বছরের পর বছর চলছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের আয়রন ব্রিজ পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পটি। খরচ দু’দফায় বাড়ছে ৫১.০৮ শতাংশ। যে প্রকল্পটি পাঁচ বছরে শেষ করার কথা সেটি এখন আট বছর পার করতে যাচ্ছে। এখনো বাকি ১৪ শতাংশের মতো কাজ। যেখানে প্রায় ৮৬ শতাংশ কাজ করতেই দুই দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সাড়ে সাত বছর পর এখন ব্যয়বৃদ্ধির জন্য নতুন করে যাচাই কমিটি করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কখনোই নির্দিষ্ট রেট শিডিউলে শেষ হয় না। রেট শিডিউলের কারণেই প্রকল্প চলমান অবস্থায় খরচ বৃদ্ধি পায়। প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের প্রকৌশলী থাকার পরও পরামর্শক খাতে ব্যয় করছে।
প্রকল্পের প্রেক্ষাপট : স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রকল্প দলিল থেকে জানা যায়, দেশের দক্ষিণাঞ্চল, বিশেষ করে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ৮০ ও ৯০-এর দশকে স্বল্প ব্যয়ের ছয় হাজারের মতো আয়রন ব্রিজ তৈরি করে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করা হয়েছিল। যা বর্তমানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও কালের বিবর্তনে জরাজীর্ণ এবং নষ্ট হয়ে যোগাযোগব্যবস্থা বিঘিœত হচ্ছে। এসব ব্রিজ ভেঙে আরসিসি গার্ডার ব্রিজ ও উন্নত মানের আয়রন ব্রিজ পুনর্নির্মাণ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার মানোন্নয়নসহ সার্বিকভাবে আর্থসামাজিক অবস্থা উন্নত করার উদ্যোগ নেয়া হয় ২০১৮ সালে।
আশির দশকে ছয় হাজারের মতো এ ধরনের ব্রিজ নির্মাণ হয় যার বেশির ভাগই এখন জরাজীর্ণ। ধাপে ধাপে হলেও এসব ব্রিজ পুনর্র্র্নির্মাণ জরুরি মনে করে এসব ব্রিজ পুনর্নির্মাণ পুনর্বাসনের জন্য দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আয়রন ব্রিজ পুনর্নির্মাণ পুনর্বাসন প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে এক হাজার ৮৩৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০১৮ সালের জুলাই হতে ২০২৩ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৮ সালের ৮ মে একনেকে অনুমোদিত হয়। এখন খরচ ৪৯৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা বা ২৭.১৪ শতাংশ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। ফলে মোট খরচ বেড়ে দুই হাজার ৩৩৪ কোটি টাকায় উন্নীত হচ্ছে। আর মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব একনেকে দিয়ে সংশোধন করা হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় কাজগুলো : বাস্তবায়নকারী সংস্থা এলজিইডির তথ্যানুযায়ী, বরিশাল বিভাগের গ্রামীণ সড়কের জরাজীর্ণ ৮০৫টি লোহার ব্রিজ ভেঙে তথায় আরসিসি/পিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ এবং এক হাজার ২৪৪টি লোহার ব্রিজ পুনর্নির্মাণ/পুনর্বাসনের মাধ্যমে প্রকল্প এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন সমন্বিত সড়ক নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা। পাশাপাশি স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি।
প্রকল্পের মূলকার্যক্রম হচ্ছে : ১০ একর জমি অধিগ্রহণ। উপজেলা সড়কে ৪.৮৪৮ কিলোমিটার ব্রিজ পুনর্নির্মাণ, ইউনিয়ন সড়কে ৭.১১১ কিলোমিটার ব্রিজ পুনর্নির্মাণ, ইউনিয়ন সড়কে ৫.৩৬০ কিলোমিটার লোহার ব্রিজ রক্ষণাবেক্ষণ এবং গ্রাম সড়কে ২০.৩৪৫ কিলোমিটার লোহার ব্রিজ রক্ষণাবেক্ষণ করা।
আর ব্রিজগুলো হবে বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলায়। এগুলো হলো- বরিশাল জেলার সদর, আগৈলঝাড়া, বাবুগঞ্জ, বাকেরগঞ্জ, বানারীপাড়া, গৌরনদী, হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ, মুলাদী, উজিরপুর উপজেলা। ঝালকাঠি জেলার সদর, কাঁঠালিয়া, নলছিটি, রাজাপুর উপজেলা। ভোলা জেলার সদর, বোরহানুদ্দীন, চরফ্যাসন, দৌলতখান, লালমোহন, মনপুরা, তজুমুদ্দীন উপজেলা। পিরোজপুর জেলার সদর, ভান্ডারিয়া, কাউখালী, মঠবাড়িয়া, নাজিরপুর, নেছারাবাদ, ইন্দুরকানি উপজেলা। বরগুনা জেলার সদর, আমতলী, বামনা, পাথরঘাটা, বেতাগী, তালতলী উপজেলা। পটুয়াখালী জেলার সদর, বাউফল, দশমিনা, দুমকি, গলাচিপা, কলাপড়া, মির্জাগঞ্জ এবং রাঙ্গাবালী উপজেলা।
প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি : এলজিইডির তথ্য বলছে, পাঁচ বছরের প্রকল্প ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সাড়ে সাত বছরে কাজের অগ্রগতি ৮৫.৭৫ শতাংশ। আর ব্যয় হয়েছে দুই হাজার ১৫৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এখন প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে এবং ব্যয় ৫১.০৮ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হচ্ছে। যাতে খরচ বেড়ে হবে দুই হাজার ৭৭৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। যেটি মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল এক হাজার ৮৩৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ফলে বাড়ছে ৯৩৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
সাড়ে সাত বছর পর কাজ যাচাইয়ে কমিটি : এলজিইডি থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধিতে দৈর্ঘ্যের পরিমাণ ও ব্যয়ের গাণিতিক যৌক্তিকতা যাচাই বাছাইয়ের লক্ষ্যে চার সদস্যের কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা), এলজিইডি-আহবায়ক করা হয়েছে। কমিটির অন্যরা হলেন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ডিজাইন এলজিইডি-সদস্য ইউনিট), উপসচিব (উন্নয়ন-২), স্থানীয় সরকার বিভাগ-সদস্য এবং প্রকল্প পরিচালক, সংশ্লিষ্ট প্রকল্প-সদস্য সচিব।
প্রকল্প পরিচালকের তথ্য : সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক পর্যালোচনা সভায় প্রকল্পের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে প্রকল্প পরিচালক জানান, গত ৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত পিএসসি সভায় প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধিসহ সংশোধন প্রস্তাব আবার পিএসসি সভায় উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সে আলোকে সভায় প্রকল্পের সর্বশেষ অনুমোদিত ডিপিপির মোট ব্রিজের দৈর্ঘ্যের পরিমাণ ও ব্যয়ের গাণিতিক কিছু ত্রুটির প্রেক্ষিতে সংশোধন করা প্রয়োজন। প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি ও ডিপিপি সংশোধনের বিষয়ের যৌক্তিকতা উপস্থাপন করেন। নির্দেশনায় স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো: রেজাউল মাকছুদ জাহেদী বলেছেন, প্রকল্পের গুণগতমান বজায় রেখে কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রকল্প পরিচালক কর্তৃক প্রস্তাবিত সংশোধিত ডিপিপিতে মোট ব্রিজের ত্রুটি বা বিচ্যুতি সংশোধন এবং বৃদ্ধিসহ সব যাচাই করার জন্য চার সদস্যের কমিটি করা হয়েছে।



