লুটেরাদের সম্পদ অক্ষত, পথে পথে ঘুরছেন আমানতকারীরা

দেশের ব্যাংক খাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির পরও হাজার হাজার আমানতকারী এখনো নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত পেতে ব্যাংকের এক শাখা থেকে আরেক শাখায় ঘুরছেন। অন্য দিকে যেসব ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও ব্যক্তি ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত দেননি, তাদের বিপুল সম্পদের বড় অংশ এখনো অবিক্রীত অবস্থায় রয়েছে। আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একীভূত হতে যাওয়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের সঙ্কট নিরসনে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বাজেয়াপ্ত সম্পদ দ্রুত বিক্রি করে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধের উদ্যোগ নেয়া না হলে ব্যাংকিং খাতে আস্থার সঙ্কট আরো গভীর হবে।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition
  • সঙ্কট নিরসনে পৃথক আদালতের মাধ্যমে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা প্রয়োজন
  • বাজেয়াপ্ত সম্পদ দ্রুত বিক্রি করে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেয়ার দাবি বিশ্লেষকদের

দেশের ব্যাংক খাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির পরও হাজার হাজার আমানতকারী এখনো নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত পেতে ব্যাংকের এক শাখা থেকে আরেক শাখায় ঘুরছেন। অন্য দিকে যেসব ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও ব্যক্তি ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত দেননি, তাদের বিপুল সম্পদের বড় অংশ এখনো অবিক্রীত অবস্থায় রয়েছে। আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একীভূত হতে যাওয়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের সঙ্কট নিরসনে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বাজেয়াপ্ত সম্পদ দ্রুত বিক্রি করে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধের উদ্যোগ নেয়া না হলে ব্যাংকিং খাতে আস্থার সঙ্কট আরো গভীর হবে।

বর্তমানে সঙ্কটে থাকা ইসলামী ধারার কয়েকটি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে- এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। এসব ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ ঋণ গেছে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে, যাদের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের সম্পদ দ্রুত নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা; কিন্তু বিদ্যমান আইনি কাঠামো ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। ফলে এক দিকে ব্যাংকের অর্থ আটকে থাকে, অন্য দিকে আমানতকারীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।

বিশেষ আদালতের দাবি : সাবেক ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বড় ঋণ কেলেঙ্কারির মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক আদালত এবং নির্দিষ্ট বিচারক নিয়োগ করা প্রয়োজন। তারা বলছেন, প্রচলিত আদালত ব্যবস্থায় হাজার হাজার মামলা জমে থাকায় ব্যাংক-সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হচ্ছে না। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, একীভূতকরণের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের তালিকা প্রকাশ, দায়ী ব্যক্তিদের সম্পদের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রস্তুত এবং দ্রুত নিলামের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে ঋণ পরিশোধের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে। সময়সীমার মধ্যে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সম্পদ বিক্রির আইনি প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর করতে হবে।

এস আলমের সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন

ব্যাংক খাতের সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি এস আলম গ্রুপ। বিভিন্ন তদন্ত ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গ্রুপটির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিভিন্ন সংস্থার তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগও উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, আলোচিত এ ব্যবসায়ী গ্রুপটি নামে-বেনামে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা ঋণের নামে ব্যাংক থেকে বের করে নিয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, জমি, আবাসন প্রকল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ এবং অন্যান্য সম্পদের একটি বড় অংশের ওপর বিভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এসব সম্পদ বিক্রি করে আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের জন্য এখনো কোনো বড় আকারের নিলাম কার্যক্রম শুরু হয়নি। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এস আলম গ্রুপের দায়ের বিপরীতে কী পরিমাণ সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে, সে বিষয়ে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে একটি স্বচ্ছ ও হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে জনগণের আস্থা বাড়বে এবং অর্থ উদ্ধারের অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

নজরুল ইসলাম মজুমদার ও অন্যান্য গোষ্ঠী

একইভাবে সাবেক ব্যাংক উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম মজুমদারের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঋণ এবং সম্পদের বিষয়েও তদন্ত চলছে। এ ছাড়া শিকদার গ্রুপসহ আরো কয়েকটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল মামলা দায়ের করলেই হবে না; বাজেয়াপ্ত সম্পদের মূল্যায়ন, তালিকাভুক্তি এবং বিক্রির জন্য একটি কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। এই টাস্কফোর্স আদালত, বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সমন্বয়ে কাজ করতে পারে। তাদের মতে, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে নেয়া ব্যবস্থার দৃশ্যমান ফল না এলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধারণা আরো শক্তিশালী হবে যে, বড় ঋণগ্রহীতারা আইনের বাইরে থেকে যাচ্ছে, অথচ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ আমানতকারীরা।

পথে পথে আমানতকারী

সঙ্কটে থাকা ব্যাংকগুলোর অনেক গ্রাহক এখনো তাদের আমানতের পুরো অর্থ তুলতে পারছেন না। ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা, চিকিৎসা ব্যয়, সন্তানের শিক্ষা কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। রাজধানী ও বিভিন্ন জেলার ব্যাংক শাখাগুলোতে প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে অর্থ উত্তোলনের জন্য গ্রাহকদের দীর্ঘ অপেক্ষা। অনেকে অভিযোগ করছেন, নির্ধারিত সীমার বেশি অর্থ তুলতে পারছেন না। আবার অনেক ক্ষেত্রে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, যারা হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে, তাদের সম্পদ বিক্রি না করে কেন সাধারণ আমানতকারীদের কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে?

দ্রুত অর্থ উদ্ধারের রোডম্যাপ প্রয়োজন

বিশেষজ্ঞদের মতে, সঙ্কট সমাধানে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি- এসব ব্যাংকের বড় ঋণখেলাপিদের সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা প্রয়োজন। বাজেয়াপ্ত ও অবরুদ্ধ সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য নির্ধারণ করা। পাশাপাশি আলোচিত ব্যাংকগুলো থেকে লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারে বিশেষ আদালত গঠন প্রয়োজন। এসব আদালতে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট বিচারক নিয়োগ ও দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া চালু করা দরকার। একই সাথে ঋণ পরিশোধে বাধ্যতামূলক সময়সীমা নির্ধারণ ও সময়সীমা অতিক্রম করলে সম্পদ নিলামের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিক্রীত সম্পদের অর্থ সরাসরি আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধে ব্যবহার করা উচিত। আস্থা অর্জনের জন্য অর্থ উদ্ধারের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত জনসম্মুখে প্রতিবেদন প্রকাশ করা দরকার।

আস্থা পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ

ব্যাংক খাতের সঙ্কট এখন শুধু আর্থিক সমস্যা নয়, এটি আস্থার সঙ্কটেও পরিণত হয়েছে। আমানতকারীরা যদি দেখেন যে, ঋণখেলাপিদের সম্পদ অক্ষত রয়েছে অথচ তাদের অর্থ ফেরত পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে, তাহলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনগণের বিশ্বাস আরো কমে যাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একীভূতকরণ কেবল প্রশাসনিক সমাধান হতে পারে; কিন্তু প্রকৃত সমাধান হলো লুট হওয়া অর্থ উদ্ধার এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা। বাজেয়াপ্ত সম্পদ দ্রুত বিক্রি করে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেয়া গেলে ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরতে শুরু করবে। অন্যথায় ‘লুটেরাদের সম্পদ অক্ষত, আর আমানতকারীরা পথে পথে’ এই বাস্তবতা আরো দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।