ব্যাংকিং খাতে তারল্য সঙ্কোচন নীতি আরো দৃশ্যমান

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক অপারেশন বিশ্লেষণ

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তারল্য ব্যবস্থাপনা অপারেশনগুলো স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, ২০২৬ সালের নির্বাচন ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রাক্কালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না। মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রা বাজার ও ব্যাংকিং শৃঙ্খলা-এ তিনটি সূচককে নিয়ন্ত্রণে রাখতেই তারল্য শোষণ নীতি আরো দৃঢ়ভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে আগামী মাসগুলোতে ঋণের সুদহার, বিনিয়োগ গতি এবং ব্যাংকগুলোর লাভজনকতা- সবকিছুর ওপরই এর সুস্পষ্ট প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক গত ২৩ ডিসেম্বর জানায়, ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন তারল্য ব্যবস্থাপনা টুলস- ইসলামিক ব্যাংকস লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি (আইবিএলএফ), অ্যাশিউরড রেপো (এআর) এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ)-এর মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে মোট ৯৫১.৪৬ কোটি টাকা নিট তারল্য শোষণ (ঘবঃ খরয়ঁরফরঃু অনংড়ৎঢ়ঃরড়হ) করা হয়েছে। এ তথ্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বর্তমানে একটি কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে।

১. নীতিগত প্রেক্ষাপট : কেন তারল্য শোষণ : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত ঋণ প্রবাহ সীমিতকরণ এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ জুড়েই তারল্য সঙ্কোচনমূলক অবস্থান গ্রহণ করেছে। সাম্প্রতিক এ অপারেশনগুলো সে নীতিরই ধারাবাহিক প্রতিফলন।

২. ২. আইবিএলএফ : ইসলামি ব্যাংক খাতে সীমিত সাপোর্ট : আই বিএলএফ-এর আওতায় ১৪ দিনের কোনো লেনদেন হয়নি। ২৮ দিনে ৩০০ কোটি টাকা অফার ও গ্রহণ করা হলেও, ম্যাচুরিটি অ্যামাউন্ট হিসেবে ৫০২.০১ কোটি টাকা পরিশোধ হওয়ায় নিটভাবে ২০২.০১ কোটি টাকা শোষণ হয়েছে। এটি বোঝায়- ইসলামি ব্যাংকগুলোর তারল্য চাহিদা সীমিত অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইচ্ছাকৃতভাবে এ খাতে সাপোর্ট কমিয়ে রাখছে।

৩. ৩. এসিউর্ড রেপো ( এআর) : স্বল্পমেয়াদি সহায়তা, কিন্তু নিট শোষণ : এআর- এর ক্ষেত্রে চিত্রটি দ্বিমুখী : ৭ দিনের ও ১৮০ দিনের রেপোতে কোনো নতুন অর্থ দেয়া হয়নি, বরং পূর্বের ম্যাচুরিটি বাবদ যথাক্রমে ৬১৬.০২ কোটি ও ১১.৩৫ কোটি টাকা শোষিত হয়েছে। এর বিপরীতে, ১৪ দিনের এআর- এ ৬১৪.৮৪ কোটি টাকা ইনজেক্ট করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এআর থেকে নিট ৩৮৪.৮০ কোটি টাকা শোষণ হয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে- ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি তারল্য চাপে আছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদি তারল্য ঢুকতে দিচ্ছে না।

৪. ৪. এসডিএফ : সবচেয়ে বড় তারল্য শোষণ হাতিয়ার : স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) এ অপারেশনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এক দিনের জন্য ব্যাংকগুলো ২,১০৯ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রেখেছে, এর বিপরীতে ম্যাচুরিটি হয়েছে ১,৫৪২.৩৪ কোটি টাকা।

৫. এর ফলে এসডিএফ একাই ৫৬৬.৬৬ কোটি টাকা নিট তারল্য শোষণ করেছে। ৮ শতাংশ হারে সুদ দিয়ে ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে আটকে রাখার এই কৌশলটি স্পষ্টতই বাজার থেকে টাকা তুলে নেয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে।

৬. ৫. সুদের হার সঙ্কেত : বাজারকে দেয়া বার্তা : এআর-এ ১০ শতাংশ হার এবং এসডিএফ-এ ৮ শতাংশ হার বাজারকে একটি পরিষ্কার বার্তা দেয়- টাকা এখন দামি এবং অতিরিক্ত ঋণ সম্প্রসারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাম্য নয়। এটি বিনিয়োগ ও ভোক্তা ঋণ উভয় ক্ষেত্রেই সংযম আরোপ করতে পারে।

৭. সামগ্রিক মূল্যায়ন অনুসারে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের এ অপারেশন থেকে কয়েকটি স্পষ্ট সিদ্ধান্ত টানা যায়- ১.ব্যাংকিং ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত তারল্য এখনো বিদ্যমান; ২. কেন্দ্রীয় ব্যাংক সে উদ্বৃত্ত তারল্য সক্রিয়ভাবে শোষণ করছে; ৩. মুদ্রাস্ফীতি ও বিনিময় হার স্থিতিশীলতাই এখন নীতিগত অগ্রাধিকার এবং ৪. স্বল্পমেয়াদি সাপোর্ট থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি তারল্য প্রবাহে কড়াকড়ি বজায় আছে।