শফিউল আযম বেড়া (পাবনা)
দুধেল গাভী পালন করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন পাবনা ও সিরাজগঞ্জের হাজার হাজার পরিবার। বেকারত্ব দূর করে আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে এ অঞ্চলের শিক্ষিত বেকার যুবকরাও ঝুঁকছেন গাভী পালনে ও গোখামার স্থাপনে। ফলে প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে নতুন নতুন খামার। একই সাথে বাড়ছে তরল দুধের উৎপাদন ও বাজার।
স্বাধীনতার পর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ীতে বড়াল নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত হয় সরকারি দুগ্ধ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী সমবায়ী প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটা। প্রতিষ্ঠানটির আওতায় বর্তমানে ৩৫০টি দুগ্ধ সমবায় সমিতি রয়েছে। এসব সমিতিতে প্রায় ২২ হাজার গোখামারি যুক্ত রয়েছেন। এর বাইরে মিল্ক ভিটার কমান্ড এরিয়ার বাইরেও দুই জেলায় রয়েছে আরো বিপুলসংখ্যক সমিতি। এসব খামার ও সমিতি থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ দুধ উৎপাদিত হচ্ছে।
এ ছাড়া পাবনা ও সিরাজগঞ্জের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই কমবেশি গাভী পালন করা হয়। উৎপাদিত দুধের একটি বড় অংশ মিল্ক ভিটা, প্রাণ ডেইরি, আকিজ ডেইরি, আফতাব ডেইরি, ব্র্যাক ফুড (আড়ং), আমো ফ্রেস মিল্ক, ফ্রস মিল্ক, কোয়ালিটি, বিক্রমপুরসহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান সংগ্রহ করে। এ অঞ্চলের দুগ্ধ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন স্থানে আঞ্চলিক ও শাখা দুগ্ধ সংগ্রহকেন্দ্র স্থাপন করেছে। ফলে দিন দিন বাড়ছে দুধের বাজার ও চাহিদা।
প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পাবনা ও সিরাজগঞ্জে প্রতিদিন প্রায় ১৩ থেকে ১৪ লাখ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে বাঘাবাড়ী মিল্ক ভিটা ৮০ হাজার থেকে এক লাখ লিটার, বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার লিটার, ঘোষরা প্রায় এক লাখ লিটার, দুই শতাধিক মিষ্টির দোকান প্রায় ৩০ হাজার লিটার এবং হাটবাজারের স্থানীয় ক্রেতারা প্রায় ২৫ হাজার লিটার দুধ কিনে থাকেন। স্থানীয় চাহিদা ও সংগ্রহের পরও বিপুল পরিমাণ দুধ উদ্বৃত্ত থাকে। ব্যবসায়ীরা এসব দুধ সংগ্রহ করে বগুড়া, নওগাঁ, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠিয়ে দেন।
জানা গেছে, পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর ও আটঘড়িয়া এবং সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, বেতিল ও চৌহালীসহ ১২ শতাধিক গ্রামের হাজার হাজার পরিবার বাণিজ্যিকভাবে দুধেল গাভী পালন করছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব খামারি প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ দুধ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করছেন।
গাভী পালনের পাশাপাশি বাড়ছে দুধ ব্যবসাও। বেড়ার দুধ ব্যবসায়ী মনির হোসেন জানান, মাসখানেক আগেও তিনি প্রতিদিন প্রায় এক হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করতেন। বর্তমানে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তাকে আরো বেশি পরিমাণে দুধ সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এ জন্য খামারি ও কৃষকদের আগাম টাকা বা দাদন দিয়েও দুধ সংগ্রহ করতে হচ্ছে তাকে। তবে খামারিরা বলছেন, গোখাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য উপকরণের দাম দফায় দফায় বেড়ে যাওয়ায় খামারে লাভ কমে গেছে। মিল্ক ভিটার ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক পরিচালক ও খামারি নজরুল ইসলাম নকিব বলেন, বর্তমান দামে দুধ বিক্রি করে অনেক খামারিকে লোকসান গুনতে হচ্ছে। দুধের দাম লিটারপ্রতি অন্তত ১০ টাকা বাড়ানো হলে খামারিরা লাভের মুখ দেখবেন এবং এ শিল্প আরো দ্রুত সম্প্রসারিত হবে।
কৃষিবিদ ড. জামিল চৌধুরী বলেন, পাবনা-সিরাজগঞ্জে গাভী পালন এখন জনপ্রিয় ও লাভজনক পেশায় পরিণত হয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ নিয়ে শিক্ষিত বেকার যুবকরাও এ পেশায় যুক্ত হতে পারেন। সহজ শর্তে ব্যাংকঋণের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সামান্য পুঁজিতেই খামার গড়ে তোলা সম্ভব। এতে বেকারত্ব কমার পাশাপাশি দেশে দুধের উৎপাদন বাড়ানো, পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে এবং গুঁড়া দুধ আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ও কমানো সম্ভব।


