জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে সংসদে মতপার্থক্য

সংসদ প্রতিবেদক
Printed Edition
  • সংবিধান সংশোধনে ১৭ সদস্যের কমিটিতে বিরোধী দলকে ৫ জনের নাম দেয়ার প্রস্তাব আইনমন্ত্রীর
  • আমরা চেয়েছি রিফর্ম আর এখানে হচ্ছে অ্যামেন্ডমেন্ট; নাম দিতে সময় নিলেন বিরোধীদলীয় নেতা

রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে প্রণিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংশোধন নিয়ে সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান সংসদকে জানিয়েছেন সরকার সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত ১৭ সদস্যের বিশেষ কমিটিতে বিএনপি জোট থেকে ১২ জন এবং বিরোধী দল থেকে ৫ জনের নাম চান। বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান সংসদকে জানান, এখানে কনসেপচুয়াল ডিফারেন্স আছে। আমরা চেয়েছি রিফর্ম আর এখানে হচ্ছে এমেনমেন্ট। এই জায়গাটায় আগেও আমাদের ডিফারেন্স ছিল। এখনো এটা আছে। উনাদের প্রস্তাব আমরা নিলাম, শুনলাম। কিন্তু আমরা পরে জানাবো।

গতকাল বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৪তম দিনে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সভাপতিত্ব করছিলেন।

রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনার আগে সংসদে দাঁড়িয়ে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাবনা তুলে ধরে

আইনমন্ত্রী বলেন, এখন পর্যন্ত যে সাংবিধানিক চর্চা চলে সেই সাংবিধানিক চর্চা আমরা এখানেও করতে চাই। সেই চর্চার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে আমি এবং আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই সংসদে উপস্থাপন করেছিলেন যে, আমরা একটি সংসদীয় বিশেষ কমিটি করতে চাই। যেটা সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি। আমাদের রুল ২৬৬ অনুসারে সেই কমিটির বিষয়ে আমরা ১২ জনের নাম তালিকা ঠিক করেছি। যেখানে বিএনপি আছে, যেখানে গণঅধিকার পরিষদ আছে, যেখানে গণসংতি আছে, যেখানে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টিও (বিজেপি) আছে এবং স্বতন্ত্র সদস্যদেরকেও রাখা হয়েছে। ১২ জনের একটি তালিকা আমরা করেছি। আমরা বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পাঁচজনের নাম চাচ্ছি। এখানে ১২ জনের মধ্যে বিএনপি সাতজন দিয়েছে, পাঁচজন অন্য দলের থেকে দেয়া হয়েছে। এবং উনাদের পক্ষ থেকে যদি পাঁচজনকে দেয়া হয়, তাহলে এই কমিটি সংক্রান্ত বিষয় আমরা আগামীকাল (আজ বৃহস্পতিবার) উপস্থাপন করতে চাই। সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠন করার জন্য আমরা চাই উনাদের পক্ষ থেকে যদি পাঁচজনের নাম কালকে (বৃহস্পতিবার) দেন, তাহলে আমরা এই কমিটি গঠন করে সংবিধান সংশোধন এবং জুলাই সনদকে সামনে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই।

এ সময় ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দলের নেতার উদ্দেশে বলেন, আইনমন্ত্রী যে কথাটা বললেন যে বিএনপি থেকে সাতজন আর অন্যান্য সংগঠন থেকে পাঁচজন এই ১২ জনের একটা তালিকা ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে মোর অর লেস প্রস্তুত করেছেন। আপনাদের অপজিশন থেকে পাঁচজনের তালিকা চাচ্ছেন। এই ১৭ জন নিয়ে উনারা যে বিশেষ কমিটিটা করবেন। দয়া করে যদি আপনি আপনাদের পাঁচজনের তালিকাটা দেন তাহলে হয়তো কমিটি গঠন প্রক্রিয়াটা এগিয়ে যাবে।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান স্পিকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এ বিষয়টা নিয়ে চিফ হুইপও আমার সাথে কথা বলেছেন। এবং উনি যথারীতি সংসদ নেতার সালাম দিয়েই কথা বলেছেন। তো আমি উনাকে বলেছি যে, এই বিষয়টা আমাদের মাঝে একটা আলোচনার বিষয় আছে। কারণ এখানে কনসেপচুয়াল ডিফারেন্স আছে আমাদের। তা আমরা আলোচনা করে জানাবো। এটা আজকেই হয়ে যাবে বোধ হয় এমনটা নয়। তিনি বলেন, আমরা চেয়েছি রিফর্ম আর এখানে হচ্ছে অ্যামেনমেন্ট। এই জায়গাটায় আগেও আমাদের ডিফারেন্স ছিল। এখনো এটা আছে। তো উনাদের যে প্রস্তাব উনারা দিয়েছেন, সেটাকে আমরা নিলাম, শুনলাম। বাট আমরা পরে জানাবো, এখন আমরা কিছু বলছি না এ ব্যাপারে।

এ পর্যায়ে আইনমন্ত্রী সংসদকে বলেন, বিরোধীদলীয় নেতাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমাদের এটাতে কোনো অসুবিধা নাই। আমরা অপেক্ষা করব, আমরা সংবিধান সংশোধনের পথে এগিয়ে যাবো, জুলাই সনদের আলোকে। সুতরাং আমাদের যদি এ জন্য অপেক্ষা করতে হয়, আমাদের পরবর্তী সেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে কোনও অসুবিধা হবে না।

উল্লেখ্য, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সংবিধান সংশোধন বা সংস্কারের বিষয়টি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু হয়ে রয়েছে। জুলাই সনদ আদেশ অনুযায়ী, ১৩তম সংসদের সদস্যদের দ্বৈত ভূমিকা পালনের কথা ছিল- সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সনদে বর্ণিত ৪৮টি সাংবিধানিক বিধান সংস্কারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার কথা থাকলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সদস্যরা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি, তবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের ৭৭ জন সংসদ সদস্য উভয় শপথ গ্রহণ করেছেন।

প্রেক্ষাপট

রাজনৈতিক দলগুলোর মতৈক্যের ভিত্তিতে প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদের ৪৮টি প্রস্তাব নিয়ে আগে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সেই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় সনদের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। তবে বিএনপি এই মৌলিক সংস্কারগুলোর কয়েকটিতে ভিন্নমত পোষণ করে আসছে। অন্য দিকে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দল সংস্কার পরিষদের মাধ্যমেই পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে।