হাসিনাকে রাজনৈতিক তৎপরতার সুযোগ দিলে সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে হবে ভারতকে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

Printed Edition
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাদা দল ও ইউট্যাবের আয়োজিত সভায় বক্তব্য রাখেন : নয়া দিগন্ত
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাদা দল ও ইউট্যাবের আয়োজিত সভায় বক্তব্য রাখেন : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে দেশটির প্রতি চরম সতর্কবার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ভারত যদি গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সে দেশে বসে রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ দেয়, তবে বাংলাদেশের সাথে দেশটির বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে ভারতকে নতুন করে ভাবতে হবে।

তিনি আরো বলেন, আপনারা ‘হাসিনা কার্ড’ খেলবেন, আবার একই সাথে বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও চাইবেন- মনে রাখতে হবে, দু’টি অবস্থান পুরোপুরি বিপরীত। আশা করি, ভারতের কর্তৃপক্ষ ও সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করবে।

গতকাল শনিবার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল ও ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)।

শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান ও বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে সমর্থন না দেয়ার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী ভারতের সাথে পারস্পরিক নির্ভরতা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে সম্মানজনক ও বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।

অপপ্রচারের জবাব দিতে হবে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, এই গণ-অভ্যুত্থান আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়; এটি টানা ১৭ বছরের ত্যাগ ও আন্দোলনের সম্মিলিত ফসল। নতুন গঠিত রাজনৈতিক দলের নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা ও পরিপক্বতার কোনো বিকল্প নেই।

১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামকে উপেক্ষা করে কেবল ৩৬ দিনের ভেতরেই সব অর্জিত হয়েছে- এমন ভাবনা অবাস্তব মন্তব্য করে তিনি বলেন, রাজনীতিতে প্রাথমিক পর্যায়ের ছাত্ররা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের মতো আচরণ করে... আর মনে করে মাত্র ৩৬ দিনের হাসিনাবিরোধী আন্দোলন ছাড়া ১৭ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের কোনো মূল্য নেই, তবে তা হবে মারাত্মক ভুল।

বিএনপির বন্ধুপ্রতিম ছাত্রসংগঠনের প্রতি বিভিন্ন চক্রান্ত ও উসকানিতে পা না দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশে নতুন করে সহিংসতা উসকে দেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে এবং কিছু জায়গায় ‘বন্ধু ছাত্ররা’ না বুঝে সেই চক্রান্তের ফাঁদে পা দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের ধৈর্যের পরিচয় দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অপপ্রচার বা গালিগালাজের জবাব দিতে হবে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের মাধ্যমে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সহিংসতায় জড়ানো যাবে না। এ ছাড়া সংবিধান সংস্কার কমিটিতে বিরোধী দলের অংশ না নেয়ার সমালোচনা করে তিনি জানান, বিএনপি এমনভাবে সংবিধান সংস্কার করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

‘জুলাইয়ের কৃতিত্ব একক কারো নয়’

আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাদের মানসিকতা পরিবর্তনের ওপর জোর দেন।

তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব একক কোনো গোষ্ঠীর দাবি করার সুযোগ নেই। আন্দোলনের পুরো সময় লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ শীর্ষ নেতারা নিয়মিত দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ ও ‘বাংলা ব্লকেড’-এর মতো কর্মসূচিতে বিএনপির পূর্ণ সমর্থন ছিল উল্লেখ করে তিনি জানান, জুলাই আন্দোলনে তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের ১৪২ জন নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন।

সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আমিরের সরকারি বাসভবনে প্রদর্শিত এক তথ্যচিত্রের প্রসঙ্গ টেনে রিজভী অভিযোগ করেন, সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের উল্লেখ থাকলেও স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম বাদ দেয়া হয়েছে। ৫ আগস্টের পর থেকে বিএনপি সবার প্রতি ক্ষমাশীল ও নমনীয় আচরণ করে আসছে উল্লেখ করে রিজভী প্রশ্ন তোলেন, সাম্প্রতিক এসব ঘটনা সেই নমনীয়তার অপব্যবহার কি না- যা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ও রহস্যজনক।

‘শিক্ষকদের মতামত উপেক্ষা করা হতো’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বৈরাচারী নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হয়েছিল। মুক্তবুদ্ধির চর্চায় বাধা সৃষ্টি এবং সাধারণ শিক্ষকদের মতামত উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হতো। এমনকি প্রতিবাদী শিক্ষকদের ওপর চালানো হতো মানসিক ও প্রশাসনিক নির্যাতন। তা সত্ত্বেও দেশের এই গণতান্ত্রিক সঙ্কটে শিক্ষকেরা শ্রেণিকক্ষের গণ্ডি পেরিয়ে রাজপথে এসে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।

ইউট্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির প্রো-ভিসি অধ্যাপক মো: নুরুল ইসলাম অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন।

সভায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের শহীদ মো: ওয়াসিম আকরামের বাবা শফিউল আলম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিতে গিয়ে এটিকে যেন কেউ ‘বাপ-দাদার সম্পত্তি’ মনে না করেন। বৈষম্যহীন যে সমাজের জন্য তরুণরা জীবন দিয়েছেন, তাদের সেই আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দলের নেতা অধ্যাপক মো: মহিউদ্দিনের সঞ্চালনায় সভায় সভাপতিত্ব করেন ইউট্যাবের মহাসচিব ও সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মো: মোর্শেদ হাসান খান।

সভায় অন্যদের মধ্যে আরো বক্তব্য দেন- জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক লুৎফর রহমান, শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন, শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ এবং শহীদ পুলিশ সদস্য ইকরামুল হক সাজিদের মা মোছা: নাজমা খাতুন লিপি।