রাজউক এলাকায় ইমারত নির্মাণে বিশৃঙ্খলা

অন্যের জমি দখল করে নকশা চাইলেও রাজউক থেকে তার অনুমোদন পাওয়া যায়। রাজউক থেকে পাস করা নকশায় বাড়ি নির্মাণের পর তা দখল হয়ে গেলেও সংস্থাটির বলার কিছু থাকে না। অন্যের ভূমিতে বহুতল ভবনের অংশ গেলেও রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ বিভাগ কিছু বলে না। যেসব শর্তে রাজউক থেকে নকশার অনুমোদন নেয়া হয় এর বেশির ভাগই বাস্তবে পাওয়া যায় না। একধরনের নকশার অনুমোদন নিয়ে তা বাদ দিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো ভবন নির্মাণের কয়েক হাজার নজির আছে। কিন্তু তা নিয়ে অভিযোগ করলে তা ফাইলবন্দী হয়েই পড়ে থাকে, প্রতিকার খুবই কম পাওয়া যায়।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

ইমারত নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউকের আওতাধীন সব এলাকায়ই চলছে বিশৃঙ্খলা। এ বিষয়ে ঢাকার উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের এই সংস্থাটির যেন করার কিছু নেই। মাঝে মাঝে কিছু তৎপরতা দেখালেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা কোনো ব্যবস্থা নেয় না অথবা নিতে পারে না। অন্যের জমি দখল করে নকশা চাইলেও রাজউক থেকে তার অনুমোদন পাওয়া যায়। রাজউক থেকে পাস করা নকশায় বাড়ি নির্মাণের পর তা দখল হয়ে গেলেও সংস্থাটির বলার কিছু থাকে না। অন্যের ভূমিতে বহুতল ভবনের অংশ গেলেও রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ বিভাগ কিছু বলে না। যেসব শর্তে রাজউক থেকে নকশার অনুমোদন নেয়া হয় এর বেশির ভাগই বাস্তবে পাওয়া যায় না। একধরনের নকশার অনুমোদন নিয়ে তা বাদ দিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো ভবন নির্মাণের কয়েক হাজার নজির আছে। কিন্তু তা নিয়ে অভিযোগ করলে তা ফাইলবন্দী হয়েই পড়ে থাকে, প্রতিকার খুবই কম পাওয়া যায়। তবে রাজনৈতিক অথবা প্রশাসনিক প্রভাব থাকলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফল পাওয়া যায়। এসব ব্যাপারে রাজউকের সংশ্লিষ্টরা কথা বলতে আগ্রহী হন না।

রাজধানীর বাড্ডা মৌজার ১৬৮৩ সিএস খতিয়ানের ভবনটির উপরের অংশ গড়ে উঠেছে রাস্তার ওপর। এই বাড়িটি মেরুল বাড্ডার পেছনে আনন্দনগর স্কুলের কাছে প্রধান সড়কে নির্মিত হচ্ছে। পেছন দিকে অন্যের জমিতে পড়েছে বারান্দা। বাড়িটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বলে রাজউক বিগত আওয়ামী সরকারের সময় কিছু বলতে পারেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাড়িটির বিষয়ে রাজউকে অভিযোগ দেয়া হলে, এমনকি এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। বরং বিনা বাধায় বাড়িটি নির্মাণের শেষ পথে। আশপাশের বাড়িওয়ালারা অভিযোগ করলেও রাজউক প্রতিকারে এগিয়ে আসেনি।

রাজধানীর বিমানবন্দরের পাশে কাওলার জামতলা রোডের নুর মদিনা মসজিদ রোডের আরএস দাগ- ৪১৮০ এবং সিটি জরিপ ৩০৫৫১ নম্বর দাগের ৩২১ নম্বর বাড়িতে বিগত ২৫ বছর গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইন থাকলেও এখন এটি কার্যত পতিত ভবন। পাশের প্লটে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে। প্রায় এক বছর আগে প্লটটি কিনে নতুন মালিক মো: ছানোয়ার হোসেন পাশের (আরএস দাগ ৪১৮০) ৩২১ নম্বর বাড়ির প্রবেশের রাস্তা দেয়াল তুলে বন্ধ করে দিয়েছে। ভুক্তভোগী মো: শামসুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, তার বাড়িতে যাওয়ার রাস্তায় দেয়াল তুলে বন্ধ করে দেয়ায় এখন সেখানে আর বসবাস করা সম্ভব হচ্ছে না। বাড়ির সামনের রাস্তাটি কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এ ছাড়া এই রাস্তার নিচ দিয়েই গ্যাস ও পানির লাইন এবং উপরে বিদ্যুৎ লাইন আছে। সেই লাইন দিয়ে সবাই গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইন নিজের প্লটে নিয়েছে। মো: শামসুল হকের বিদ্যুৎ মিটার নম্বর ২৬০৪৭, এই নাম্বারে গত ২৫ বছর ধরে বিদ্যুৎ বিল দেয়া হচ্ছে।

উল্লেখ্য, শামসুল হক এবং অন্যরা মোতালেব বাবুর কাছ থেকে জমিটি কিনেছিলেন। মো: ছানোয়ার হোসেন শামসুল হকের প্লটের সামনে দেয়াল তুলেছিলেন রাজউকের নকশা পাওয়ার কথা বলে। সরল বিশ্বাসে তাকে দেয়াল তোলার অনুমতি দেয়া হলেও পরে আর সরানো হচ্ছে না।

এমনকি যে দলিলের মাধ্যমে ছানোয়ার হোসেন জায়গাটি কিনেছেন তাতে একটি রাস্তা রয়েছে যা দলিলে ম্যাপ আকারে চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছে। শামসুল হক বলেন, ২৫ বছর ধরে রাস্তাটি সবাই ব্যবহার করছে, কেউ এটাকে ব্যক্তিগত সম্পদ বলেনি। এখন ছানোয়ার হোসেন এসে বলছেন, রাস্তাটি তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এমতাবস্থায় মো: শামসুল হক প্রতিকার পাওয়ার জন্য দক্ষিণ খান থানায় জিডি করেছেন আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য।

অন্য দিকে আরএস (অংশত) দাগের ৪১৮৪ মালিক মো: ছানোয়ার হোসেন তার মালিকানাধীন প্লটের নির্মাণাধীন ভবনটিতে রয়েছে নানা ধরনের রাজউকের নির্দেশ ভঙ্গ করায় উত্তরা জোনাল অফিসের অথরাইজ অফিসার চার বার কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছেন। অবশেষে ছানোয়ার হোসেন মালিকানাধীন ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য ডেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিঠি দিয়েছেন।

গতকাল রোববার ছানোয়ার হোসেনকে জিজ্ঞাসা এ ব্যাপারে করা হলে তিনি নয়া দিগন্তের এই প্রতিবেদককে জানান, এখানে কোনো পাবলিক রাস্তা নেই, যেটা আছে তা ব্যক্তিগত সম্পত্তি, নিজেদের প্লটে যাওয়ার জন্য আমরা রাস্তা করে নিয়েছি। আমাদের প্লটে আমরা রাস্তা করেছি তাতে অন্যের মাথাব্যথার কারণ থাকতে পারে না। রাজউকের অথরাইজ অফিসারের নোটিশের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নোটিশের জবাব তিনি দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে একটি মামলা রয়েছে বলে এ ব্যাপারে আর কোনো কথা তিনি বলবেন না বলে জানান।

হাইকোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে হাইকোর্ট স্থানীয় সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছেন।

এ ধরনের বিশৃঙ্খলা রাজউকে সর্বত্র। ব্যবস্থা না নিলে দিন দিন ইমারত নির্মাণে বিশৃঙ্খলা চলতেই থাকবে, একটি বসবাসযোগ্য ঢাকা গড়ে উঠবে না কখনোই।