সরকার-বিরোধী দল উত্তেজনা বাড়ছে

সঙ্কটের দায়, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় নিয়ে দু’পক্ষ রাজপথে মুখোমুখি

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

দেশের রাজনীতিতে ফের দৃশ্যমান হচ্ছে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান। এক দিকে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলছেন, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সঙ্কট মোকাবেলার সুযোগ নিয়ে কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। অন্য দিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অভিযোগ-সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে, গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে এবং অর্থনীতি, জ্বালানি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলাতে পারছে না।

৫ সেপ্টেম্বর বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, স্বৈরাচারী আমল ও অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বিভিন্ন সমস্যা সরকার সমাধানের চেষ্টা করছে। একই সাথে তিনি সতর্ক করেন, এসব সমস্যাকে পুঁজি করে কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি জনগণের কথা বলার অধিকার ও গণতান্ত্রিক নীতি সমুন্নত রাখার কথাও বলেন।

কিন্তু বিরোধী জোটের অবস্থান একেবারেই ভিন্ন। তাদের ভাষ্য, রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ‘অস্থিতিশীলতা’ হিসেবে চিহ্নিত না করে সরকারকে জনগণের বাস্তব সমস্যার সমাধান দিতে হবে। আগস্টে ১১ দলীয় জোট সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করে গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কট, জননিরাপত্তা ও দ্রব্যমূল্যের মতো বিষয় সামনে আনে। জোটের নেতারা সরকারের ‘সাফল্যের’ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, জনজীবনের সঙ্কট বিবেচনায় সরকারকে সফল বলার সুযোগ নেই।

উত্তেজনার কেন্দ্রে ৩টি প্রশ্ন

বর্তমান সঙ্ঘাতকে শুধু সরকারবিরোধী আন্দোলন বনাম সরকারি প্রতিরোধ হিসেবে দেখলে রাজনৈতিক বাস্তবতার বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। মূলত তিনটি প্রশ্ন এখন বিরোধের কেন্দ্রে।

প্রথমত, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন। ১১ দলীয় জোটের অন্যতম প্রধান দাবি এটি। জোটের নেতারা বলছেন, গণভোটে সংবিধান-সংক্রান্ত সংস্কারের পক্ষে যে রায় এসেছে, সেটির রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ নিয়ে সংসদের ভেতরেও বিরোধী দলের সাথে সরকারের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, অর্থনীতি ও জনজীবনের সঙ্কট। জামায়াত ইতোমধ্যে সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একই সাথে বিরোধী দল বাজেটের ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতার সমালোচনা করেছে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা। ১১ দলীয় জোটের নেতারা অভিযোগ করছেন, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে দলীয় আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে এবং সরকার প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করছে। আগস্টে জামায়াত সরাসরি প্রশাসনে দলীয়করণ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় ব্যর্থতার অভিযোগ তোলে।

সংসদের ভেতর ও রাজপথে দ্বৈত চাপ

বর্তমান পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো- বিরোধী রাজনীতি কেবল সংসদের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। জামায়াত সংসদে প্রধান বিরোধী দলের অবস্থান ব্যবহার করার পাশাপাশি রাজপথেও চাপ বাড়াচ্ছে। তাদের কৌশলের মধ্যে রয়েছে সংসদীয় সমালোচনা, রাজনৈতিক কর্মসূচি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংগঠন বিস্তার এবং প্রয়োজন হলে আইনি লড়াই।

এটি সরকারের জন্য একটি জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করছে। সংসদ কার্যকর থাকলে রাজপথে বড় আন্দোলনের প্রয়োজন নেই- সরকার পক্ষের এমন যুক্তি থাকলেও বিরোধীদের বক্তব্য হলো, সংসদীয় প্রক্রিয়ার পাশাপাশি জনগণের কাছে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরাও গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ।

এ দ্বন্দ্বের সবচেয়ে বড় ঝুঁঁকি হচ্ছে, বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং সরকারের বিরুদ্ধে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগ- দু’টিকে এক করে ফেলা। বিরোধী দলের আন্দোলন যদি শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক সীমার মধ্যে থাকে, তাহলে সেটিকে অরাজকতা হিসেবে চিহ্নিত করা রাজনৈতিক পরিসর সঙ্কুুচিত করতে পারে। আবার রাজনৈতিক কর্মসূচির আড়ালে সহিংসতা, ভাঙচুর বা রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা হলে সরকার আইন প্রয়োগ করবে- এটি রাষ্ট্রের স্বাভাবিক দায়িত্ব।

অর্থাৎ, মূল পরীক্ষা হবে কোথায় বৈধ রাজনৈতিক প্রতিবাদ শেষ হচ্ছে এবং কোথায় থেকে সহিংস বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড শুরু হচ্ছে।

সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি

সরকারের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। এক দিকে অর্থনৈতিক চাপ ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি সঙ্কটের মতো বাস্তব সমস্যা দ্রুত সমাধান করতে হবে। অন্য দিকে বিরোধী দলের আন্দোলনকে এমনভাবে মোকাবেলা করতে হবে যাতে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে নতুন প্রশ্ন না ওঠে।

প্রধানমন্ত্রী নিজেই ৫ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কটে সাধারণ মানুষ ও শিল্পমালিকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ সরকার সমস্যাটির অস্তিত্ব অস্বীকার করছে না; বরং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এ স্বীকারোক্তি কত দ্রুত কার্যকর সমাধানে রূপ নেয়।

কারণ রাজনৈতিক আন্দোলনের শক্তি শুধু দলের সাংগঠনিক ক্ষমতা থেকে আসে না; জনজীবনের অসন্তোষও আন্দোলনের জ্বালানি হয়ে ওঠে। মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ-গ্যাস সঙ্কট, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা কিংবা প্রশাসনিক অনিয়ম নিয়ে মানুষের ক্ষোভ থাকলে বিরোধী দল সেটিকে রাজনৈতিক সমর্থনে রূপান্তরের সুযোগ পায়।

১১ দলীয় জোটেরও পরীক্ষা আছে

তবে পুরো রাজনৈতিক দায় সরকারের ওপর চাপিয়ে দিলেও বিরোধী জোটের চ্যালেঞ্জ কম নয়; ১১ দলীয় জোটকে প্রমাণ করতে হবে যে, তাদের আন্দোলন কেবল ক্ষমতাসীন বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলার কৌশল নয়; বরং গণতান্ত্রিক সংস্কার, অর্থনৈতিক জবাবদিহি ও জনগণের স্বার্থ রক্ষার সুস্পষ্ট কর্মসূচি।

জোটের সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে জুলাই সনদ, গণভোট, স্থানীয় নির্বাচন, জ্বালানি, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলার মতো ইস্যু গুরুত্ব পেয়েছে। এসব বিষয় জনসম্পৃক্ত হলেও আন্দোলন যদি ক্রমাগত সঙ্ঘাতনির্ভর হয়ে ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের সমর্থন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

আরেকটি বিষয় হলো জোটের অভ্যন্তরীণ সংহতি। ১১ দলীয় ঐক্যের ভবিষ্যৎ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং শরিক দলগুলোর কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ নিয়ে মতপার্থক্যের খবর এসেছে। ফলে সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্যকে দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনে রূপ দিতে হলে জোটকে নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও কর্মপদ্ধতি আরো সুস্পষ্ট করতে হবে।

সামনে কী হতে পারে?

৫ সেপ্টেম্বর একই দিনে সরকার ও ১১ দলীয় জোটের কর্মসূচি ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরো স্পষ্ট হয়েছে। এক দিকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি, অন্য দিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের রাজপথের কর্মসূচি-দুই শিবিরের শক্তি প্রদর্শন বাংলাদেশের রাজনীতিকে আবারও সঙ্ঘাতের সম্ভাবনার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

তবে এখনই এটিকে সরকার পতনের আন্দোলনের পর্যায়ে নেয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে- এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই; বরং বর্তমান পর্যায়কে বলা যায় চাপ সৃষ্টির রাজনীতি এবং পাল্টা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের পর্যায়।

সরকার যদি অর্থনীতি ও জনজীবনের সঙ্কট দ্রুত সামাল দিতে পারে, তাহলে বিরোধীদের আন্দোলনের জনভিত্তি দুর্বল হতে পারে। বিপরীতে সঙ্কট দীর্ঘায়িত হলে বিরোধী জোটের রাজনৈতিক প্রচারণা শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

একইভাবে সরকার যদি বিরোধী কর্মসূচিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার পরিবর্তে অতিরিক্ত প্রশাসনিক বা আইনগত শক্তি প্রয়োগ করে, তাহলে পরিস্থিতি উল্টো আরো উত্তপ্ত হতে পারে। আর বিরোধী পক্ষ যদি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির সীমা অতিক্রম করে সহিংসতা বা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে, তাহলে সরকারের কঠোর অবস্থানের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে।

বিরোধী জোটের কর্মসূচি গণতন্ত্র বিনষ্টের ষড়যন্ত্র মনে করছে বিএনপি

রাজপথে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের কর্মসূচিকে গণতন্ত্র বিনষ্টের ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে বিএনপি। গতকাল রোববার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বিরোধীদলের লংমার্চ সম্পর্কে এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ।

রিজভী বলেন, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধীদল শুধু সমালোচনাই করে যাচ্ছে অথচ সঙ্কট নিরসনে তাদের গঠনমূলক কোনো প্রস্তাবনা নেই। তারা সংসদে এই বিষয়ে কোনো পরামর্শ না দিয়ে বাইরে ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছে। দায়িত্বশীল বিরোধীদলের মতো জাতীয় সংসদে নিজেদের দাবি বা প্রস্তাব না তুলে তারা রাজপথ বেছে নিয়েছে যা মূলত সরকারের সার্বিক উন্নয়ন ঢাকা দেয়ারই অপচেষ্টা। দেশের রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়াসহ বিভিন্ন ইতিবাচক অর্জনগুলোকে আড়াল করার জন্য বিরোধীদল ষড়যন্ত্র করছে।

রিজভী বলেন, বিরোধীদলের লংমার্চ কর্মসূচিতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে অশ্রাব্য ও আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করছে...যা স্পষ্টত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। জনগণের সামনে যেসব শব্দ উচ্চারণ করা যায় না তা প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে। এসব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে আইনিব্যবস্থা নিলে বিরোধীদল তাকে দমন-পীড়ন বলে দাবি করে গণতন্ত্র বিনষ্টের চেষ্টা চালাচ্ছে।

রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপির পাঁচ দিনব্যাপী প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সার্বিক কর্মসূচি অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এ উপলক্ষে দলের নেতাকর্মী শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। এই সাথে আমি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলতে চাই, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রধানমন্ত্রী যে নির্দেশনা দিয়েছেন, সেটির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ব্যবহৃত সব বিলবোর্ড ও ব্যানার অবিলম্বে খুলে ফেলতে হবে।

সরকার ও বিরোধী দল কমিটমেন্ট রাখতে পারছে না

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, সরকারি দল ও বিরোধী দল জনগণকে দেয়া কমিটমেন্ট রক্ষা করতে পারছে না; ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। গণভোট বাস্তবায়ন থেকে সরকার দূরে সরে যাচ্ছে অথচ বিরোধী দল বিষয়টিকে নিয়ে কার্যকর কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছে না। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। এক দিকে সরকারকে বিরোধী দল আস্থায় রাখতে পারছে না, সরকারের অ্যাটিচিউড কো-অপারেটেভি না। এর মূল কারণ টু থার্ড মেজরিটি। সরকার ডেসপারেট হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্নটা হচ্ছে সবাই মিলে চান কী, রাষ্ট্রের মঙ্গল চাইলে গ্যাস নাই, পানি নাই, বিদ্যুৎ নাই, তেল নাই- এগুলো বলে বসে থেকে কঠোর হস্তে দমন করবেন, নাগরিক সুবিধা দেয়ার জন্যেই তো সরকার।

তো পরিস্থিতি এমন থাকলে তো হট্টগোল আরো বাড়বে এমন প্রশ্নের জবাবে আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, সিফাতকে গ্রেফতার করলেন, বাজে কথা বলেছে, গালি দিয়েছে এটা কারেক্ট; কিন্তু তেল, গ্যাস নাই, বিদ্যুতের বিল বাড়ছে তার সমাধান কী? সে ব্যাপারে সরকার নীরব। সিফাতের বিচার করেন; কিন্তু সঙ্কটের সমাধান ও জনগণের চাহিদা পূরণ তো সরকারকেই করতে হবে।

সহিংসতার সুযোগে ফ্যাসিস্ট শক্তি অন্তর্ঘাতের সুযোগ নিতে পারে এমন শঙ্কা করছেন অনেকে সেক্ষেত্রে সরকারি ও বিরোধী দলের করণীয় কী জানতে চাইলে রাজ্জাকী বলেন, ডেফিনেটলি। নির্বাচনের আগে যে সমস্ত কথা বলে আপনি পার্লামেন্টে গেছেন, সেগুলোর বাস্তবায়ন তো মানুষ দেখছে না, বিরোধী দলও তো তা জোরালোভাবে বলছে না, ছয় মাস পার হয়ে গেল, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কোনো আন্দোলন নাই, এগুলো সরকারি দল ও বিরোধী দলের কমিটমেন্ট ছিল। কোনো পক্ষই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছে না। বিরোধী দল যদি বলে টু থার্ড মেজরিটিতে সরকার বিট্রে করছে, তাহলে বিরোধী দলের উচিত ‘ফর দি সেইক অফ দি পিপল’ রাজনৈতিক অধিকার আদায় করা।

গঠনমূলক সমালোচনায় অসুবিধা নেই

বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে উত্তেজনার কিছু দেখছেন না। তিনি বলেন, পার্লামেন্ট ভাইব্রান্ট হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পার্লামেন্টের বাইরে তো লংমার্চ করছে বিরোধী দল, পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারের গুছিয়ে নিতে একটু সময় লাগবে। ১৭ বছরের জঞ্জাল তো আর ছয় মাসে দূর করা সম্ভব না। এটা বিরোধী দলকেও বুঝতে হবে। সরকারও ধৈর্য ধরে কাজ করে যাচ্ছে। বিরোধী দল ওনাদের মতো আন্দোলন করছে, করতে দেন, অসুবিধা নাই। সরকার কোনো টাসেলে যাচ্ছে না।

কিন্তু দুই পক্ষ যদি রাজপথে মুখোমুখি হয়ে পড়ে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হচ্ছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, না তা হবে না। সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে আস্থার কোনো সঙ্কট নাই। তবে বিরোধী দলের উচিত ছিল কনস্ট্রাকটিভ সমালোচনা করা। তারা তা করছে না। তাদের উচিত ছিল সরকারের ভুল ধরিয়ে দেয়া। পরামর্শ দেয়া। গঠনমূলক সমালোচনা হলে অসুবিধা নাই। সেটা না করে বিরোধী দল যেভাবে এগোচ্ছে, মনে হয় এক সময় বোধোদয় হবে।

রাজনৈতিক সঙ্কট সহিংসতায় গড়ালে তৃতীয় পক্ষ অনেক সময় সুযোগ নেয় এমন শঙ্কার প্রশ্নে তিনি বলেন, না তা হবে না। পার্লামেন্ট ভাইব্রান্ট আছে, থাকুক, অসুবিধা নাই। রাজনীতিবিদরা তো রাজনীতি করবেনই।

সংস্কার ও সঙ্কট একসাথে কিভাবে সামলাবে?

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক উত্তেজনার গভীরে আসলে একটি বড় প্রশ্ন-নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সরকার কিভাবে বিরোধী রাজনীতি, সাংবিধানিক সংস্কার ও জনজীবনের অর্থনৈতিক সঙ্কট একসাথে সামলাবে?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে সরকারের বার্তা স্পষ্ট-সঙ্কট আছে, কিন্তু সঙ্কটকে কেন্দ্র করে অরাজকতা বরদাশত করা হবে না। অন্য দিকে ১১ দলীয় জোটের বক্তব্য-সঙ্কটের সমাধান না করে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচিকে অস্থিতিশীলতা হিসেবে দেখানো যাবে না।

দুই পক্ষের এ অবস্থানের মধ্যেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পরবর্তী পরীক্ষাটি নিহিত। সরকারকে দেখাতে হবে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে রাজনৈতিক পরিসর সঙ্কুচিত না করেও রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব। বিরোধীদেরও দেখাতে হবে, সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার জন্য রাজপথের চাপ গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবেই সৃষ্টি করা যায়।

সবশেষে, রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ সম্ভবত রাজনৈতিক সংলাপ। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, অর্থনৈতিক সঙ্কট, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং আইনশৃঙ্খলা- এ চারটি বিষয়ে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য তৈরি না হলে বর্তমান উত্তেজনা আরো দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর সে উত্তেজনার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে রাজনীতিকদের নয়; সাধারণ নাগরিকদেরই।