নিজস্ব প্রতিবেদক
‘হয় জঙ্গি হিসেবে স্বীকারোক্তি দিবি, নয়তো তোকে কেটে টুকরো টুকরো করে সমুদ্রের পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হবে অথবা এখানে রেখে পাগল বানিয়ে ঢাকা শহরে ছেড়ে দেওয়া হবে। ঢাকা শহরের অধিকাংশ পাগল আমাদের তৈরি।’ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে চালানো রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের এই ভয়াবহ বর্ণনা দিলেন মুফতি শফিকুল ইসলাম। তিনি এই মামলার চার নম্বর সাক্ষী।
গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চতুর্থ সাক্ষী হিসেবে তিনি এই জবানবন্দী প্রদান করেন।
শফিকুল ইসলাম কওমি মাদরাসা থেকে দাওরা হাদিস পাস করা একজন মুফতি এবং কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে তিনি পূর্বাচলের মারকাজুস সুনান মাদরাসার প্রিন্সিপাল এবং মসজিদের ইমাম ও খতিব।
জবানবন্দীতে তিনি জানান, ১৩ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে এশার নামাজের পর তিনি মোহাম্মদপুর থেকে পূর্বাচলের উদ্দেশে রওনা হন। রাত আনুমানিক ৮টা ৩৫ মিনিটে জাপান গার্ডেন সিটির কাছে রিকশা থেকে নেমে বাসে ওঠার সময় কিছু লোক তাকে ঘেরাও করে। একজন পরিচয় জানতে চাইলে অপরজন বলে, ‘সোজা গাড়িতে ওঠ, নইলে গুলি করে দিবো।’ এরপর তাকে একটি হাইয়েস মাইক্রোবাসে তুলে ফোন ছিনিয়ে নিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। একপর্যায়ে তারা নিজেদের প্রশাসনের লোক পরিচয় দেয় এবং বলে, ‘অফিসার তোর সাথে ২-৪ ঘণ্টা কথা বলবে, এরপর তোকে মাদরাসায় দিয়ে আসবো।’
যাত্রাপথে কাপড় দিয়ে তার চোখ শক্ত করে বেঁধে দুই হাতে হ্যান্ডকাফ লাগানো হয়। একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে তাকে ৮-১০ কদম ডানে, তারপর সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ উপরে, পুনরায় ডানে ঘুরে লম্বা সিঁড়ি বেয়ে একটি স্টিলের দরজার ভেতর নেয়া হয়। সেখানে তার পোশাক পরিবর্তন করে অত্যন্ত দুর্গন্ধযুক্ত একটি পুরী এবং একটি গেঞ্জি পরিয়ে দেয়া হয়।
তাকে ৪/১১ ফিট আয়তনের একটি সেলে রাখা হয়। সেখানে তাকে সবজি ও মাছ দিয়ে খাবার দেয়া হতো এবং নির্দেশ দেয়া হতো ‘উল্টো দিকে ফিরে খাবার খেয়ে নে, পেছনের দিকে তাকাবি না।’ এমনকি খাবার শেষে হাত ধোয়া পানি পর্যন্ত তাকে খেয়ে ফেলতে বাধ্য করা হতো। প্রস্রাব-পায়খানার প্রয়োজনে হ্যান্ডকাফ দিয়ে গ্রিলে আঘাত করে শব্দ করার নিয়ম ছিল।
আটকের ২-৩ দিন পর তাকে ৪/৪ ফিট আয়তনের অন্য একটি কক্ষে নেয়া হয়, যার দেয়াল ছিল কালো এবং মেঝেতে তারকাঁটা লাগানো। সেখানে একটি ওয়াল ফ্যান এবং কোণায় একটি স্টিলের ইলেকট্রিক চেয়ার ছিল। সেখানে তাকে জঙ্গি স্বীকারোক্তি দিতে চাপ দেয়া হয় এবং লাঠি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়।
কর্মকর্তারা তাকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘এই চেয়ারে বসিয়ে শায়খ আব্দুর রহমান ও জসিম উদ্দিন রহমানীকে সার্ফ এক্সেল দিয়ে ধুয়ে সবকিছু বের করা হয়েছে, তোকেও তাই করা হবে।’ একপর্যায়ে মুফতি শফিকুল কান্নায় ভেঙে পড়ে কর্মকর্তার পা জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘আমার বাচ্চার বয়স মাত্র দুই মাস, ওকে এতিম করবেন না।; জবাবে তারা উপহাস করে বলে, ‘তোরা তো শহীদ হতে চাস, ছাত্রদের খাবারের দায়িত্ব আল্লাহর, নিজের চিন্তা কর।’
নির্যাতনের অংশ হিসেবে তাকে দীর্ঘ সময় ঘুমাতে দেয়া হতো না। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার মেরুদণ্ডে প্রচণ্ড ব্যথা হয়ে যেত। চোখ শক্ত করে বেঁধে রাখার কারণে অসহ্য মাথাব্যথা হতো এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে চোখ বের হওয়ার উপক্রম হতো। তাকে জানানো হতো ঘুমালে পেছন দিকে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে লটকিয়ে রাখা হবে। শৌচাগার ও গোসলের জন্য মাত্র ৩ মিনিট সময় দেয়া হতো এবং সেই সময়েও তাকে পেটানো হতো। বাথরুমের ট্যাপ থেকে পানি খেতে দেয়া হতো এবং দাঁত পরিষ্কারের কোনো ব্যবস্থা ছিল না।
বন্দী অবস্থায় কৌশলে চোখের কাপড় সামান্য সরিয়ে তিনি বিপরীত দিকের সেলে অন্য বন্দীদের দেখতে পান। দেয়ালের গায়ে আঙুল দিয়ে অক্ষর লিখে তিনি জানতে পারেন, তার পাশের সেলে ছিলেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার মেহেদী হাসান ডলার এবং অন্য সেলে ছিলেন শেরপুরের ঝিনাইগাতির সোহেল রানা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া এই জবানবন্দীটি শেখ হাসিনাসহ অন্যদের বিরুদ্ধে চলা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এ দিনে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন গাজী এমএইচ তামীম, ব্যারিস্টার শাইখ মাহাদীসহ অন্যরা। আসামি পক্ষে ছিলেন, আমিনুল গনি টিটু, তাবারক হোসেনসহ অন্যরা।
গুমের এ মামলায় গ্রেফতার হয়ে ঢাকার সেনানিবাসের সাবজেলে আছেন ১০ জন। তারা হলেন- র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহাবুব আলম, কর্নেল কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), র্যাবের গোয়েন্দা শাখার সাবেক পরিচালক কর্নেল মো: মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: সারওয়ার বিন কাশেম।
শেখ হাসিনা ছাড়া পলাতক অন্যরা হলেন- শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ, র্যাবের সাবেক ডিজি এম খুরশিদ হোসেন, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ ও র্যাবের সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মো: খায়রুল ইসলাম।



