শাহেদ মতিউর রহমান
বিগত আওয়ামী আমলে আইসিটি শিক্ষাখাতে অতিব্যয়ের আড়ালে কোটি কোটি টাকা হরিলুটের তথ্য বেরিয়ে আসছে। বিশেষ করে দেশের শিাব্যবস্থায় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বা আইসিটি শিার বিস্তার ঘটাতে গত দেড় দশকে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও প্রকৃত অর্থে শিখন ঘাটতি ছিল প্রচণ্ড আকারে। স্কুল-কলেজে কম্পিউটার ল্যাব, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিক, ইন্টারনেট সংযোগ, শিক প্রশিণ এবং ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির নামে একের পর এক প্রকল্প নেয়া হয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের সুফল কতটা শিার্থীদের কাছে পৌঁছেছে সেই প্রশ্নের পাশাপাশি এখন সামনে এসেছে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, দুর্নীতি, অদতা ও তদারকির ঘাটতির অভিযোগ।
সম্প্রতি এক অনুসন্ধানে রংপুরের বিভিন্ন শিাপ্রতিষ্ঠানে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবের বেহাল চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত একটি প্রকল্পে ৬৪ জেলার প্রায় চার হাজার শিাপ্রতিষ্ঠানে ল্যাব স্থাপন করা হয়। প্রকল্পটির ব্যয় ছিল প্রায় ৩৯৮ কোটি টাকা। কিন্তু রংপুর শহর ও সদর উপজেলার ৩০টি ল্যাব পরিদর্শন করে দেখা যায়, ১৫টি ল্যাবের প্রতিটিতে ১০টির বেশি ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ নষ্ট। আরো নয়টি ল্যাবে পাঁচ থেকে আটটি করে কম্পিউটার অচল ছিল। মাত্র ছয়টি প্রতিষ্ঠানে সব কম্পিউটার সচল পাওয়া যায়। আরেক অনুসন্ধানে রংপুরের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ল্যাব সাত বছরেও কার্যকরভাবে ব্যবহার হয়নি। ল্যাব পরিচালনার জন্য শিকদের প্রশিণ দেয়া হলেও তারা জানিয়েছেন, প্রশিণের মেয়াদ ও মান পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সরঞ্জাম দেয়া হলেও সেগুলো শিার্থীদের নিয়মিত পাঠদানে কাজে লাগেনি।
তবে সমস্যা শুধু যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়া নয়। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ল্যাবের রণাবেণের দায়িত্ব শিাপ্রতিষ্ঠানের ওপর দিয়ে দেয়া হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা মেরামত বাজেট নেই। ফলে একটি কম্পিউটার নষ্ট হলে সেটি মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর পড়ে থাকে। এতে ‘ডিজিটাল ল্যাব’ অনেক েেত্র পরিণত হচ্ছে তালাবদ্ধ ক।ে আইসিটি খাতে বড় প্রকল্পের অর্থব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সূত্র জানায় শেখ রাসেল ল্যাব স্থাপন প্রকল্পে ৯৩৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে প্রকল্প ঘিরে অভিযোগের কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সাথে আইসিটি খাতের একাধিক বড় প্রকল্পের বিপুল অর্থব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এদিকে ২০২৬ সালে সাবেক সরকারের সময়ের আইসিটি খাত নিয়ে প্রকাশিত শ্বেতপত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, আইসিটি অধিদফতর, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, হাইটেক পার্ক কর্তৃপ ও এটুআইসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, সিন্ডিকেশন ও আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন ও একটি চলচ্চিত্র নির্মাণে মোট ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রসঙ্গও উল্লেখ করা হয়।
ল্যাবের জন্য দরকার শিক ও ব্যবস্থাপনা
আইসিটি শিার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অবকাঠামো ও মানবসম্পদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। সরকার এক দিকে হাজার হাজার ল্যাব স্থাপন করেছে, অন্য দিকে অনেক প্রতিষ্ঠানে দ আইসিটি শিক ও টেকনিশিয়ানের ঘাটতি রয়ে গেছে। সম্প্রতি রংপুরের অনুসন্ধানেও শিক ও কারিগরি দতার ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। অর্থাৎ, একটি বিদ্যালয়ে ১০টি কম্পিউটার দিলেই আইসিটি শিা নিশ্চিত হয় না। দরকার প্রশিতি শিক, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট, রণাবেণ বাজেট, ব্যবহারভিত্তিক পাঠক্রম এবং নিয়মিত তদারকি। এসবের কোনো একটি দুর্বল হলে পুরো বিনিয়োগই অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।
সরকারি তথ্যেও দেখা যায়, আইসিটি শিার জন্য দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রকল্প চলেছে। ‘আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিার প্রচলন’ প্রকল্পটির মেয়াদ সংশোধনের মাধ্যমে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল এবং এর প্রাক্কলিত ব্যয় ১৩ হাজার ৪৭৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা। তবে এই প্রকল্পটি এখন আর চালু রাখার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বিএনপি সরকার।
সরকারের সামনে নতুন সুযোগ
বর্তমান সরকার পুরনো প্রকল্পগুলোর অন্ধ সম্প্রসারণের বদলে আইসিটি শিায় মান, দতা ও জবাবদিহিকে গুরুত্ব দিলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের বর্তমান প্রকল্প তালিকায় ২০২৬ সালেও বিভিন্ন দতা উন্নয়ন, আইটি প্রশিণ ও ইনকিউবেশন প্রকল্প চলমান রয়েছে। এ ছাড়া ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং শিকদের প্রশিণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগগুলো সফল করতে প্রথম কাজ হওয়া উচিত পুরনো ল্যাবগুলোর পূর্ণাঙ্গ অডিট। কোন প্রতিষ্ঠানে কতটি কম্পিউটার দেয়া হয়েছিল, কতটি সচল, কতটি নষ্ট, কেন নষ্ট এবং কতদিন ধরে অচল,এসব তথ্য প্রকাশ্যে আনতে হবে।
একই সাথে প্রতিটি ল্যাবের জন্য ডিজিটাল ইনভেন্টরি তৈরি করা যেতে পারে। এতে একটি কম্পিউটার বা ল্যাপটপ কোথায় আছে, তার বর্তমান অবস্থা কী এবং কখন মেরামত হয়েছে, সবকিছু অনলাইনে দেখা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে নতুন প্রকল্প নেয়ার আগে পুরনো প্রকল্পের ফলাফল মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ, যে বিদ্যালয়ে আগের ল্যাবই ব্যবহার হচ্ছে না, সেখানে আবার নতুন কম্পিউটার দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। কেননা আইসিটি শিা এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি শিার্থীর ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও দতার অন্যতম ভিত্তি। সরকারি ওয়েবসাইটেও পূর্ববর্তী প্রকল্পগুলোর মধ্যে ৬৪ জেলার ১২৮টি শিাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন ও আইসিটি প্রশিণের উদ্যোগ এবং দেশজুড়ে কম্পিউটার ও ভাষা প্রশিণ ল্যাব স্থাপনের প্রকল্পের তথ্য রয়েছে।
তাই এখন প্রয়োজন ‘ল্যাব কতটি হলো’ এই হিসাব থেকে বেরিয়ে ‘ল্যাব কতটা ব্যবহার হচ্ছে’ এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। দুর্নীতি বন্ধের পাশাপাশি প্রকল্পের মান, ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, শিক প্রশিণ, রণাবেণ ও শিার্থীদের বাস্তব দতা অর্জনকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। তা না হলে আইসিটি শিার নামে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ থাকবে; কিন্তু শিার্থীর হাতে থাকবে না প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি-দতা।



