গঙ্গাচুক্তি নবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই

প্রয়োজন মন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনা

আবুল কালাম
Printed Edition

গঙ্গাচুক্তি নবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ধীরগতিতে এগুচ্ছে প্রক্রিয়া। ভারত বাংলাদেশের মধ্যে ৩০ বছরের এ চুক্তির সময়সীমা শেষ হতে আর মাত্র ৮ মাস বাকি থাকলেও এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনো কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এর ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নবায়ন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার বিষয়টি অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর সমাধানে মন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

একাধিক সূত্র বলছে, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সাথে এখনো ভারত সরকারের আলোচনা শুরু হয়নি। তবে এ চুক্তির নবায়ন বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি প্রতিনিধি দল বিভিন্ন সময়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় আলোচনায় অংশ নিয়েছে।

সরকারের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি জটিল ও সময়সাপেক্ষ। সরকার পরিবর্তনের পর এর কার্যক্রম বাস্তবায়নে আনুষ্ঠানিকতা প্রক্রিয়াধীন। ফলে কবে তার শেষ হবে তা নিশ্চিত করে এ মূহুর্তে বলা অসম্ভব। তবে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই তার নবায়ন চূড়ান্ত হবে বলে সরকার আশাবাদী।

তাদের ভাষ্য, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্কের টানাপড়েনে এ চুক্তি নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল তা এখন আর নেই। কারণ ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে পানি চুক্তি দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক কৌশল এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি বড় এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্ক বন্ধুত্বের। ফলে চুক্তি নবায়নে খুব বেশি দেরি হওয়ার কথা নয়।

অপর দিকে বিষেষজ্ঞরা বলছেন, পানি চুক্তির বিষয়ে জেআরসির কর্মকর্তাদের আলোচনার কোনো ক্ষমতা নেই। এটা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী, পানিসম্পদ মন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্যোগী হতে হবে। মূলত এই আলোচনাটা মূলত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় করে। এজন্য প্রয়োজন দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। কারণ পানি তো প্রচুর আছে কিন্তু ভারত আপনাকে দেবে কি না বা কতটুকু দেবে তা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করবে।

এ বিষয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো নিয়ে যোগাযোগ রক্ষায় গঠিত বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) পরিচালক মোহাম্মদ আবু সাঈদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি নবায়নে কার্যক্রম এখন প্রক্রিয়াধীন। তার ভাষ্য, এই ধরনের চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে দীর্ঘ আলোচনা ও পর্যালোচনা প্রয়োজন। এখন তাই হচ্ছে। যেহেতু বিষয়টি সময়সাপেক্ষ তাই তা শেষ হতে আরো কত দিন সময় লাগবে তা এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।

ইমেরিটাস অধ্যাপক ও টেকসই উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ড. আইনুন নিশাত বলেন, চুক্তি নবায়নের বিষয়টি জেআরসি দিয়ে কিছুতেই সুরাহা হবে না। কারণ এ বিষয়ে আলোচনায় তাদের সক্ষমতা নেই। এজন্য দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের সাথে প্রধানমন্ত্রী, পানি সম্পদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সরাসরি সম্পৃক্ত হতে হবে। নয়তো এ নিয়ে জটিলতা আরো বাড়বে। তিনি বলেন, ‘গঙ্গা দিয়ে একসময় প্রচুর পানি আসত। জাহাজ চলত। এখন তা আর নেই। শীতের সময়ও তাও ভাগে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাওয়া যায়। যেটা আগে দুই লাখ কিউসেক ছিল। তারপর এই পানি ভারতের করুণার ওপর নির্ভর করবে’।

ভারত তাদের ফারাক্কা পয়েন্টের পানিকে জিরো করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘ভারত যদি গঙ্গার পানি জিরো করে দেয় তাহলে দক্ষিণের কোনো নদী আর পানি পাবে না। আর তাতে করে সমুদ্রের পানি আরো উত্তরে চলে আসবে। সেচের পানি থাকবে না। চুক্তি নবায়ন না হলে ডিসেম্বর মাসের পরে ওই পানিটাও দেবে না। এজন্য পানি রাজনীতি সম্পূর্ণ বিষয় নির্ভর করছে ভারতের সাথে সমঝোতার ওপর’। জেআরসির কর্মকর্তাদের কোনো ক্ষমতা নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘পানি তো প্রচুর আছে কিন্তু ভারত আপনাকে দেবে কি না বা কতটুকু দেবে তা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করবে। এইটা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী, পানিসম্পদ মন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্যোগী হতে হবে।

অন্য দিকে পানি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ নর্থ সাউথ ইউনির্ভাসিটির অধ্যাপক মো: সিরাজুল ইসলাম বলেন, তিস্তার পানি সমস্যা শুধু শুষ্ক মৌসুমের জন্য হলেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রয়োজনে বিশেষ দুর্যোগে যাতে আমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারি এজন্য বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারণ বছরের তিন মাস তিস্তার পানির জন্য আমাদের ভারতের প্রয়োজন হলেও বাকি ৯ মাস ভারত তাদের প্রয়োজনে আমাদের দিকে পানি ছেড়ে রাখা ছাড়া উপায় নেই। কারণ গঙ্গাতে মাত্র ১৫ থেকে ২০ দিন বা এক মাসের জন্য পানি লেভেল ৪০ কিউসেকের নিচে নামতে পারে। অন্য সময় তার উপরে পানি হলে অবশ্যই তাদের পানি ছাড়তে হয়। তবে এত কিছুর মধ্যে পদ্মা ব্যারেজ বেশি জরুরি। এটা বিএনপির নির্বাচনী পরিকল্পনায় ছিল। এটা হয়ে গেলে সমস্যা অনেক কমে আসবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ফারাক্কা চুক্তির নবায়ন শুধু পানিবণ্টনের প্রশ্ন নয়; এটি উত্তরবঙ্গের কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং নদীভাঙন সমস্যার সাথেও সরাসরি যুক্ত। শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গায় পানিপ্রবাহ কমে গেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, পাবনা ও কুষ্টিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় সেচসঙ্কট, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পতন এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ৬ মার্চ ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন নিয়ে কলকাতায় বাংলাদেশ ও ভারতের বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে উভয়পক্ষ নীতিগতভাবে চুক্তি নবায়নে একমত হলেও পরবর্তী সময়ে তা বাস্তবায়নের পথে আর এগোয়নি।

ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার প্রায় ১৮ কিলোমিটার উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলায় অবস্থিত। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহের ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশ প্রতি ১০ দিনে সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার কিউসেক এবং ভারত ৪০ হাজার কিউসেক পানি পাবে। ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে।