোগান ছিল পরিবর্তন। সেটি শুধু সরকার পরিবর্তনের দাবি ছিল না, রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলের আকাক্সক্ষাও ছিল। তারা বলছেন, জুলাই আন্দোলনের পর সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ ছিল সংস্কার। নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, পুলিশ, স্থানীয় সরকার, রাষ্ট্রের বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, সব খানেই পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি ছিল। সেই প্রত্যাশা এখনো অপূর্ণ থাকলে, সেটি শুধু কোনো একটি সরকারের ব্যর্থতা নয়, সেটি পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য সতর্কবার্তা।

জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও সাবেক এমপি হামিদুর রহমান আজাদ নয়া দিগন্তকে বলেন, যেই প্রত্যাশা নিয়ে জনগণ জুলাই আন্দোলনে তাদের জীবন ও রক্ত দিয়েছে সেটি পূরণ হয়নি। প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ গণভোটের পক্ষে রায় দিলেও সরকার সেটি মানছে না। ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টিকে রহিত করা হয়েছে। যেগুলো মৌলিক সংস্কারের অংশ ছিল। জুলাই পরিবার তাদের ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে না। দেশে দুর্নীতি, দুঃশাসন বহুগণ বেড়েছে, আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে। নির্বাচন কমিশন একটি আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। গণহত্যার সাথে জড়িতদের বিচার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি দেখা দিয়েছে। বিরোধী মতের ওপর অতীতের মতো নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। আমরা চাই, সরকার জুলাই আকাক্সক্ষা ধারণ করে দেশ পরিচালনা করুক। দ্রুত সংস্কার কমিশন গঠন করে গণভেটের রায়কে বাস্তবায়ন করুক। অন্যথায় জনগণ আবারো রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।

জুলাই অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে এলজিআরডি মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমান সরকার জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। আমি মনে করি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্কের অবসান হওয়া উচিত। জুলাই আন্দোলন যে নতুন রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের আস্থা ও বিশ্বাস আছে আমরা ন্যায় ও ইনসাফের রাষ্ট্র গঠন করতে পারব।