ঈদ ও ফিতর দু’টি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত- ঈদুল ফিতর। শব্দদ্বয় আরবি। ঈদের আভিধানিক অর্থ- যেকোনো বিষয় বারবার বা বারবার ফিরে আসা, সংঘটিত হওয়া, পালিত হওয়া। যেমন- রোগ, ব্যথা, বেদনা, দুশ্চিন্তা, আনন্দ, স্মৃতি ও নিয়মতান্ত্রিক, ধারাবাহিক এবং অভ্যাসগত যাবতীয় বিষয়াদি; যেমন- খাবার গ্রহণ, নিদ্রা যাপন, ইবাদত পালন, বিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহণ, কর্মক্ষেত্রে গমন ইত্যাদি। আর ফিতরের অনেকগুলো আভিধানিক অর্থ আছে। তন্মধ্যে আমাদের বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট অর্থ হচ্ছে- ভাঙন, বিদারণ, ফাটল, চিড় ইত্যাদি। ঈদুল ফিতরের পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে- আল্লাহ তায়ালার আদেশক্রমে রমজানের রোজা পালন করার পর শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে রোজা ভাঙার মাধ্যমে-আনন্দ উদযাপন করা। শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থের মাঝে মিল ও সামঞ্জস্য হচ্ছে- মুসলিমদের জীবনে প্রতি বছর এ আনন্দের দিন, মুহূর্ত, উপলক্ষ ও সুযোগটি বারবার ঘুরে আসে, তাই এর নামকরণ করা হয়েছে ঈদ।
ঈদের সূচনা : মহানবী সা: মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করে এসে দেখলেন, মদিনাবাসী তাদের পূর্বপুরুষদের শেখানো দু’টি বার্ষিক উৎসবের আয়োজন করে থাকে। একটি হলো নওরোজ, আরেকটি হলো মেহেরজান। উভয় অনুষ্ঠানেই যুবক-যুবতীরা আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে, নাচগান করে, বেহায়ার মতো অশ্লীল আচরণ করে। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে গোত্রে গোত্রে সঙ্ঘাত হয়, রক্তপাত হয়। উট ছেড়ে দেয়া হয়, যে গোত্রের লোকেরা উটকে ধরতে পারে তারা সেটিকে জবাই করে গোশত খায়, অন্যরা কিছুই পায় না। এ যেন জোর যার মুল্লুুক তার অবস্থা। মহানবী সা: এমন উৎসব দেখে ব্যথিত হন। তিনি মদিনাবাসীকে ডেকে বলেন, ‘এর চেয়েও উত্তম ও পবিত্র দু’টি উৎসবের সন্ধান আমি তোমাদেরকে দিচ্ছি। সবাই তাঁর কথায় রাজি হলেন। রাসূলুল্লাহ সা: এ দু’টি ঈদ হলো- ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এ প্রসঙ্গে আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমদে হজরত আনাস রা: থেকে একটি হাদিসে রয়েছে- রাসূল সা: হিজরত করে মদিনায় এসে দেখলেন- মদিনাবাসী দু’টি জাতীয় উৎসব পালন করে। এ উৎসব উপলক্ষে পূর্ব প্রথানুযায়ী খেল-তামাশা ও বিভিন্ন আনন্দ উৎসবের আয়োজন করে। রাসূলুল্লাহ সা: তাদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এই যে দু’টো জাতীয় অনুষ্ঠান পালন করো এর উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য কী? জবাবে তারা বলল, ইসলামের আগে জাহেলি যুগে আমরা এসব উৎসব এ ধরনের হাসি-তামাশা ও আনন্দ করেই উদযাপন করতাম। এখনো সেটিই চলে আসছে। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য এ দু’টি উৎসবের পরিবর্তে এ থেকে উত্তম দু’টি উৎসব- ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা দান করেছেন। অতএব, আগের উৎসবের পরিবর্তে এই দু’টি ঈদের নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানাদি পালন করতে শুরু করো।’ এভাবে দ্বিতীয় হিজরিতে প্রথম ঈদুল ফিতর পালন শুরু হয়। ফিতরা প্রদানের প্রচলনও শুরু হয় এখান থেকেই। এই যে শুরু হলো ঈদ-সংস্কৃতি তার অন্তর্নিহিত অর্থ আসলে কী? আগেই বলেছি, এ সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত দু’টি দিক আছে। একটি হলো বিশ্বাসগত, আরেকটি হলো বাহ্যিক দিক। এই বিশ্বাসের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহ প্রদত্ত বিধান মহাগ্রন্থ আল কুরআন এবং মহানবী সা:-এর মুখ নিঃসৃত বাণী- হাদিস। আগেই বলেছি, আমাদের আলোচিত ঈদুল ফিতর হলো মুসলমানদের সংস্কৃতি। সে মতে ঈদুল ফিতরের এই সংস্কৃতির ভিত্তি হলো আল কুরআন নির্দেশিত পন্থা ও রাসূল সা: প্রদর্শিত পদ্ধতি।
এ দিনের আনন্দের উদ্দেশ্য : একজন খাঁটি মুমিন দীর্ঘ একটি মাস পরম তৃপ্তিসহকারে রমজান কাটানোর পর ঈদের দিনে তার রবের পক্ষ থেকে রহমত (করুণা), মাগফিরাত (ক্ষমা), নাজাত (নিষ্কৃতি) ও জান্নাত (বেহেশত) লাভ করার ঘোষণা শুনার পরও তার হৃদয়ে রমজানকে হারানোর বেদনা অনুভব করে! যেহেতু খাঁটি ঈমান, আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও নিষ্ঠার সাথে তাঁর ইবাদত করার মধ্যে যে তৃপ্তি, মজা ও আনন্দ আছে তার সাথে বৈষয়িক ও পার্থিব জগতের কোনো কিছুর তুলনাই করা যায় না। বিশেষ করে রমজানের ইবাদতের তৃপ্তি, মজা, স্বাদ ও আমেজই ভিন্ন। তাই মুমিন ব্যক্তি ঈদের দিনেও চলে যাওয়া রমজানের দিনগুলোর প্রতি। হৃদয়ে টান ও আকর্ষণ অনুভব করে। সাথে সাথে নিজ রবের পক্ষ থেকে আয়োজিত সম্মাননা ও পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান (ঈদ) এ প্রাপ্ত রবের ক্ষমা, সন্তোষ, জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত লাভের ঘোষণা তাকে করে তোলে পরমভাবে শিহরিত, আনন্দিত, পুলকিত ও অভিভূত।
ঈদ কাদের জন্য : ঈদের আনন্দ নেককারদের জন্য। মহানবী সা: বলেন, ‘ঈদুন লিল আবরার ওয়াঈদুন লিল ফুজ্জার’ অর্থাৎ- নেককারদের জন্য হলো। আর পাপিদের জন্য হলো হুমকি।
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
১. ‘তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা ও সেই জান্নাত লাভের জন্য প্রতিযোগিতা করো, যার প্রস্থ আসমান ও জমিনের ব্যবধানসম। যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা:-এর ওপর ঈমান এনেছে তাদের জন্য তা প্রস্তুত করা হয়েছে।’ (সূরা আল হাদিদ-২১)
২. ‘তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে দৌড়ে এসো, যা আসমান ও জমিনের মতো বিশাল, যা আল্লাহভীরুদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। যারা সচ্ছলতা ও অভাবের মধ্যে (আল্লাহর রাস্তায়) ব্যয় করে, ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষদের ক্ষমা করে। আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। আর যারা কখনো কোনো অশ্লীল কাজ করে অথবা নিজেদের ওপর জুলুম করে বসে তখন সাথে সাথে আল্লাহকে স্মরণ করে অপরাধগুলোর জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে, কেননা আল্লাহ ছাড়া আর কে আছে, যে অপরাধগুলো ক্ষমা করতে পারে? আর তারা যা করেছে, তার ওপর জেনেশুনে অটল থাকে না। তাদের পুরস্কার হবে তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং এমন উদ্যানগুলো, যেগুলোর তলদেশ দিয়ে ঝরনাধারা বইতে থাকবে। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। নেক আমলকারীদের জন্য কতই না উত্তম পুরস্কার রয়েছে!’ (সূরা আলে ইমরান : ১৩৩-১৩৬)
৩. ‘নিঃসন্দেহে যারা তাদের রবের ভয়ে সন্ত্রস্ত, যারা তাদের রবের নিদর্শনাবলিতে ঈমান আনে, যারা তাদের রবের সাথে শরিক করে না এবং যারা (রবের প্রতি) ভীত-প্রকম্পিত হয়ে তাদের যা দান করবার তা দান করে, যেহেতু তারা তাদের রবের কাছে ফিরে যাবে। এরাই সব কল্যাণকর কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে এবং এরাই সব কল্যাণকর কাজের প্রতি অগ্রগামী ও প্রতিযোগী।’ (সূরা আল মুমিনুন : ৫৭-৬১)
৪. ‘রমজান মাস, যার মধ্যে বিশ্বমানবের জন্য পথপ্রদর্শক, হিদায়াতের উজ্জ্বল নিদর্শন ও (হক ও বাতিলের মাঝে) প্রভেদকারী কুরআন নাজিল করা হয়েছে। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে, সে যেন রোজা রাখে।’ (সূরা আল বাকারা-১৮৫)
৫. আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, নবী সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পূর্ণ ঈমানসহকারে ও সাওয়াবের প্রত্যাশায় রমজানের রোজা রাখে তার আগের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হয় এবং যে ব্যক্তি পূর্ণ ঈমানসহকারে ও সাওয়াবের আশায় কদরের রাতে নামাজ পড়ে তার আগের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।’ (বুখারি-২০১৪, মুসলিম-৭৬০)
এই অশান্ত পৃথিবীতে ঈদের আনন্দ বিষাদ ও দুঃখ-কষ্ট ছাড়া কিছুই নয়। যুদ্ধ-বিগ্রহ, অন্যায়-অবিচার, হানাহানি-মারামারি, জুলুম-নির্যাতন, সুদ-ঘুষ, চাঁদাবাজি, মস্তানি ও ইসলামী কালচার বহির্ভূত কার্যকলাপে যখন পৃথিবী ভরপুর, তখন ঈদের আনন্দ ভোগ করা কষ্টকর।
ঈদের দিনের কাজ : ১. সহিহ বুখারি ও মুসলিম- উভয় গ্রন্থে হজরত আবু সাঈদ খুদরি রা: থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে আছে- রাসূলুল্লাহ সা: ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন বের হয়ে সর্বপ্রথম ঈদের সালাত আদায় করতেন। সালাত ও সালাম শেষে লোকদের দিকে ফিরে তিনি খুতবা দেয়ার উদ্দেশে দাঁড়াতেন। তখন লোকেরা যথারীতি নিজ নিজ কাতারে বসে থাকত। এ সময় রাসূলুল্লাহ সা: লোকদের উদ্দেশে ওয়াজ ও নসিহত করতেন। শরিয়তের আদেশ-নিষেধ শুনাতেন। তখন কোনো নির্দেশ জারি করার প্রয়োজন থাকলে তিনি এ সময় তাও করতেন। এরপর তিনি ঈদগাহ থেকে প্রত্যাবর্তন করতেন। মুসলিম শরিফের অপর এক রেওয়ায়েতে আছে- তিনি আরো বলতেন, সাদকা করো, সাদকা করো। তখন বেশির ভাগ মহিলাই সাদকা করতেন ।
২. আবালবৃদ্ধবনিতা সবাইকে ঈদগাহে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মহানবী সা:। তিরমিজি শরিফের এক হাদিসে হজরত উম্মে আতিয়া রা: থেকে বর্ণিত আছে- রাসূলে করিম সা: দুই ঈদের ময়দানে নাবালিকা, পূর্ণবয়স্কা, সাংসারিক ও হায়েজসম্পন্না মহিলাদেরও হাজির করতেন। তবে হায়েজসম্পন্না মহিলারা নামাজ থেকে দূরে সরে থাকতেন। একজন মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, মহিলাদের বাইরে যাওয়ার জন্য যে হিজাবের (মুখাবরণ) প্রয়োজন হয় তা যদি কারো না থাকে তখন কী করা যাবে হে রাসূল সা:? জবাবে তিনি বললেন, কারো তা না থাকলে তার অপর এক বোন যেন তাকে নিজের হিজাব ধারস্বরূপ দেয়।
৩. ইবনে মাজাহতে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূল সা: ঈদের নামাজের জন্য উন্মুক্ত ময়দানে হেঁটে যেতেন এবং হেঁটেই বাড়ি ফিরে যেতেন।
৪. হজরত জাবির রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, নবী সা: ঈদের দিনে ময়দানে যাতায়াতের পথ পরিবর্তন করতেন। (অর্থাৎ- এক পথ দিয়ে ঈদগাহে যেতেন এবং আরেক পথ দিয়ে ফিরে আসতেন)
৫. ক. ইমাম জহুরি বলেছেন, নবী করিম সা: ঈদুল ফিতরের দিন ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় থেকে নামাজের স্থানে পৌঁছা পর্যন্ত তাকবির বলতেন।
খ. হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা তোমাদের ঈদগুলোকে তাকবির বলার সাহায্যে উৎসবমুখর করো।’
ঈদ রোজার প্রতিদান দিবস : ঈদ হলো রোজার প্রতিদান দিবস। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পূর্ণ ঈমানসহকারে ও সাওয়াবের আশায় রমজান মাসে রাতে (তারাবিহ ও তাহাজ্জুদ) নামাজ পড়ে তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়।’ (বুখারি-২০০৯, মুসলিম-৭৬০)
* আবু সাঈদ খুদরি রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে একটি রোজা রাখে, তার এই দিনের বদৌলতে আল্লাহ তাকে (জাহান্নামের) আগুন থেকে ৭০ বছরের দূরত্বে সরিয়ে নেন।’ (বুখারি-২৮৪০, মুসলিম-১১৫৩, তিরমিজি-১৬২৩, ইবনে মাজাহ-১৭১৭)
* আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন কোনো দিন রোজা রাখে সে যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং গোলমাল ও ঝগড়াঝাটি না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা কেউ তার সাথে ঝগড়াঝাটি করে তাহলে সে যেন বলে, আমি রোজাদার ব্যক্তি।’ (বুখারি-১৯০৪, মুসলিম-১১৫১)
* আবু হুরায়রাহ রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি (রোজা রাখার পরও) মিথ্যা কথা ও মিথ্যাচার বর্জন করেনি, তার পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (বুখারি-১৯০৩, তিরমিজি-৭০৭, আবু দাউদ-২৩৬২, ইবনে মাজাহ-১৬৮৯)
লেখক : প্রধান ফকিহ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী।


