পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে অনাগ্রহী পোশাক শিল্প উদ্যোক্তারা

পোশাক খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানির ৫৮টির বাজার মূলধনে অংশ ৪ শতাংশ

শাহ আলম নূর
Printed Edition

দেশের অর্থনীতির প্রধান রফতানি খাত তৈরী পোশাক শিল্প (আরএমজি) হলেও পুঁজিবাজারে এই খাতের উপস্থিতি আশানুরূপ নয়। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই পোশাক খাতের কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনতে আগ্রহী হলেও বাস্তবে সেই অগ্রগতি খুবই কম। বিশ্লেষকরা বলছেন, কর কাঠামোয় বৈষম্য ও কার্যকর প্রণোদনার অভাবই মূলত আরএমজি কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে নিরুৎসাহিত করছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের অধিকাংশ তালিকাভুক্ত কোম্পানি ২০ থেকে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে কর সুবিধা পেলেও লাভজনক পোশাক কারখানাগুলোর কার্যকর করহার ৩০ শতাংশেরও বেশি। টেলিযোগাযোগ ও তামাক খাত বাদ দিলে অন্য কোনো শিল্পখাতে তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এত বড় কর বৈষম্য দেখা যায় না।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যমান কর ব্যবস্থায় তৈরী পোশাক শিল্পকে কর দিতে হয় দুটি ভিত্তির যেটি বেশি, সেটির ওপর। একটি রফতানি মূল্যের ১ শতাংশ এবং অন্যটি মুনাফার ১২ শতাংশ। অর্থাৎ কোনো কোম্পানির রফতানি আয় যদি ১০০ টাকা হয়, তা হলে ব্যাংক সেই আয় থেকে সরাসরি ১ টাকা কর কেটে নেয়, যদি না মুনাফার ১২ শতাংশ তার চেয়ে বেশি হয়।

বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ পোশাক কারখানার করপূর্ব মুনাফা রফতানি আয়ের ৩ শতাংশের বেশি নয়। সে ক্ষেত্রে মুনাফার ওপর কর দাঁড়ায় মাত্র ৩৬ পয়সা, যা রফতানি মূল্যের ১ শতাংশের তুলনায় কম। ফলে ১ শতাংশ করই চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য হয়। এর ফলে কার্যকর করহার দাঁড়ায় প্রায় ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে কোনো অতিরিক্ত কর সুবিধা পাওয়া যায় না। ফলে আইপিও করে পুঁজিবাজারে আসার মূল প্রণোদনাই হারিয়ে যায়। তাত্ত্বিকভাবে কোনো পোশাক কারখানার মুনাফা যদি ৪ শতাংশে পৌঁছায়, তা হলে তার কার্যকর করহার কমে প্রায় ২৫ শতাংশে নামতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এমন লাভজনক কোম্পানির সংখ্যা খুবই সীমিত। অধিকাংশ কারখানা অল্প লাভ বা লোকসানের মধ্য দিয়ে চলছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম, উৎপাদন ব্যয় বেশি এবং অর্ডার নির্ভর ব্যবসা হওয়ায় পোশাক খাতে উচ্চ মুনাফা ধরে রাখা কঠিন। ফলে কর সুবিধার শর্ত পূরণ করাই অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বাস্তবসম্মত নয়।

রফতানিমুখী শিল্প হিসেবে পোশাক খাত নগদ প্রণোদনার আওতায় থাকার কথা। সাধারণভাবে রফতানি মূল্যের ওপর দেড় শতাংশ বা তার বেশি প্রণোদনার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে এর সুবিধা খুব কম কোম্পানি পায়। কারণ, প্রণোদনা পেতে হলে স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার, নির্দিষ্ট মাত্রার মূল্য সংযোজনসহ নানা শর্ত পূরণ করতে হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নির্দিষ্ট দেশ ও উৎস থেকে কাঁচামাল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে দেয়। ফলে অনেক কারখানা এসব শর্ত পূরণ করতে পারে না।

এ ছাড়া প্রণোদনার জন্য আবেদন, নিরীক্ষা ও যাচাই প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, আবেদন করার পর প্রণোদনার অর্থ পেতে তিন বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। আবার যারা সাব-কন্ট্রাক্ট ভিত্তিতে কাজ করে, তারা এই প্রণোদনার যোগ্যই নয়।

কর কাঠামোর পাশাপাশি আরো কিছু কাঠামোগত সমস্যাও আরএমজি কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজার থেকে দূরে রাখছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মালিকদের শেয়ার হস্তান্তরে অনীহা। অনেক উদ্যোক্তা পরিবারভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চান, যা তালিকাভুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক। এ ছাড়া পুঁজিবাজারে সঠিক মূল্যায়ন না পাওয়ার আশঙ্কাও বড় কারণ। বাজার অস্থির থাকায় ভালো কোম্পানিও অনেক সময় প্রত্যাশিত মূল্য পায় না। এতে উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়।

পোশাক শিল্প মূলত অর্ডার ও এলসি নির্ভর ব্যবসা। জমি, ভবন বা বড় স্থায়ী সম্পদের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে আইপিও অনুমোদনের সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানির সম্পদ ভিত্তি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই খাতের ব্যবসায়িক মডেল বোঝার ক্ষেত্রে প্রচলিত সম্পদভিত্তিক মূল্যায়নের বাইরে যেতে হবে। তা ছাড়া অনেক সক্ষম কোম্পানি আইপিও অনুমোদন পাবে না।

বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) টেক্সটাইল ও পোশাক খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ৫৮টি। কিন্তু বাজার মূলধনে এই খাতের অংশ ৪ শতাংশেরও কম। এর অন্যতম কারণ অধিকাংশ তালিকাভুক্ত টেক্সটাইল কোম্পানি ছোট মূলধনী। স্কয়ার টেক্সটাইলস ও এনভয় টেক্সটাইলসের মতো কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান থাকলেও সামগ্রিকভাবে খাতটির প্রভাব বাজারে সীমিত।

তৈরী পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন (বিজিএমইএ) এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাতকে পুঁজিবাজারে আনতে আলাদা কর নীতি ও বাস্তবসম্মত প্রণোদনা দিতে হবে। তালিকাভুক্ত পোশাক কোম্পানির জন্য কর ছাড়, উৎসে কর কমানো এবং নগদ প্রণোদনা দ্রুত ছাড়ের ব্যবস্থা না করলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, পুঁজিবাজার শক্তিশালী করতে আরএমজি খাতের অংশগ্রহণ জরুরি। কিন্তু সেই অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে উদ্যোক্তাদের জন্য তালিকাভুক্তিকে লাভজনক ও নিরাপদ করতে হবে এটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে তিনি মনে করেন।