সংবাদ সম্মেলনে ড. বদিউল আলম

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রণক্ষেত্র বানিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গ সংগঠন

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন গণতান্ত্রিক উত্তরণ

Printed Edition
জাতীয় প্রেস ক্লাবে সুজনের সংবাদ সম্মেলন  :নয়া দিগন্ত
জাতীয় প্রেস ক্লাবে সুজনের সংবাদ সম্মেলন :নয়া দিগন্ত

বিশেষ সংবাদদাতা

রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিবন্ধনের শর্ত অনুযায়ী অঙ্গসংগঠন বিলুপ্ত না করে শুধু গঠনতন্ত্র থেকে নাম সরিয়েছে। এ ধরনের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে বলে মন্তব্য করেছেন সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক এর সম্পাদক এবং নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদার।

তিনি বলেন, এই অঙ্গসংগঠন দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে। দেশে একটা মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারিনি। শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। শুধু সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন গণতান্ত্রিক উত্তরণ। এজন্য আইনি ও কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করতে হবে। প্রতিবারই যেন সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে গতকাল সুজন আয়োজিত ‘গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষায় কেমন নির্বাচনী ইশতেহার চাই’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে ড. বদিউল আলম উপরোক্ত মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে সুজনের কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ, জাতীয় কমিটির সদস্য একরাম হোসেন, প্রধান সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকারসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

মূল প্রবন্ধে নর্থ সাউথ বিশ^বিদ্যালয়ের ডিন ও অধ্যাপক ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করীম বলেন, বাংলাদেশ আজ গণতান্ত্রিক যাত্রার ক্ষেত্রে এক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনাই করেনি-এগুলো ছিল রাষ্ট্র মেরামতের লক্ষ্যে ব্যাপক ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব জাগরণ। তারুণ্যের আকাক্সক্ষার এক তীব্র বিস্ফোরণ। এ সময়টি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে জনগণ আর নীরব দর্শক থাকতে রাজি নয়। বিশেষত, তরুণ প্রজন্ম শহর থেকে গ্রামের লাখো দেয়ালে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে-তারা আর অবিচার, বৈষম্য ও জবাবদিহিহীনতার উত্তরাধিকার বহন করতে চায় না। তারা চায় অংশগ্রহণ, মর্যাদা ও একটি ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অঙ্গসংগঠন বিলুপ্তির শর্ত না মানায় আইনের মূল উদ্দেশ্য ভণ্ডুল হয়েছে। আরপিওতে নিবন্ধনের শর্তের কথা বলা আছে রাজনৈতিক দলের কোনো অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন থাকবে না। আইনে লেখা আছে দলগুলোর গঠনতন্ত্রে এ বিধান থাকবে না এবং বিদেশী শাখার বিধান থাকবে না। কিন্তু দলগুলো ঠিকই এই সংগঠনগুলো রেখে দিয়েছে, শুধু তাদের গঠনতন্ত্র থেকে বাদ দিয়েছে। এটা তারা একটা খেলা খেলেছে। ভাতৃপ্রতিম সংগঠন বলে চালিয়ে দিয়েছে। আইনের উদ্দেশ্য তারা ভণ্ডুল করেছে।

মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা, উপজেলা বা জেলা কমিটির সদস্যদের দ্বারা প্রস্তুত প্যানেল থেকে কেন্দ্রীয় সংসদীয় বোর্ড প্রার্থী চূড়ান্ত করবে। কিন্তু বাস্তবে কখনোই প্যানেল তৈরি হয় না। ভবিষ্যতে আইন ও সংবিধান মেনে প্রার্থী মনোনয়ন নিশ্চিত করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো স্পষ্ট অঙ্গীকার করবে বলে আশা করি রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক না হলে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। রাজনৈতিক দলের সংস্কারের জন্য নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা দরকার।

বিগত নির্বাচনগুলোতে জয়ী প্রার্থীদের সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ক্ষমতার সাথে জাদুর কাঠি রয়েছে। রাজনীতিবিদদের জানাতে হবে, ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যমে অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার যে সুযোগ রাজনীতির ব্যবসায়ীকরণ ও ব্যবসায়ের রাজনীতিকরণের অবসান তারা কীভাবে ঘটাবেন।

তিনি বলেন, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ‘দিনবদলের সনদ’ নামে একটি চমৎকার ইশতেহার প্রকাশ করেছিল। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ তাদের সেই অঙ্গীকার ভুলে গেছে। যার মাশুলও দিতে হয়েছে দলটিকে। আমরা মনে করি, নির্বাচনী ইশতেহার ভোটারদের সাথে দলগুলোর একটি চুক্তি। এই চুক্তি অমান্য করলে যেন নাগরিকদের আদালতে যাওয়ার সুযোগ থাকে। মানুষ যেন প্রশ্ন করার সুযোগ পায় যে দলগুলো তাদের অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়ন করেছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোটের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো ‘হ্যাঁ’ নাকি ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেবে তা নির্বাচনী ইশতেহারে লিপিবদ্ধ থাকতে হবে।

সাবেক ব্যাংককার সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, আমরা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই। এজন্য দরকার সচেতন ও সোচ্চার জনগোষ্ঠী। কারণ তারাই গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ। আমরা বারবার বলেছি প্রার্থীদের হলফনামা যাচাই-বাছাই করা দরকার। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ছাড়াও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ আয়কর বিবরণীতে কার কত আয় ও সম্পদ রয়েছে তা উল্লেখ থাকে। সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন না থাকার বিধান মানার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট অবস্থান থাকা দরকার।