- চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে খোলাবাজারে
- বাড়ছে বিস্ফোরণের ঝুঁকি
- একের পর এক অভিযানেও চলছে মজুদ
দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভয়াবহ আকারে বাড়ছে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ। ফিলিং স্টেশনে তেল পাওয়া না গেলেও কয়েক গুণ বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে মফস্বল এলাকার বাজার বা দোকানে। এক শ্রেণীর মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ী ফিলিং স্টেশনের সাথে চুক্তি করে কালোবাজারে বিক্রি করছে সোনার হরিণ হয়ে যাওয়া জ্বালানি তেল।
বিশেষ করে জেলা-উপজেলা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের টহল কম থাকায় বেশি দামে পেট্রোল পাম্পের জ্বালানি কিনে নিয়ে আরো চড়া দামে বিক্রি করা হচ্ছে খোলা বাজারে। আবার কেউ কেউ আরো বেশি মূল্য পাওয়ার আশায় অবৈধভাবে বাসাবাড়ি, গ্যারেজ, গুদাম এমনকি মাটির নিচেও বিপজ্জনকভাবে সংরক্ষণ করছে। এতে তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি। শুধু দেশের মধ্যেই নয়, আরো একটি চক্র দেশের এই সঙ্কটকালেও পাশের দেশ মিয়ানমারে জ্বালানি তেল পাচারের চেষ্টা করছে।
গত কয়েক দিন সরেজমিনে খুলনা, বাগেরহাট, নড়াইল, গোপালগঞ্জের বিভিন্ন মফস্বল এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। ঈদুল ফিতরের পরদিন থেকে এসব এলাকার প্রায় প্রতিটি পাম্পে কৃত্রিমভাবে জ্বালানি তেলের সঙ্কট দেখানো হয়। পাম্পে গেলেই দেখা যায় রশি টানিয়ে সেখানে লেখা রয়েছে ‘তেল নেই’ অথবা পাম্প বন্ধ। দিনের কোনো এক সময় পাম্প খুলে তেল দিলেও কিছু সময়ের মধ্যেই তেল নেই বলে তা পুনরায় বন্ধ করে দেয়া হয়। অথচ ওই সময়ে বিভিন্ন বাজারের দোকানে দেখা যায় বোতল ভর্তি তেলের সারি। সরকার তেলের মূল্য বৃদ্ধি না করলেও ওই সব দোকানি চড়াদামে বিক্রি করছে জ্বালানি তেল। বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার গাংনী, বড়ঘাট, নগরকান্দিবাজারসহ বিভিন্ন দোকানে দেখা গেছে বোতল ভর্তি পেট্রল, অকটেন। সেখানে ১২০ টাকার এক লিটার অকটেনের জন্য নেয়া হচ্ছে ১৮০ টাকা পর্যন্ত। কোনো কোনো যায়গায় পেট্রলের ক্ষেত্রেও একই দাম নেয়া হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গভীর রাতে বড় বড় ড্রাম নিয়ে তারা চলে যান নিকটস্থ পাম্পে। কখনো কখনো সুযোগ বুঝে আগেই ড্রাম ও টাকা রেখে আসা হয়। সেখানে লিটার প্রতি ২০ থেকে ২৫ টাকা বেশি দিয়ে ড্রাম ভর্তি করে তেল নিয়ে ভোর হতে না হতেই নিজেদের দোকান পৌঁছান। ওই তেল এক ও দুই লিটার করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পানি অথবা সফট ড্রিংসের বোতলে ভরে বিক্রি করেন। এতে পাম্প মালিকদেরও লাভ হয়, আমাদেরও লাভ হয়, আবার গ্রহকরাও তেল পেয়ে যায়। তবে এসব এলাকার সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, দিনের কোনো সময়ে পাম্পে তেল পাওয়া যায় না। পাম্পে গেলেই শুধু শুনতে হয়, তেল নেই। বিশেষ করে পেট্রল ও অকটেন। অথচ এলাকার বাজারে, দোকানে এসব তেল কিভাবে আসে জানি না। প্রয়োজন হওয়ায় বাধ্য হয়ে বাড়তি টাকা নিয়ে খোলা বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে আমাদের। অথচ অনেকের বাসায় ৩০ থেকে ৬০ লিটার করে অকটেন পেট্রল মজুদ করা রয়েছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকরা এভাবে তেল মজুদ করছেন।
বিভিন্ন স্থানে অভিযান ও দুর্ঘটনা
নড়াইলের তুলারামপুরে তেল না পেয়ে ট্রাক চাপা দিয়ে পাম্প ম্যানেজারকে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা গেছে, শনিবার রাতে নড়াইল-যশোর সড়কের পাশে অবস্থিত মেসার্স তানভীর ফিলিং অ্যান্ড গ্যাস স্টেশনে ট্রাকের জন্য ডিজেল নিতে আসেন পেড়লী গ্রামের ট্রাকচালক সুজাত মোল্লা। ফিলিং স্টেশনে তেল না থাকায় ম্যানেজার নাহিদ সরদারের সাথে বাগি¦তণ্ডা হয় তার। একপর্যায়ে ট্রাকচালক সুজাত নাহিদকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার হুমকি দেন। পরে রাত ২টার দিকে নাহিদ ও কর্মচারী জিহাদ মোটরসাইকেলে বাড়ি যাওয়ার সময়। ফিলিং স্টেশন থেকে ১০০ গজ দূরে ট্রাকচালক সুজাত পেছন দিক দিয়ে এসে তাদের চাপা দেন। এতে ঘটনাস্থলে নাহিদ সরদার মারা যান। মারাত্মক আহত অবস্থায় জিহাদ মোল্লাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঘটনার পর ট্রাকচালক সুজাত ট্রাক নিয়ে পালিয়ে যান। পরে যশোর থেকে তাকে গ্রেফতার করে র্যাব-৬ এর একটি দল।
শনিবার রাত ৩টায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানাধীন কর্ণফুলী চ্যানেলের ১৪ নাম্বার ঘাট সংলগ্ন এলাকায় মিয়ানমারে পাচারকালে বিপুল পরিমাণ ডিজেল, আলকাতরা ও একটি অবৈধ আর্টিসানাল ট্রলিং বোটসহ সাতজন পাচারকারীকে আটক করেছে কোস্টগার্ড। অভিযান মিয়ানমারে পাচারের সময় ১ হাজার ৬০০ লিটার ডিজেল, ৩ হাজার ৩০০ কেজি আলকাতরা ও চারটি ডিজেল ইঞ্জিনসহ সাতজন পাচারকারীকে আটক করা। কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এ তথ্য জানান।
এ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন টিম, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা থানার শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকা থেকে প্রায় ছয় হাজার লিটার অবৈধভাবে মজুদ করা ডিজেল উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে ৩০টি ড্রাম ও তেল লোডিং-আনলোডিং পাম্প জব্দ করা হলেও কাউকে আটক করা যায়নি। একই দিনে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে দুই প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ এলপিজি গ্যাস, অকটেন ও পেট্রল উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠান দু’টিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এর আগে ময়মনসিংহের শেরপুরে একটি পাঁচতলা আবাসিক ভবনের নিচতলায় নিয়মবহির্ভূতভাবে ২৫ হাজার লিটার জ্বালানি তেল মজুদ রাখার দায়ে এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং এক দিনের মধ্যে ট্যাংক অপসারণের নির্দেশ দেয়া হয়। টাঙ্গাইলের সখীপুরে অভিযান চালিয়ে ৫ হাজার ১৮০ লিটার পেট্রল ও ডিজেল জব্দ করা হয়।
বাড়ছে বিস্ফোরণের ঝুঁকি
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধভাবে জ্বালানি মজুদ করা শুধু বেআইনি নয়, অত্যন্ত বিপজ্জনকও। বিশেষ করে পেট্রল ও অকটেন দ্রুত বাষ্পে পরিণত হয়। ওই বাষ্প সামান্য আগুনের উৎসের সংস্পর্শে এলে তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মতে, অনুমোদিত নিরাপদ স্টোরেজ ও নির্ধারিত নিরাপত্তা মান বজায় না রেখে জ্বালানি সংরক্ষণ করলে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান সরদার জানান, নিরাপত্তার স্বার্থে অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদিত স্থাপনাতেই সংরক্ষণ করা উচিত।
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুদ করা অন্যায়। আমরা এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বা ব্যক্তি অতি লাভের আশায় বাসা-বাড়িসহ নানা জায়গায় জ্বালানি তেল মজুদ করছেন। তবে এটা ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা নিয়মিত এর বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছি। তেল উদ্ধার ও আটকও করা হচ্ছে।



