নীতি, গ্যাস ও লাইসেন্সের জটে শিল্প অর্থনীতি

সংস্কার, সিঙ্গেল উইন্ডো ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি জামায়াতের

দলীয় নির্বাচনী ইশতেহার

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের অর্থনীতির গল্প সাধারণত আশাবাদের- রেমিট্যান্স বাড়ছে, রফতানি বাড়ছে, অবকাঠামো হচ্ছে, মেগা প্রকল্প হচ্ছে। কিন্তু এই বাহ্যিক অগ্রগতির আড়ালে শিল্প ও ব্যবসা খাতের ভেতরে জমছে এক গভীর অস্বস্তি। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন- এখন আর সম্প্রসারণ নয়, কারখানা টিকিয়ে রাখাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। গ্যাস নেই, লাইসেন্সের জট, ব্যাংক ঋণ সঙ্কট, আমলাতান্ত্রিক হয়রানি, নীতি অস্থিরতা- সব মিলিয়ে ব্যবসার পরিবেশ ক্রমেই অনিশ্চিত।

সম্প্রতি শিল্প ও ব্যবসায়ী নেতাদের নিয়ে জামায়াত আয়োজিত সম্মেলনে একাধিক ব্যবসায়ী নেতার বক্তব্যে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা শুধু অসন্তোষ নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নীতি ব্যর্থতার একটি কাঠামোগত দলিল। আর সেই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কে কী সমাধান দিচ্ছে- তা নিয়েও শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে- ক্ষমতায় গেলে ‘ব্যবসাবান্ধব, দুর্নীতিমুক্ত ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি’ গড়াই হবে তাদের অগ্রাধিকার।

শিল্পের বাস্তবতা : মেড নয় অ্যাসেম্বলড ইন বাংলাদেশ?

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী (পারভেজ) এই বৈঠকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন- ‘আমরা মোটরবাইক তৈরি করি না, শুধু জোড়া লাগাই। ৯৫ শতাংশ পার্টস আমদানি। এটা শিল্প না, অ্যাসেম্বলি।’

এই বক্তব্যে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতির মূল দুর্বলতা। আজো অধিকাংশ খাত- কাঁচামাল আমদানিনির্ভর, প্রযুক্তি বিদেশী, ভ্যালু অ্যাডিশন কম, স্থানীয় গবেষণা নেই। ফলে ডলার খরচ হচ্ছে, কিন্তু কর্মসংস্থান বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ছে না।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি ‘লো-ভ্যালু ট্র্যাপ’- যেখানে দেশ কেবল শ্রম দেয়, আসল লাভ চলে যায় বিদেশে।

ফার্মাসিউটিক্যাল খাত : সাফল্যের মাঝেও লাইসেন্সের ফাঁদ

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু সেই খাতই সবচেয়ে বেশি প্রশাসনিক হয়রানির শিকার।

শিল্প নেতাদের ভাষ্য- ৪৭টি লাইসেন্স, নিয়মিত রিনিউ, একাধিক মন্ত্রণালয়, কোনো সিঙ্গেল উইন্ডো নেই। ফলে উদ্যোক্তাদের সময় ও অর্থ- দুটোই নষ্ট হচ্ছে। এক উদ্যোক্তার ভাষায় : ‘আমরা ওষুধ বানাই নাকি লাইসেন্স নবায়ন করি- বোঝা মুশকিল।’

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ- এই জটিল কাঠামো দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে।

জ্বালানি সঙ্কট : শিল্পের শ্বাসরোধ

সবচেয়ে ভয়াবহ সঙ্কট গ্যাস ও বিদ্যুৎ। হাজার হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান নতুন গ্যাসসংযোগের আবেদন করে অপেক্ষায়। অনেকে বিকল্প হিসেবে : জেনারেটর, এলপিজি, সোলার, ক্যাপটিভ পাওয়ার ব্যবহার করছে।

ফলে উৎপাদন খরচ ২০-৩০% পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। এক শিল্পপতি বলেন- ‘বিদেশী বিনিয়োগকারী প্রথমেই জিজ্ঞেস করে- গ্যাস আছে? আমরা উত্তর দিতে পারি না।’

এটি শুধু ব্যবসার সমস্যা নয়- জাতীয় প্রতিযোগিতার প্রশ্ন।

ব্যাংক ঋণেও চাপ : শিল্প মালিকদের অভিযোগ- সরকার নিজেই ব্যাংক ঋণের বড় অংশ নিয়ে নিচ্ছে। ফলে বেসরকারি খাত ঋণ পাচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে- এটি ‘ক্রাউডিং আউট এফেক্ট’। এর ফলাফল : বিনিয়োগ কমে যায়, নতুন শিল্প স্থাপিত হয় না, কর্মসংস্থান থেমে যায়, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ।

ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়ায় রয়েছে- নগদ প্রণোদনা, দ্রুত লাইসেন্স, জমি ও ইউটিলিটি সহায়তা দিচ্ছে তারা। বাংলাদেশে তার উল্টো- জটিলতা, বিলম্ব, অনিশ্চয়তা। এর ফলে বিনিয়োগ সরে যাচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামীর প্রতিশ্রুতি : ব্যবসায়ী মহলের এই হতাশার পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াতে ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

দলটির শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা বলছেন- ‘শিল্পবিরোধী আমলাতন্ত্র ভেঙে উৎপাদনবান্ধব রাষ্ট্র গড়া হবে।’

তাদের প্রস্তাবগুলো হলো : ১. সিঙ্গেল উইন্ডো লাইসেন্স; এক প্ল্যাটফর্মে সব অনুমোদন; ৩০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত। ২. গ্যাস-বিদ্যুৎ অগ্রাধিকার শিল্পে, শিল্প জোনে এর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ; আলাদা ট্যারিফ এবং এলএনজি আমদানিতে স্বচ্ছতা। ৩. দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন; ঘুষবিরোধী কঠোর ব্যবস্থা; ডিজিটাল প্রসেস এবং কর্মকর্তাদের জবাবদিহি। ৪. প্রাইভেট সেক্টরবান্ধব ব্যাংকিং; শিল্প ঋণে সুদ কমানো; এসএমই সহায়তা; রপ্তানিতে বিশেষ ক্রেডিট। ৫. খাতভিত্তিক রূপান্তর; লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং; ফার্মা; আইটি; কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প; ব্লু ইকোনমি ৬. স্কিল ডেভেলপমেন্ট; কারিগরি শিক্ষা ও টেকনিক্যাল ট্রেনিং।

জামায়াতের আমির বলেন- ‘ব্যবসায়ীকে সন্দেহ নয়, অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। সরকার-ব্যবসা সম্পর্ক হবে সহযোগিতার।’

জামায়াতের অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি : মূল বিন্যাস ও প্রভাব

বাংলাদেশ জাতীয় রাজনীতিতে জামায়াত স্বাভাবিকভাবেই অর্থনীতি ও শিল্প খাতকে কেন্দ্র করে একটি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সম্প্রতি তাদের ঘোষিত নীতিমালায় উল্লেখযোগ্যভাবে সাতটি প্রধান প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে, যা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, কৃষি ও শ্রমিক সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রথমত, জামায়াত জানিয়েছে যে তারা দেশের সর্বস্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবে। এই প্রতিশ্রুতির মূল লক্ষ্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক লেনদেনে জালিয়াতি ও অনিয়ম কমানো। বিশ্লেষকরা মনে করেন, যদি বাস্তবায়ন হয়, তবে এটি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, করনীতি সংস্কারে তারা উল্লেখ করেছে যে ট্যাক্স ও ভ্যাট বর্তমান হার থেকে ধীরে ধীরে কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ট্যাক্স ১৯ শতাংশ এবং ভ্যাট ১০ শতাংশে স্থির করা হবে। এটি দেশকে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশে পরিণত করতে সাহায্য করবে এবং বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে পুঁজিসঞ্চয়ের সুযোগ বাড়াবে।

তৃতীয় প্রতিশ্রুতিতে জামায়াত বলেছে, আগামী তিন বছরের মধ্যে সব শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ বৃদ্ধি করা হবে না। এটি মূলত শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করার একটি পদক্ষেপ।

চতুর্থত, বন্ধ কলকারখানাগুলো পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে পুনরায় চালু করা হবে এবং ১০% মালিকানা শ্রমিকদের দেয়া হবে। এই পদক্ষেপ শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

পঞ্চমত, ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রণয়ন এবং সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। এর ফলে নতুন উদ্যোক্তারা সহজে ব্যবসা শুরু করতে পারবে এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমে যাবে।

শেষে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণ সুবিধা প্রদানের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। এটি কৃষি খাতের উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মোটকথা, জামায়াতের এই প্রতিশ্রুতিগুলো মূলত অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি ও শ্রমিক সম্প্রদায়ের জন্য ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টির লক্ষ্য রাখছে। তবে এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দক্ষতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই নীতিমালাগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উন্নয়ন প্রক্রিয়া দ্রুততর হতে পারে, তবে তা সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে কার্যকর করা গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবতা বনাম প্রতিশ্রুতি : কতটা সম্ভব?

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সহজ নয়। কারণ : দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতি, দুর্নীতির শেকড়, জ্বালানি অবকাঠামোর ঘাটতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরীক্ষা। তবে ইতিবাচক দিক হলো- ব্যবসাবান্ধব সংস্কারের দাবি এখন রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে।

শিল্পোন্নয়ন না হলে কী ঝুঁকি?

বাংলাদেশ শিগগিরই এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে। তখন শুল্ক সুবিধা কমে যাবে। যদি : শিল্পে বৈচিত্র্য না আসে, উৎপাদনশীলতা না বাড়ে, ব্যয় কমানো না যায়, তাহলে রফতানি ধাক্কা খাবে। এর ফলে : বেকারত্ব বাড়বে, রিজার্ভ কমবে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। অর্থাৎ বর্তমান সঙ্কট কেবল শিল্পের নয়- জাতীয় অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে।

মোড় পরিবর্তনের সময় : ব্যবসায়ীরা এখন আর ভর্তুকি চান না- চান স্বাভাবিক পরিবেশ। তারা চান- সহজ লাইসেন্স, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, কম সুদে ঋণ, স্বচ্ছ প্রশাসন, এগুলো মৌলিক শর্ত।

জামায়াতে ইসলামীর প্রতিশ্রুতি এই দাবিগুলোর সাথে মিল আছে। কিন্তু বাস্তবায়নই হবে আসল পরীক্ষা।

বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে- লাইসেন্সনির্ভর নিয়ন্ত্রণ অর্থনীতি থাকবে, নাকি উৎপাদনভিত্তিক শিল্প রাষ্ট্রে রূপান্তর হবে- সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই। কারণ ব্যবসায়ীদের ভাষায়- ‘বিনিয়োগের স্বপ্ন পরে। আগে বাঁচতে চাই।’