ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার একটি হোটেলে আগুনে সাত বাংলাদেশীসহ ৯ জনের মৃত্যুর পর পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশীসহ অনেক পর্যটক তাদের কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ ভ্রমণ স্থগিত করে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এ দিকে আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে বলা হয়, কলকাতা নিউমার্কেট এলাকায় অভিযান চালিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগে ও ঝুঁকিপূর্ণ ১১টি হোটেল বন্ধ করে দিয়েছে নগর পৌরসভা ও দমকল বিভাগ। বন্ধের তালিকায় থাকা হোটেলের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে জানানো হয়।
হোটেলগুলো পরিদর্শন করে কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে বন্ধের নোটিস সেঁটে দিয়েছেন। অবিলম্বে হোটেল খালি করতে বলা হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। কিছু হোটেলে থাকা আবাসিকদেরও বের করে দেয়া হয়েছে। বন্ধ করা হোটেলগুলো আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুরোপুরি খালি করার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন।
গতকাল ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়, গত মঙ্গলবার গভীর রাতে কলকাতা নিউমার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি ভবনে অবস্থিত ‘শিখা ইন’ হোটেলে আগুনে ৯ জনের মৃত্যুর পর কিছু বিদেশী পর্যটক তাদের সফর সংক্ষিপ্ত করতে বাধ্য হয়েছেন। সীমান্তের ওপার থেকে অনেক পর্যটক কলকাতায় তাদের আসার পরিকল্পনাও স্থগিত করেছেন।
মারকুইস স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট ও নিউমার্কেট এলাকার স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্ট এবং হোটেল অ্যাসোসিয়েশন নিশ্চিত করেছে যে, বেশ কিছু পর্যটক সময়ের আগেই কলকাতা ছেড়ে যাচ্ছেন। শহরে আসার কথা থাকা অনেক পর্যটক তাদের ভ্রমণ পিছিয়ে দিয়েছেন।
কলকাতায় নানা কাজে ও ঘুরতে যাওয়া বাংলাদেশীদের সস্তায় থাকার জায়গা হিসেবে নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিট, মারকুইজ স্ট্রিট পরিচিত। ফলে এসব এলাকায় নামে বেনামে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়, মঙ্গলবার রাতে আগুনের ঘটনাটি সীমান্তের ওপারে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশে থাকা আতঙ্কিত স্বজনরা বর্তমানে কলকাতায় অবস্থানরত তাদের পরিবারের সদস্যদের দ্রুত সফর শেষ করে দেশে ফেরার তাগিদ দিচ্ছেন।
আগুনে হতাহতের ঘটনা ঘটা ‘শিখা ইন’ হোটেল যে ভবনটিতে ছিল, সেখানেই আরেকটি হোটেলে মঙ্গলবার উঠেছিলেন বাংলাদেশী নাগরিক পাবনার বাসিন্দা খুরশীদ আলম। তিনি বলেন, “আগুন লাগা এবং বাংলাদেশীদের মৃত্যুর খবর দেখার পর আমার স্ত্রী ও বাবা-মা আমাকে ফোন করে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসতে বলছে। আমি এখানে ব্যবসায়িক কাজে এসেছি। শুক্রবার বিকালের মধ্যে কাজ শেষ করে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছি। তবে শিগগিরই আবার ফিরব।”
হোটেল শিখা ইনে আগুনের ঘটনার পর কলকাতা পুলিশ মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই ভবনের মালিক বীরেশ্বর মিত্রকে খুঁজে বের করতে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করেছে। অন্য দিকে কলকাতা পৌরসভা শহরজুড়ে আবাসিক হোটেলগুলোর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা পরীক্ষা করার জন্য গঠন করেছে পাঁচ সদস্যের কমিটি।
আনন্দবাজারের খবরে বলা হয়, শুক্রবার পৌরসভা, দমকল ও পুলিশের যৌথ অভিযানে সকাল থেকেই নিউ মার্কেট এলাকায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়। বৃহস্পতিবারই এসব হোটেলের মালিকদের কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়। তার সন্তোষজনক জবাব না মেলায়, শুক্রবারের অভিযান। বন্ধ করে দেয়া হোটেলের তালিকায় ২৩ নম্বর মারকুইজ স্ট্রিটের সাতটি এবং ২৫ নম্বর মারকুইজ স্ট্রিটের তিনটি হোটেল রয়েছে।
বন্ধ করে দেয়া একটি হোটেলের একজন কর্মী বলেন, ‘আমাদের এখানে নোটিস লাগিয়ে দিয়ে গিয়েছে। বলেছে খালি করতে হবে। আমাদের অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র আছে; তবে ফায়ার অ্যালার্ম নেই। আগুনের আর কোনো ব্যবস্থা নেই। আমাদের ফায়ার লাইসেন্স রয়েছে। ২০২৪ সালের পর আর তা রিনিউ করা হয়নি। এখন এখানে পাঁচ-ছয় জন আবাসিক রয়েছেন। খালি করে দেবো।’
আনন্দবাজার বলছে, ১১টি হোটেল বন্ধের পর নতুন করে নিউ মার্কেট এলাকার ১৭টি হোটেলে শুক্রবার কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়েছে। তাদেরও উত্তর দিতে ২৪ ঘণ্টা সময় দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সন্তোষজনক উত্তর না পেলে ওই হোটেলেও ব্যবসা বন্ধের নোটিস সাঁটা হবে।
স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্টরা বলছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দেশে ফেরার টিকিটের জন্য বহু পর্যটক তাদের সাথে যোগাযোগ করছেন। গোপাল মান্না নামে এক ট্রাভেল এজেন্ট বলেন, ‘আগুনের ঘটনাটি অনেক পর্যটককে আতঙ্কিত করেছে। তারা এখন এলাকা ছেড়ে বাড়ি ফিরতে চায়। তারা আমাদের তাদের ফেরার টিকিট প্রসেস করার অনুরোধ করেছে।’
সংবাদমাধ্যমটি বলছে, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা সতর্ক করেছেন যে, আতঙ্কিত পর্যটকদের এই আকস্মিক চলে যাওয়া কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত নিউ মার্কেট এলাকার অর্থনৈতিক ঘুরে দাঁড়ানোকে আবার বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কারণ করোনা মহামারি এবং ভারতের সাথে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ভিসা বন্ধ থাকায় গত চার বছর এ এলাকায় মারাত্মক ব্যবসায়িক মন্দা তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় ব্যবসায় স্থবিরতার পর গত জুলাইতে ভারত বাংলাদেশীদের ভ্রমণ ভিসা দেয়া শুরু করলে কলকাতার এ বাণিজ্যিক অঞ্চলটির ব্যবসা পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল।



