আবু নেসার শাহীন
গ্রামের দক্ষিণে মঈন শেখের দোতলা পাকা বাড়ি। বাড়ির চারপাশ জুড়ে ঘন বন। সে বন থেকে বেরিয়ে এসেছে একটা বন বিড়াল। গ্রামের কোনো বিড়ালের সাথে তার সম্পর্ক ভালো না। কারণ সে ভীষণ ঝগড়াটে। প্রতিদিন কোনো না কোনো বিড়ালের সাথে সে ঝগড়া লেগে যায়। সকাল বেলা ঘুম থেকে ওঠে খাবারের সন্ধানে বের হয় সে। কোথাও খাবার খুঁজে পায় না। হঠাৎ চোখ পড়ে একটা ইঁদুরের ওপর। ইঁদুর অর্ধেক শরীর গর্তের ভেতর রেখে আয়েশ করে মুড়ি খাচ্ছে। মুহূর্তে বিড়ালের মুখে জল এসে যায়। বিড়াল দৌঁড়ে এসে ইঁদুরটিকে ধরার চেষ্টা করে। ইঁদুর গর্তে ঢুকে ভয় পেয়ে হাঁপাতে থাকে। বিড়াল প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলল, তুমি ভয় পেও না। আসলে আমার একটা দৌড় প্রতিযোগিতা আছে তো তাই একটু প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।
ঠিক আছে তুমি এখন যাও। অন্য একদিন তোমার সাথে দেখা হবে।
বাইরে এসো কথা আছে। বিড়াল গর্তের চারপাশ ঘুরে। গুনগুন করে গান গায়। মনে মনে ভাবে না খেয়ে থাকার চেয়ে ইঁদুর খেতে পেলে মন্দ হয় না।
তুমি যাও। আমি একটু পর বের হবো। তা ছাড়া আমার বাইরে কোনো কাজ নেই। শুধু শুধু ঘুরে বেড়ানোর অভ্যেস নেই আমার।
তাই না?
হুঁ। তোমাকে দেখে বন বিড়াল মনে হচ্ছে?
আমাকে দেখে! তুমি আমাকে দেখতে পাচ্ছ? বিড়াল খুব অবাক হয়।
আমার তিনটা চোখ। দুটো চোখ দেখা যায়। একটা চোখ দেখা যায় না।
ও মা! অবাক ব্যাপার! এ রকম কথা তো বাপের জন্মেও শুনিনি। কী সাংঘাতিক। কী সাংঘাতিক। মানুষে বলে কলিকালে। বাঘে চাটে ছাগলের গাল।
তোমার লেজের অর্ধেক কালো আর অর্ধেক সাদা, ঠিক?
হুঁ। তা তোমার আর একটা চোখ কোথায়? আর এ চোখের নামবা কী?
এটা হলো মনের চোখ। এটা সবার থাকে না। যেমন তোমার নেই। আর মনের চোখ থাকলে ঠিকই আমাকে দেখতে পেতে।
আচ্ছা। তুমি জানো বিড়াল বাঘের বংশধর?
জানি। তবে ...।
বিড়াল ব্যস্ত সমস্ত পায়চারি করে। বিড়বিড় করে। একটা পুঁচকে দোড়া সাপ উত্তর দিক থেকে ছুটে আসতে দেখা যায়। মুহূর্তে বিড়াল ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। এটা দেখে ইঁদুর মিটিমিটি হাসে, বাঘের বংশধর!
কিছু বললে?
ইঁদুর কিছু বলে না। বিড়াল গৃহস্থের ঘর থেকে একটা শাবল নিয়ে ইঁদুরের গর্ত খুঁড়তে থাকে। খুঁড়তে খুঁড়তে এক সময় বিশাল গর্ত খুঁড়ে। কিন্তু ইঁদুরের সন্ধান পায় না। বিড়াল চিৎকার করে বলল, ইঁদুর বেরিয়ে এসো। আজ তোমার নিস্তার নেই।
তোমার কি মনে হয় তুমি আমাকে ধরতে পারবে?
অবশ্যই।
বিড়াল আছাড় মেরে ইঁদুর মারে শুনেছি। কিন্তু বিড়াল যে ইঁদুর খায় এটা তো শুনিনি।
সব বিড়াল এক না, বুঝলে?
সেটাই।
বিড়াল গৃহস্থের ঘর থেকে এক বালতি পানি এনে ইঁদুরের গর্তে ঢেলে দিয়ে অপেক্ষা করে। কিন্তু ইঁদুর বেরিয়ে আসে না। ঘটনা কী? ইঁদুর খুকখুক হাসে। ইঁদুরের হাসি শুনে পিত্তি জ্বলে যায় বিড়ালের, তোকে ডুবিয়ে মারব।
তাই। রাখে আল্লাহ মারে কে? আমি ছোট হতে পারি কিন্তু তোমার চেয়ে আমার বুদ্ধি কম না।
এ সময় বেজি আসে। বেজি দেখে বিড়াল একটু ভয় পায়, তুমি এখানে কী করছ?
না এমনি। বিড়াল ঢোক গিলে বলল।
এমনি এমনি বন বিড়াল গ্রামে আসে না। বল তোমার উদ্দেশ্য কি? সঠিক কারণ না বললে মামাকে ডাকব।
মামা! বিড়াল ভ্রুকুচকে বলল।
হুঁ। আপন মামা না। কিন্তু খুব কাছের। বিপদে আপদে সেই প্রথম এগিয়ে আসে। তবে ...।
তবে কী? বিড়াল কৌতূহল অনুভব করে। চারদিকে ভালো করে চোখ বুলিয়ে নেয়। না! কাউকে দেখা যাচ্ছে না। আকাশ মেঘলা। ঠাণ্ডা বাতাস বইছে।
বুঝলে বুঝ পাতা। না বুঝলে তেজ পাতা। যার যত বুঝ। লাউরে কয় তরমুজ।
খুব কায়দা করে কথা বলছো। তোমার কথার আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারছি না। একটু পরিষ্কার করে বল?
বেজি খুব দ্রুত চলে যায়। বিড়াল একবার গর্ত খুঁড়ে। আরেকবার গর্তে পানি ঢালে। এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ইঁদুর বলল, তোমার পেটে দানাপানি কিছু নেই। তার ওপর এত খাটুনি। বনের বিড়াল বনে যাও।
তুমি কোত্থেকে কথা বলছো বলত? বিড়ালের চোখে মুখে বিস্ময়।
ঝোপের ভেতর শুকনো পাতার নিচ থেকে বের হয় একটা কচ্ছপ। কচ্ছপ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বিড়ালের সামনে দাঁড়ায়। কচ্ছপ বলল, এতক্ষণ সব দেখলাম।
তো। তো কী হয়েছে?
ইঁদুর জানে তোমার মতো দুষ্ট বিড়ালের অভাব নেই। তাই সে বুদ্ধি করে দুটো ফুটো রাখে। এক ফুটো দিয়ে ঢুকে অন্য ফুটো দিয়ে বের হয়। তাই নাকি!
হ্যাঁ তাই। ওই দেখ খেজুর গাছের ওপর কাঁটার ভেতর নিশ্চিন্তে বসে আছে। সব দেখছে। তোমার প্রতিটি কথার উত্তরও দিচ্ছে।
বিড়াল ওপরের দিকে তাকিয়ে দু’চোখ কপালে তুলে বলল, ওরে দুষ্ট ইঁদুর।
মামা আসার সময় হয়েছে। তুমি চলে যাও। তা না হলে তোমার কপালে দুঃখ আছে।
কচ্ছপ মুহূর্তে হাওয়া। বিড়াল খেজুর গাছে ওঠার ব্যর্থ চেষ্টা করে। একদল কিশোর ছেলেদের চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যায়। বিড়াল ঘুরে দেখে কিশোর ছেলেদের সামনে একটা কুকুর। স্বাস্থ্যও ভালো। তার দিকে চোখ পড়তেই দৌড়ে এগিয়ে আসতে থাকে। কিশোর ছেলেদের দলও হৈচৈ করে ওঠে। সে প্রাণপণ দৌড়াতে থাকে। ইঁদুর খুকখুক করে হাসে।
বিড়াল একটানা দৌড়ে বনের ভেতর ঢুকে পড়ে। কুকুর ও দুষ্ট ছেলেদের দলও ফিরে যায়। বিড়াল ঘাসের ওপর বসে হাঁপাতে থাকে। একটা ভালুক কোথায় যেন যাচ্ছিল। বিড়ালের দিকে চোখ পড়তেই থামে, তুমি বন বিড়াল। বনের ভেতর থেকো। ভুল করে ও লোকালয়ে যেও না। শেষমেশ অকালেই মারা পড়বে।
বিড়াল হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে। ভালুক চলে যায়। বিড়াল মনে মনে ভাবে, না না লোকালয়ে যাওয়া যাবে না। ওরা খুব ভয়ঙ্কর। তবে ওদের মধ্যে খুব ভাব।



