বিশেষ সংবাদদাতা
- সরকারি চাকুরেদের পে-স্কেল নিয়ে সিদ্ধান্তে দেরি হলে পরিস্থিতি জটিল হবে
- চলতি অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা
নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ ৩০ হাজার থেকে এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। এ ছাড়া জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে দেশের তিন প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ায় ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মসংস্থান হারিয়েছে। সিপিডি মনে করছে, সংস্কারে রাজনৈতিক সাহস দেখাতে পারছে না সরকার। সংস্কার করা না হলে পতিত সরকারের সুবিধাভোগীরা আবার ফিরে আসতে পারে। এ ছাড়াও সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন-ভাতার সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে পরিস্থিতি জটিল হবে মনে করে সিপিডি।
গতকাল সোমবার সকালে সিপিডির আয়োজনে ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস : একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এসব কথা বলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় অর্থনীতি কাঠামোগত নানা সমস্যার মধ্যে ছিল এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতিও অনুকূলে ছিল না। তবে সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে একটি সমন্বিত দলিল তৈরি না করায় এখন বিভিন্ন পদক্ষেপ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করা কঠিন হচ্ছে। ড. দেবপ্রিয় বলেন, নতুন সরকারের কাছে দু’টি বড় প্রত্যাশা ছিল-অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর প্রত্যাশা থাকলেও সেখানে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার বারবার বলছে তারা খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু কী পরিস্থিতি থেকে দায়িত্ব নেয়া হয়েছে, তার একটি সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি করা হয়নি। ফলে এখন সরকারের বিভিন্ন বক্তব্যের সাথে পরিসংখ্যানের সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানও বক্তব্য রাখেন।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, সংস্কার কর্মসূচির ক্ষেত্রেও সমন্বিত কোনো কর্মপরিকল্পনা দেখা যায়নি। ইশতেহারে যেসব কমিশনের কথা বলা হয়েছিল, সেগুলোরও অনেক বাস্তবায়ন করা হয়নি। নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি ও নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ মূল্যায়ন করতে সিপিডি প্রায় ৩৬২টি পদক্ষেপের তালিকা করেছে বলে জানান তিনি। এগুলোকে নয়টি ভাগে বিভক্ত করে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর আওতায় মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সুশাসনের ক্ষেত্রে ১০৫টি ঘটনা মূল্যায়নে রাখা হয়েছে। সরকারি এমপিদের প্লট ও গাড়ি না নেয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অন্য দিকে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগের বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে মনে করছে সিপিডি। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতিরও ব্যত্যয় হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ড. দেবপ্রিয়।
আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু আইনে ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির পরও মব সহিংসতা, নারী, শিশু ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
সরকারি চাকরিজীবীদের পে-স্কেল : সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে সরকার রাজনৈতিক সাহস দেখাতে পারছে না বলে মনে করেন দেবপ্রিয়। তিনি বলেন বিষয়টিকে ঝুলিয়ে রাখলে সমস্যা কমবে না বরং যত দেরি হবে, পরিস্থিতি তত জটিল হবে। তিনি বলেন, ‘ছয় মাসেও বেতনভাতার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। কেন পারছেন না? একটা বড় বিষয় আছে, আর্থিক সক্ষমতা। অন্তর্বর্তী সরকার বেতন-কাঠামোর যে প্রতিবেদন দিয়ে গেছে তা মূল্যায়ন করে ভাগে ভাগে বেতন-কাঠামো বাস্তবায়নের একটা সুপারিশ এসেছিল এবং তা সবাই মেনেও নিয়েছিল। এত দেরি না করে শুরুতেই যদি ২০-২৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দিয়ে দিতেন আর সময় প্রার্থনা করতেন, সেটা খুব ভালো হতো। এখন যে জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে, তা ভালো হয়নি।’ বিষয়টিকে ঝুলিয়ে রাখলে সমস্যা কমবে না বরং যত দেরি হবে, পরিস্থিতি তত জটিল হবে বলে মনে করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তার মতে, বেতনভাতার সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে সরকারের অন্যান্য কাজও বিঘিœত হবে।
রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা : সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ ৩০ হাজার থেকে এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সিপিডি। এনবিআরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার নির্ভরতা ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। নিট বৈদেশিক সহায়তাও ৭৭১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৩৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বন্ধ ৯৫ কারখানা, কাজ হারান ৬১ হাজারের বেশি : শিল্প খাতে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে সিপিডি। জানুয়ারি-আগস্ট ২০২৬ সময়ে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এসব কারখানা বন্ধ হওয়ায় সরাসরি ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিল্প উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমেছে। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে।
কমছে বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবৃদ্ধি : সিপিডি বলছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। নিট বিদেশী বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, এলএনজি সংগ্রহে জটিলতা ও কার্গো গ্রহণে সমস্যার কারণে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাসসঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছে সিপিডি। এর প্রভাবে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেলবোর্ড ও সিরামিকসহ গ্যাসনির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার এক হাজার ১৮৬ এমএমসি থেকে কমে এক হাজার ১৪৮ এমএমসিতে নেমেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধিও ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।
সিপিডি বলছে, মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। খাদ্যমূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে নেমে ৭ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হলেও প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনো নেতিবাচক।
রফতানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিপরীতে আমদানি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। মাসিক গড় বিদেশে কর্মসংস্থান ৯৫ হাজার ৫২১ জন থেকে কমে ৫১ হাজার ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে।
বাণিজ্য ঘাটতি ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলতি হিসাবের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ৬০০ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতিতে চলে গেছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
কিছু পদক্ষেপ ইতিবাচক : সিপিডির মূল্যায়নে সরকারের কিছু পদক্ষেপ ইতিবাচক হিসেবে উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, অপ্রকাশিত অর্থ বৈধ করার প্রস্তাব প্রত্যাহার, ই-রিটার্ন ও ডিজিটাল আয়কর ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং আরএমজির বাইরে রফতানিমুখী শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা সম্প্রসারণ। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে সিইপিএ স্বাক্ষর, বিডা-বেজা-পিপিপিএ একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ চালু, স্টার্টআপ ফান্ড গঠন, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মেট্রো ও ট্রেন ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড়, কৃষিঋণের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ ও সুদ মওকুফ এবং নারী পরিচালিত ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুকেও ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছে।
ব্যাংক খাতে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন এবং পাঁচটি অকার্যকর এনবিএফআইয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬ প্রয়োগকেও ইতিবাচক পদক্ষেপ বলেছে সিপিডি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচির সুপারিশ : সিপিডি সরকারের প্রতি অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদের একটি ‘কোর বাজেট’ তৈরির সুপারিশ করেছে। একই সাথে জ্বালানি, ব্যাংক, এনবিআর, রাজস্ব-ব্যয়, এডিপি, লজিস্টিকস, ডিজিটালাইজেশন ও বেতন কমিশনসহ একটি সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তায় দেশীয় অনুসন্ধান, কৌশলগত মজুদ ও উৎস বহুমুখীকরণের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। আগামী মাসে সংসদে বেতন কাঠামো, ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ খাত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপনেরও পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।



