এস আলমের লুটপাট আড়ালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারে প্রভাব বিস্তারের কৌশল

নিয়ন্ত্রক নীরবতা, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও আমানতকারীদের ওপর দায় চাপানোর অনুসন্ধান

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ইসলামী ব্যাংকগুলোর অনিয়ম ও ঋণ লুটের অভিযোগ এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। প্রশ্ন উঠেছে- এত বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়ম, একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ দখল, আমানত সাইফনিং ও লোকসান সত্ত্বেও কেন কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই লুটপাট আড়াল করতে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ‘প্রটেকশন নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলা হয়েছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিষ্ক্রিয়তা, সরকারের নীতিগত নীরবতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব।

নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতা : বাংলাদেশ ব্যাংক কেন নীরব?

এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা একাধিক ইসলামী ব্যাংকে দীর্ঘ দিন ধরে অতিরিক্ত ও অযোগ্য ঋণ বিতরণ, একই গ্রুপের মধ্যে ঋণ ঘুরিয়ে নেয়া জামানতবিহীন বা অতিমূল্যায়িত জামানতের বিপরীতে অর্থ ছাড়, লোকসান আড়াল করতে হিসাব কারসাজি- এসব অভিযোগ উঠলেও বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা চৎড়সঢ়ঃ ঈড়ৎৎবপঃরাব অপঃরড়হ (চঈঅ), বোর্ড ভেঙে দেয়া, ব্যবস্থাপনা অপসারণ কিংবা লাইসেন্স বাতিল- এই ক্ষমতাগুলো প্রয়োগ না করে কেবল ‘পর্যবেক্ষণ’ আর ‘নির্দেশনা’র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। এতে লুটপাট কার্যত চলতেই থেকেছে।

এক সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পরিদর্শনে অনিয়ম ধরা পড়লেও উপরের নির্দেশে রিপোর্ট নরম করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে অডিটই শেষ করা যায়নি।’

বোর্ড দখল ও কাগুজে বৈধতার ফাঁদ

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এস আলম গ্রুপ ধাপে ধাপে ব্যাংকের বোর্ডে নিজেদের ঘনিষ্ঠদের বসিয়েছে। স্বাধীন পরিচালক ও শরিয়াহ বোর্ডকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করেছে, বোর্ড রেজুলেশন দেখিয়ে বিতর্কিত ঋণ অনুমোদন করিয়েছে। ফলে লুটের অর্থ কাগজে-কলমে ‘আইনসিদ্ধ’ দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই কৌশল পরবর্তী সময়ে আইনি তদন্তকে জটিল করে তোলে।

ভয় দেখিয়ে রাষ্ট্রকে জিম্মি

সরকারি মহলে একটি শক্তিশালী বয়ান ছড়ানো হয়েছে- ‘এস আলম নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলো ধসে পড়লে পুরো ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।’

এই ভয় দেখিয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এড়ানো হয়েছে, রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও নীতিগত ছাড় আদায় করা হয়েছে। ব্যাংক সংস্কারের নামে দায় গোপন করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের ক্ল¬াসিক উদাহরণ, যেখানে বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় নীতিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে।

আমানতকারীদের ওপর দায় চাপানোর নীতি

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে দেখা যাচ্ছে- দুই বছর মুনাফা স্থগিত, আমানতে হেয়ারকাটের আলোচনা, ব্যাংক একীভূতকরণের নামে লোকসান ঢেকে ফেলা; এই পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে লুটের দায় সরাসরি সাধারণ আমানতকারীদের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে, অথচ লুটকারীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত হয়নি।

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরতের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। একজন ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারী বলেন, ‘আমাদের জমানো টাকা দিয়ে লুটের দায় শোধ করা হচ্ছে। এটা কি ন্যায়বিচার?’

আইন ও তদন্ত : কেন দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই

এত বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির পরও দুর্নীতি দমন কমিশনের বড় কোনো মামলা দৃশ্যমান নয়। মানিলন্ডারিং তদন্তের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ হয়নি; স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, আইনগত প্রক্রিয়াকে সময়ক্ষেপণ ও নীরবতার মাধ্যমে ‘ম্যানেজ’ করা হচ্ছে, যাতে বিষয়টি ধীরে ধীরে জনমনোযোগ থেকে সরে যায়।

ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ঢাল বানানোর কৌশল

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, পুরো ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সমালোচনা এলেই বলা হচ্ছে- ‘এগুলো ইসলামী ব্যাংকিং ধ্বংসের ষড়যন্ত্র।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে অপরাধকে আড়াল করার কৌশল, যার ফলে প্রকৃত সংস্কার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এস আলম গ্রুপের ব্যাংক লুট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি সিস্টেমিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও প্রশাসনিক নীরবতা মিলেই এই লুটকে টিকিয়ে রেখেছে।

যদি অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় না আনা হয়, তবে ব্যাংক ‘বাঁচানোর’ নামে যা হচ্ছে, তা আসলে রাষ্ট্রীয় বৈধতা দেয়া একটি অর্থনৈতিক অবিচার, যার মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ আমানতকারী ও পুরো অর্থনীতিকে।