অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
‘রোম পুড়ে যাচ্ছে আর নীরো বাঁশি বাজাচ্ছে’- এটি একটি প্রবাদ হলেও এ মুহূর্তে এটিই দেশের পুঁজিবাজারের চিত্র। দিনের পর দিন পতন ঘটছে বাজার সূচকের। আর এ দিকে ফাঁকা হচ্ছে যাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের পকেট। প্রতিদিনই দেশের পুঁজিবাজারগুলো হাজার কোটি টাকার মূলধন হারাচ্ছে। আর এর একটি বড় অংশই দেশের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কষ্টার্জিত অর্থ। অথচ এ দিকে কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও দুই পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষের।
এক দিকে প্রতিদিনই বিনিয়োগকারীদের মূলধনের হাজার হাজার কোটি টাকা বাষ্প হয়ে উড়ে যাচ্ছে, অন্য দিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা একের পর একটি বিধিমালা তৈরিতে ব্যস্ত। আবার ডিএসই কর্তৃপক্ষ করে যাচ্ছে একের পর এক হাই প্রোফাইল বৈঠক যেটি চলমান বাজার পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে বলতে গেলে কোনো ভূমিকাই রাখছে না। আর দৈনন্দিন বাজারের প্রতি দুই সংস্থার অমনোযোগিতার ফলে বিনিয়োগকারীরা এ মুহূর্তে চূড়ান্তভাবে হতাশ। ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরগুলোতে গেলেই তাদের এ কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে- যা যাদের শোনার কথা তারা শুনছে না।
বিনিয়োগকারীরা মনে করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি দীর্ঘমেয়াদে বাজারের উন্নতির জন্য নতুন নতুন এ বিধিমালা করে থাকেন তাতে বাজারের ভালো হওয়ার কথা। আবার বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার ও বিভিন্ন সেক্টরের সাথে ডিএসই’র বড় বড় বৈঠকগুলো বাজার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারে, তাতেও তাদের সন্দেহ নেই। কিন্তু এ মুহূর্তে বাজারে যা ঘটছে তা নিয়ে দুই সংস্থার কোনো মথাব্যথা নেই। দিন দিন বাজার যেভাবে তলানির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তা থেকে বাজারকে তো প্রথমে রক্ষা করতে হবে। আর এরপরই আসতে পারে টেকসই করার পরিকল্পনা। যে বাজার কর্তৃপক্ষ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিনিয়োগকারীর পুঁজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না সেখানে বিনিয়োগইবা কিভাবে আসবে? আর সেখানে নতুন নতুন বিধিমালা ও বড় বড় বৈঠকেরই বা দরকার কি?
বিনিয়োগকারীদের এসব অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বেশ কয়েকজনের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তারা ফোন ধরেননি। তবে এ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢকা ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, এ মুহূর্তে দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাই পুঁজিবাজারের অস্থিরতার জন্য দায়ী। সামনে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন নিয়ে পুরো দেশজুড়ে এখন এক ধরনের অনিশ্চয়তা। এটির একটি সমাধান না হলে পরিস্থিতির উন্নতির আশা করা যায় না। তা ছাড়া পাঁচটি ব্যাংকের একীভূত করা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা যে ক্ষতির মুখে তা-ও বাাজর আচরণে প্রভাব ফেলছে। সর্বোপরি মার্জিন রুলসের সংশোধনীটিও এসেছে একটু অসময়ে। সবকিছুই বাজার পরিস্থিতির জন্য নেতিবাচক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্যে জানা যায় গত দু’দিনে শুধু ঢাকা বাজারই মূলধন হারিয়েছে সাত হাজার ১৮৪ কোটি টাকা। এর আগে গত সপ্তাহে বাজারটি আট হাজার ৬৩২ কোটি টাকা মূলধন হারিয়েছিল। ওই সপ্তাহে পাঁচ দিনের টানা পতনে এই পরিমাণ মূলধন হারালেও গত দু’দিনেই গড়ে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি মূলধন হারায় বাজারটি। আর এভাবেই ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের কষ্টার্জিত পুঁজি।
গতকাল মতিঝিলে বিভিন্ন ব্রেকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরে গিয়ে দেখা যায় অধিকাংশ হাউজই বলতে গেলে ফাঁকা। এদের মধ্যে উপস্থিত কয়েকজনের সাথে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে চাইলে তারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা যাদের হাতে একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার রয়েছে। তারা এ মুহূর্তে তাদের মূলধনের ৭০ শতাংশ হারিয়েছেন। তা ছাড়া অন্যান্য কোম্পানিতে যাদের বিনিয়োগ ছিল তাদেরও এখন ত্রাহি অবস্থা। নয়া দিগন্তকে তারা বলেন, ‘আমরা এখন হাল ছেড়ে দিয়েছি। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন এক কথা বলে, আবার অর্থ মন্ত্রণালয় বলে অন্য কথা।’ সত্তরের কাছাকাছি বয়সের বয়োজ্যেষ্ঠ একজন বলেই ফেললেন, ‘পুঁজির চাইতেও এ মুহূর্তে সুস্থ্য থাকাই বড় কথা। তাই আর আশা নিরাশার দোলাচলে আর দুলতে চাই না। কপালে যাই থাক, শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে চাই’।
এ সময় কথায় কথায় তারই পাশে থাকা অন্য একজন ওই বয়স্ক ব্যক্তির কথা বলতে গিয়ে জানালেন, সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ছিলেন তিনি। অবসরের পর পাওয়া অর্থের একটি অংশ বিনিয়োগ করেছিলন। কিন্তু এ মুহূর্তে তার ৬০ শতাংশই নেই হয়ে গেছে। শুধু ওই ভদ্রলোক নন এমনও অনেকে আছেন যারা বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করে আছেন কখন বাজার ভালো অবস্থায় যাবে। এবার লোকসান একটু সহনীয় পর্যায়ে পৌঁছলেই বাজার ছেড়ে বেরিয়ে যাবেন। কিন্তু সেই দিন আর আসে না। সাম্প্রতিক সময়ের এ পতনের পরতো মূলধনই নাই হচ্ছে যাচ্ছে।
গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩৯ দশমিক ১৭ পয়েন্ট অবনতি ঘটে। চার হাজার ৮৯৯ দশমিক ৯২ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার দিনশেষে নেমে আসে চার হাজার ৮৬০ দশমিক ৭৫ পয়েন্টে। এর আগে রোববার সূচকটির ৬৮ দশমিক ০১ পয়েন্ট হারায় ডিএসই। আর এ দু’দিনে বাজারটি হারায় সূচকের ১০৭ পয়েন্টের বেশি। আর এ দু’দিনেই হারিয়ে গেছে ডিএসই’র মূলধনের সাত হাজার ১৮৪ কোটি টাকা। এ দিন ডিএসই’র দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারিয়েছে যথাক্রমে ১৮ দশমিক ৪৯ ও ১১ দশমিক ৮৯ পয়েন্ট। একই সময় দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচকের ১৪৬ দশমিক ৩৫ পয়েন্ট হারায়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৭২ দশমিক ৫১ ও ৭৭ দশমিক ৩৫ পয়েন্ট।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে গতকাল লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল আনোয়ার গ্যালভেনাইজিং। ২১ কোটি ৩৯ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ২২ লাখ ৫৫ হাজার শেয়ার বেচাকেনা হয় গতকাল। ১৯ কোটি ৪২ লাখ টাকায় চার লাখ ৯৭ হাজার শেয়ার লেনদেন করে ওরিয়ন ইনফিউশন ছিল দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডার্স, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, মনোস্পুল পেপার, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি ও রানার অটোমোবাইলস।



