বিবিসি ও রয়টার্স
ইয়েমেন উপকূলে গোলার আঘাতে ভারতের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এমএসভি ফাইজ নূরে আউলিয়া’ সাগরে ডুবে গেছে। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জাহাজে থাকা ১৪ আরোহীর সবাইকেই নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ভারতের নৌপরিবহনমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান, আক্রান্ত জাহাজের ১৪ জন আরোহীর মধ্যে ১৩ জনই ছিলেন ভারতীয় নাগরিক। ঘটনাটিকে ‘উসকানিমূলক হামলা’ আখ্যা দিয়ে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং নিশ্চিত করেন যে, লোহিত সাগর এলাকায় নাবিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় সম্ভাব্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত ঠিক কোন গোষ্ঠী কিংবা বাহিনী এ আক্রমণ পরিচালনা করেছে, তা পরিষ্কার নয়।
লোহিত সাগরে প্রতিনিয়ত চলাচলকারী জাহাজের ওপর চলমান ধারাবাহিক আঘাতের মধ্য এটি সর্বশেষ ঘটনা। হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার পর থেকেই বহু জ্বালানিবাহী জাহাজ বিকল্প পথ হিসেবে লোহিত সাগর ব্যবহার করে আসছিল। এই অনাকাক্সিক্ষত অঘটন ঘটার পরপরই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করে। ওই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যতরীতে আক্রমণের এই ধারাকে ‘গভীর উদ্বেগজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়, ‘বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর এই সংস্কৃতি অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার। বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে আন্তর্জাতিক জলসীমায় বিনা বাধায় ও সম্পূর্ণ নিরাপদে জাহাজ চলাচলের সুযোগ দ্রুত পুনর্বাহ করতে হবে।’
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার প্রভাবে পুরো এই নৌপথটি মারাত্মক অচলাবস্থার মুখে পড়ে। বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালী ইরান পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তেলের দাম হু-হু করে বাড়তে থাকে। বাধ্য হয়ে সৌদি আরব থেকে তেল পরিবহনকারী জাহাজগুলো লোহিত সাগরকে বিকল্প পথ হিসেবে বেছে নেয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের তেলবাহী ট্যাংকার লক্ষ্য করে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হাউছি বিদ্রোহীদের উপরি-উপরি হামলা আন্তর্জাতিক এই জলপথের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনের অন্তর্বর্তীকালীন পরিবহন মন্ত্রণালয় আক্রমণটির মূল দায় চাপিয়েছে হাউছিদের ওপর। তাদের বক্তব্য, একটি বিস্ফোরকবোঝাই মানবহীন নৌযান দিয়ে আঘাত হেনে জাহাজটি ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে। যদিও হাউছিদের পক্ষ থেকে এই খবরের সত্যতা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এর আগে গত ২০ জুলাই হাউছিরা লোহিত সাগরে অবস্থিত সৌদি আরবের বন্দরগুলোতে সর্বাত্মক অবরোধ ঘোষণা করেছিল।
ব্রিটেনের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, গত সপ্তাহজুড়ে ওই অঞ্চলের আন্তর্জাতিক নৌপথে বিভিন্ন জাহাজের ওপর একাধিক হামলা হয়েছে। এমন অস্থিতিশীল রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যেও মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বিগত তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেয়ার ব্যাপারে ইরানের সাথে একটি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের ইতিবাচক আশাবাদের ফলেই তেলের বাজারে এই দরপতন ঘটে। চলতি বছরের জুন মাসে সামরিক হামলা বন্ধ, অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালী ফের চালুকরণ এবং পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে যুদ্ধ পুরোপুরি থামানোর শর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছিল। তবে স্বাক্ষরের মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একপক্ষীয়ভাবে যুদ্ধবিরতি বাতিলের ঘোষণা দেন। এরপর হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের একের পর এক হামলা এবং এর বিপরীতে ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন আক্রমণের কারণে পুরো চুক্তিটি ভেস্তে যায়।
তবে শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিকদের দাবি, ইরানের সাথে চলমান আলোচনা ইতিবাচক মোড় নিচ্ছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালী চালুর বিষয়ে চলতি সপ্তাহের মঙ্গল বা বুধবারের মধ্যেই নতুন একটি সমঝোতা চুক্তি হতে পারে। যদিও ইরান এই দাবি সরাসরি নাকচ করে পরিষ্কার জানিয়েছে, আমেরিকার সাথে তারা সরাসরি কোনো আলোচনায় অংশ নিচ্ছে না। ওমানের মধ্যস্থতায় পরোক্ষভাবেই আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।



