- অনুসন্ধান হবে এক-এগারোর নেপথ্য নিয়ে
- আলোচনায় ডিজিএফআইয়ের সাবেক ২ কর্মকর্তা
এক-এগারোর কুশীলব আলোচিত সাবেক সেনাকর্মকর্তা ও ফেনী-৩ আসনের সাবেক এমপি লে. জেনারেল (অব:) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর অপকর্মের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) জিজ্ঞাসাবাদে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র নয়া দিগন্তকে জানান, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান কানাডায়। সেখানেও তিনি ব্যবসা শুরু করেন। পরে কানাডা থেকে ব্যবসার উদ্দেশ্যে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে একটি স্থানীয় অস্ত্র কারখানার মালিকের সাথে কথা বলে বাংলাদেশ সরকারের কাছে অস্ত্র বিক্রির জন্য আবেদন করেন। একপর্যায়ে ১১ মামলা মাথায় নিয়ে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও স্থানীয় নেতাদের সাথে যোগাযোগ করে তিনি দেশে ফিরেন।
সম্প্রতি তিনি দেশে এসে অস্ত্র বিক্রির আবেদনসহ চুক্তিপত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট জায়গায় যোগাযোগ করেন। তার নিজের ও স্ত্রীসহ চারজনের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেও তিনি সব মহলে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাসুদ উদ্দিন দেশে আসার পরপরই বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তার পিছু নেয়। একপর্যায়ে গত সোমবার রাতে রাজধানীর বারিধারার ডিওএইচএসের বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ।
একাধিক সূত্র জানায়, রাজনৈতিক পরিবর্তনে আলোচিত এক-এগারোর মাস্টারমাইন্ড মাসুদ উদ্দিন আওয়ামী লীগের আমলে ২৪ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করেও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে চলেছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর তিনি পারিবারিকভাবে যোগাযোগ শুরু করেন। এর একপর্যায়ে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী আত্মীয়তার ভরসায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি অস্ত্র কারখানা থেকে বাংলাদেশ সরকারকে অস্ত্র সরবরাহের স্বপ্ন নিয়ে দেশে আসেন। তার ধারনা দুর্নীতির টাকায় সব ম্যানেজ করে এ সরকারের আমলেও ফের অপকর্ম চালিয়ে যাবেন। কিন্তু বিধি বাম। তিনি যে এক-এগারোর মাস্টারমাইন্ড এবং জিয়া পরিবারকে ধ্বংস করার মূল কারিগর হিসেবে লিপ্ত ছিলেন সেই কথা ভুলে নতুন করে ভোল্ট পাল্টে তিনি বিএনপি সরকারের আস্থাভাজন হওয়ার আশায় দেশে আসেন। গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে, বহু অপরাধ-অপকর্মের এই হোতা নিজের ফাঁদেই পা দিয়েছেন।
তদন্তকারী সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানিয়ে বলেন, বর্তমানে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে পাঁচ দিনের রিমাণ্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ডিবি পুলিশ। গতকাল ছিল জিজ্ঞাসাবাদের দ্বিতীয় দিন। এর আগে গত বুধবার তাকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদের পরও তিনি তেমন মুখ খুলেননি। তবে বুধবার রাত থেকে তার অপকর্মের তথ্য দিতে শুরু করেছেন ডিবি পুলিশের কাছে।
ডিবি পুলিশ জানায়, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় আলোচিত এই সেনা কর্মকর্তাকে গত সোমবার পল্টন থানায় গ্রেফতার দেখানো হয়। তার বিরুদ্ধে মোট ১১টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম।
গতকাল ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছি। এখনো জিজ্ঞাসাবাদ চলমান রয়েছে। তার দেয়া তথ্যগুলো যাচাই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সোমবার রাতে বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে মঙ্গলবার আদালতে নেয়া হয়। তার শারীরিক পরীক্ষার পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, লে. জেনারেল (অব:) মাসুদ উদ্দিন সব কথা অকপটে স্বীকার করছেন না। এক-এগারোর কুশীলব হিসেবে তিনি যুক্ত থাকলেও তাকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। বিদেশ থেকে ফেরার বিষয়ে তিনি বলেন, ২০১৪ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়া যান। সম্প্রতি তিনি বিদেশ থেকে ফিরেছেন কিনা সে বিষয়ে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করছি।
একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বিদেশে ছিলেন। ওই সময় গোয়েন্দারা তাকে হন্যে হয়ে খুঁজলেও তাকে পাওয়া যায়নি। নতুন সরকার গঠনের পর তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ শুরু করেন। তাদের নিশ্চয়তা নিয়েই তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে অস্ত্র বিক্রি জন্য দেশে আসেন বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে।
এ দিকে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতারের পর আলোচনায় এসেছে আরো দুই সেনা কর্মকর্তার নাম। তারা হলেন তখনকার ডিজিএফআইয়ের ভারপ্রাপ্ত ডিজি ফজলুল বারী ও ডিজিএফআইয়ের আরেকজন কর্মকর্তা পরে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এ টি এম আমিন। এর মধ্যে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছাড়া অন্যদের কেউই দীর্ঘকাল ধরে দেশে নেই। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমদের প্রধান উপদেষ্টার পদ এবং তার উপদেষ্টা পরিষদ সদস্যদের পদত্যাগের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছিলেন সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ। ওই সময় আরো তিনজন সেনাকর্মকর্তা ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক-এগারোর কুশীলবদের নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করবে সরকার। যদি তাই হয় তাহলে তৎকালীন সময়ের অনেক সেনাকর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিষয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ এ বিষয়ে বলেন, কে গ্রেফতার হবে আর কে হবে না তা নির্ভর করে সরকারের ওপর। অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে হয়তো তার সম্পর্ক ভালো ছিল তাই তখন তাকে গ্রেফতার করা হয়নি। আওয়ামী লীগের এমপি, মন্ত্রী নেতা সবাইকেই তো গ্রেফতার করা হয়েছে। জাতীয় পার্টির মনে হয় কেউ গ্রেফতার হয়নি। তিনি বলেন, যেহেতু তার বিরুদ্ধে মামলা আছে, তাই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিনি রাজনীতিবিদদের গ্রেফতার করেছেন, নির্যাতন করেছেন সে ব্যাপারে তো কোনো মামলা হয়নি। তবে আমার মতে, তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করে সেই মামলায় তাকে গ্রেফতার করলে ভালো হতো। তাহলে মানুষের মনে এই প্রশ্ন উঠত না যে, আগে তাকে কেন গ্রেফতার করা হয়নি।
একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে থাকা জেনারেল মাসুদ ওই বছরে এক-এগারোর পট পরিবর্তনের পর গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক ছিলেন। ২০০৮ সালের জুনে তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার করে পাঠানো হয়েছিল। পরে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারও তাকে ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত সেই দায়িত্বে রাখে।
২০১৮ সালে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ (সোনাগাজী ও দাগনভূঞা) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মাসুদ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে মনোনয়ন ফরম নিয়েছিলেন তিনি। তার পাঁচ দিনের মাথায় তিনি জাতীয় পার্টির মনোনয়ন ফরম কেনেন। এর পরদিনই জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন এক-এগারোর সময় আলোচিত সাবেক এ সেনাকর্মকর্তা।
সূত্র জানায়, মূলত ক্ষমতার দম্ভে বেপরোয়া হয়ে উঠে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আত্মীয় হয়ে সেই পরিচয়ে একের পর এক পদোন্নতি নিয়ে এক-এগারোর সময় সেই পরিবারের ওপর নির্মম নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে মাইনাস টু ফরমূলার নীলনকশা তৈরি করে। তার পরিকল্পনায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বেদম নির্যাতন করা হয়।
মাইনাস টু ফর্মুলা : শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াসহ দুই শীর্ষ নেত্রীকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার (মাইনাস টু) পরিকল্পনা বা ‘সাজানো ছকে’ মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির তিনি সমন্বয়ক ছিলেন, যার মাধ্যমে রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারের অভিযান পরিচালিত হতো। বিএনপি-আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতারের পর বিশেষ কারাগারে রাখার প্রক্রিয়াতেও যুক্ত ছিলেন মাসুদ।
এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এই পরিকল্পনার পেছনে তৎকালীন মার্কিন দূতাবাসের সাথে তার যোগাযোগ ছিল এবং পরিকল্পনার অন্যতম ক্যাপ্টেন হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি।
ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে তৎকালীন সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সামরিক-বেসামরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে ‘নিয়ন্ত্রিত শাসনব্যবস্থা’ পরিচালনার নেপথ্যে তিনি অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন।



