আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোকে উন্নয়নের বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হলেও এর পেছনের বাস্তব চিত্র ছিল খুবই অপরিকল্পিত। প্রয়োজনীয় গ্যাস সংস্থান নিশ্চিত না করেই একের পর এক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এর ফল হিসেবে আজ দেশের জ্বালানি খাত ভয়াবহ সঙ্কটে পড়েছে। শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গৃহস্থালি সব খাতে গ্যাসের তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে অর্থনীতি ও জনজীবনে।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, গত ১৫ বছরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। এর বড় একটি অংশ গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ গ্যাসের চাহিদা পূরণে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, পুরনো ক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়ানো কিংবা গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান সব ক্ষেত্রেই ছিল দীর্ঘসূত্রতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০০৯ সালের পর থেকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ধীরে ধীরে কমলেও সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদনে ছিল আগ্রাসী। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে, অথচ জ্বালানি নিরাপত্তার মৌলিক পরিকল্পনা উপেক্ষিত থেকেছে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও গ্যাসের অভাবে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বসে আছে।
এ ঘাটতি সামাল দিতে সরকার আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা বাড়ায়। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে এলএনজির উচ্চ মূল্য, ডলার সঙ্কট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আমদানি কখনোই চাহিদা অনুযায়ী নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এতে রাষ্ট্রীয় গ্যাস বিতরণ সংস্থাগুলো নিয়মিত লোডশেডিং ও গ্যাস রেশনিংয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছে শিল্প খাত। তৈরী পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিলসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক কারখানায় সপ্তাহে কয়েক দিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, রফতানি আদেশ পূরণে সমস্যা দেখা দিচ্ছে, বাড়ছে উৎপাদন খরচ। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে।
গৃহস্থালিতেও সঙ্কট চরম আকার ধারণ করেছে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে দিনের পর দিন চুলা জ্বলছে না। মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল এলপিজির দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু সেখানেও রয়েছে সিন্ডিকেট ও মূল্য অস্থিরতা। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য রান্নার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতেও এর প্রভাব স্পষ্ট। গ্যাস না পেয়ে সরকার ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে বাধ্য হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে বিদ্যুতের ভর্তুকি বেড়েছে, বাড়ছে সরকারের আর্থিক চাপ। শেষ পর্যন্ত এর বোঝা এসে পড়ছে ভোক্তার ওপর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর মাধ্যমে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ এ বিষয়ে গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন কমে গেছে। গত বছরের থেকে দিনে ২৫ কোটি ঘনফুট কম উৎপাদন হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে সরবরাহের ক্ষেত্রে। তিনি বলেন, আমাদের শিল্পের উৎপাদন ঠিক রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে আবাসিকে গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। তিনি বলেন, শীতকালে এমনিতেই গ্যাসের চাপ কম থাকে। এর ওপর উৎপাদন কমে যাওয়ায় সামগ্রিক প্রভাব পড়েছে সব ক্ষেত্রে। এর সমাধানের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এর একমাত্র সমাধান অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো। এ জন্য আমাদের নতুন নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিস্কার করতে হবে। পুরনো কূপগুলো সংস্কার করে উৎপাদন বাড়ানোর আর কোনো বিকল্প নেই।
পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত ৫ জানুয়ারি দেশে অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন হয়েছিল ২৬৪ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে উৎপাদন হয়েছিল ২৭২ কোটি ঘনফুট। গ্যাস উৎপাদনের মধ্যে দেশীয় তিনটি গ্যাস ক্ষেত্র থেকে ১১৩ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৭১ কোটি ঘনফুট। অন্য দিকে দুই বিদেশী কোম্পানির ১৬১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১০১ কোটি ৮৬ লাখ ঘনফুট। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে পরিমাণ উৎপাদন হচ্ছে চাহিদা তার চেয়ে অনেক বেশি। যেমন- ৫ জানুয়ারিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের চাহিদা ছিল ২৫২ কোটি ৪৯ লাখ ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ৭৪ কোটি ৮৬ লাখ ঘনফুট। সারকারখানাগুলোতে ৩২ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুটের বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ২৩ কোটি ৪৩ লাখ ঘনফুট। বাকি গ্যাস শিল্প ও আবাসিকে সরবরাহ করা হয়। তবে যে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা হয় তার মধ্যে উৎপাদনের মাত্র ১০ শতাংশ আবাসিকে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ সঙ্কট আকস্মিক নয়; এটি দীর্ঘদিনের ভুল নীতির ফল। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর নামে সমন্বিত জ্বালানি পরিকল্পনা ছাড়া সিদ্ধান্ত নেয়াই আজকের সঙ্কটের মূল কারণ। যদি সময়মতো গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা হতো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো হতো এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদনে বাস্তবসম্মত চাহিদা বিশ্লেষণ করা হতো, তা হলে এই পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব ছিল।
বর্তমান বাস্তবতায় সঙ্কট কাটাতে স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর কথা বলা হলেও তা টেকসই নয়। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, গভীর সমুদ্রে বিনিয়োগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি বৈচিত্র্য নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন।
অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের খেসারত এখন দিচ্ছে পুরো দেশ। বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু গ্যাস নেই- এ বৈপরীত্যই আওয়ামী লীগ আমলের জ্বালানি নীতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।



