দীর্ঘ চার মাসের বেশি সময় ধরে শূন্য শিক্ষার পাঠ প্রশাসনের শীর্ষ পদ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালকের (ডিজি) পদায়ন। মামলা জটিলতায় আটকে আছে শীর্ষ এ পদের নিয়োগ। ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা একটি সার্কুলার-বিজ্ঞাপনে মাউশির ডিজি পদে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়ার জন্য সৎ, দক্ষ এবং প্রশাসনিক কাজে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আবেদন করতে বলা হয়। যদিও ঐ সময়ে মাউশিতে ডিজি হিসেবে কর্মরত ছিলেন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আজাদ খান। কোনো প্রকার অভিযোগ কিংবা অযোগ্যতার কারণ ব্যতিরেকেই কেন এবং কী উদ্দেশ্যে এ আপত্তিকর সার্কুলার জারি করা হয়েছিল তার কোনো উত্তর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কেউই বলতে পারেননি। অবশ্য এমন অযৌক্তিক ও অবমাননাকর সিদ্ধান্তের প্রতি ক্ষোভ ও অভিমানে তখনি ডিজির দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দেন ড. আজাদ খান।
এরপরেই মাউশির ডিজি পদে আবেদন আহ্বান করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ১৪ থেকে ১৮তম ব্যাচের অনেক কর্মকর্তাই ঐ পদের জন্য লিখিত আবেদন করেন। সূত্র জানায়, মোট ৬৩টি আবেদন যাচাই বাছাই করে সংক্ষিপ্ত তালিকায় প্রফেসর পদ মর্যাদার ৯ কর্মকর্তাকে প্রাথমিকভাবে চূড়ান্তও করা হয়েছিল। বেশ গোপনীয়তার সাথে এসব কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারও নেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত যারা আবেদন করেছিলেন পরবর্তীতে তাদের অনেকের বিরুদ্ধেও অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত ডিজি নিয়োগের ঐ প্রক্রিয়া থেকেও সরে আসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তখন থেকে আজ অবধি দীর্ঘ এ চার মাস ধরেই ডিজি ছাড়াই চলছে শিক্ষার মাঠ প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান মাউশি।
অপর দিকে মাউশির ডিজি নিয়োগ প্রক্রিয়াতে কিন্তু বিপত্তি বাধে আরো একটি অন্য জায়গায়। সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডকে (এসএসবি) পাশ কাটিয়ে ডিজি পদে কর্মকর্তা থাকার পরেও কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এমন নোটিশ বা সার্কুলার জারি করে মাউশির মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ডিজি পদে বিজ্ঞাপন দিয়ে লোক নিয়োগ বিধিসম্মত বা বৈধ কি না তা নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন (নং ১৭০৭৪) দায়ের করেন মাউশির ইভাল্যুয়েশন ও মনিটরিং বিভাগের প্রধান প্রফেসর আবেদ নোমানী। বিষয়টি আমলে নিয়ে ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর হাইকোর্ট থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এমন সার্কুলারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে শিক্ষা সচিব, জনপ্রশাসন সচিব এবং সার্কুলারে স্বাক্ষরকারী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তানিয়া ফেরদৌসকে তিন সপ্তাহের সময় দিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেয়া হয়। যদিও অদ্যাবধি কোনো পক্ষ থেকেই হাইকোর্টের ঐ আদেশের বিষয়ে কোনো জবাব দেয়া হয়নি। এতে প্রকারান্তরে আদালত অবমাননা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা অবমাননাকর সার্কুলার-নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করার পরেই ১৫ ডিসেম্বর নিজ থেকেই ডিজির পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন সে সময়ে দায়িত্বরত ডিজি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আজাদ খান। এরপর ঐ পদে চলতি দায়িত্ব হিসেবে মাউশির ডিজির দায়িত্ব পালন করছেন কলেজ প্রশাসনের পরিচালক প্রফেসর বি এম আব্দুল হান্নান। অবশ্য মাউশির সূত্র জানিয়েছে ইতঃপূর্র্বে জারি করা রুলের নিষ্পত্তি না করা পর্যন্ত নতুন করে মাউশির ডিজি নিয়োগ দিতে পারবে না মন্ত্রণালয়।
এদিকে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুনভাবে মন্ত্রিসভা গঠন করেছে। সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে কাজও শুরু করেছেন। তিনিও ঘোষণা দিয়েছেন নতুনভাবেই সাজাবেন সব বিভাগ। এখন দেখার বিষয় কিভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় অচল মাউশিকে সচল করবেন। আর এ জন্য প্রথমেই মাউশির ডিজি পদে নতুন করে পদায়নের আগেই মামলা জটিলতাও দূর করতে হবে।
গতকাল সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র নয়া দিগন্তকে জানায়, মাউশির ডিজি পদে কর্মকর্তা নিযুক্ত থাকার পরেও কোনো প্রকার নিয়ম ও বিধির তোয়াক্কা না করেই এমন একটি সার্কুলার জারি করার এখতিয়ার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ছিল কি না সে বিষয় খতিয়ে দেখা দরকার। নাকি অন্য কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এমন নীতিবহির্ভূত একটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে? জনশ্রুতি রয়েছে মাউশির অনেক কর্মকর্তার অন্যায় ও অপকর্মের প্রশ্রয় না দেয়ার কারণেই অধ্যাপক আজাদ খানকে হেয় প্রতিপন্ন করতেই এ কাজ করা হয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া শিক্ষা উপদেষ্টার (অধ্যাপক সি আর আবরার) নাম ভাঙিয়ে কিছু কর্মকর্তার অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে না পেরেও ড. আজাদ খানের বিরুদ্ধে একটি সঙ্ঘবদ্ধ চক্র ষড়যন্ত্রের কলকাঠি নেড়েছে। কেননা ব্যক্তিগত জীবনে এবং পেশাগত কাজেও অধ্যাপক আজাদ কোনো অন্যায়ের সাথে আপস করেননি বা অন্যদেরকেও অন্যায় করতে দেননি।
এসব বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ১৮ মাসে দু’জন উপদেষ্টা এবং একাধিক সচিবও বদলি হয়েছেন। ফলে অনেক কাজেরই ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি। একেক সময়ে একেক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বিধি বা নিয়মেরও ব্যত্যয় ঘটেছে। এখন যেহেতু নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে কাজেই এখন সব কিছু নিয়ম মতোই চলবে। আর মামলার বিষয়টিও আদালতের মাধ্যমেই সুরাহা করা হবে এবং মাউশির ডিজি নিয়োগ প্রক্রিয়াও যথাযথ প্রক্রিয়ায় এগিয়ে নেয়া হবে।



