নয়া দিগন্ত ডেস্ক
জাতীয় সংসদ ও সংসদ সদস্যদের মানোন্নয়ন দরকার বলে মন্তব্য করেছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেছেন, সংসদ হচ্ছে পুরো জাতির প্রতিবিম্ব। সেই প্রতিবিম্বের মধ্যে নিজের চেহারাই যদি দেখতে না পান, তাহলে সেটা আয়না হয় কী রকম করে? হতে পারে না তো। জাতীয় সংসদের মানোন্নয়ন করা দরকার। সংসদ সদস্যদেরও মানোন্নয়ন করার দরকার।
গতকাল রোববার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘জনতুষ্টিমূলক বাজেটের সালতামামি: কল্যাণরাষ্ট্রের ভাবনায় বাজেট ২০২৬-২৭’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতির বক্তব্যে মাহমুদুর রহমান মান্না এসব কথা বলেন। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পর্যালোচনায় নাগরিক ঐক্য এই গোলটেবিলের আয়োজন করে।
সংসদের চলতি বাজেট অধিবেশনে জাতীয় বাজেট নিয়ে গঠনমূলক আলোচনার তাগিদ দিয়ে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, সংসদের বাজেট অধিবেশনে বাজেট নিয়ে আলোচনা হলে তো আর মানুষ মজা পায় না। তাই সেখানে এখন মাইক্রোওভেন ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু বাজেট পাসের আগে সংসদের মধ্যে বাজেট নিয়ে আলোচনা তো হওয়া দরকার। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘চানাচুর মার্কা বাজেট’ বলেছে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী; যার সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘বাজেটকে যারা গণবিরোধী বলে, তারা কখনো জনগণের বন্ধু হতে পারে না।’
বাজেটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, অর্থনীতির ঘনীভূত রূপ হচ্ছে রাজনীতি। আর অর্থনীতি দৈনন্দিন জীবনযাত্রার এক বছরের সালতামামি অর্থাৎ হিসাব-নিকাশেরই একটা প্রতিফলন। এবারের বাজেট সামগ্রিকভাবে মানুষের জন্য কোনো কিছুরই নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। কিন্তু এতে কথার ফুলঝুরি আছে; মধ্যবিত্ত ও গরিবদের কল্যাণের বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেই।
বাজেটের লক্ষ্য অর্জন করতে এনবিআরে কাঠামোগত পরিবর্তন আনার তাগিদ দিয়ে মান্না বলেন, প্রায় সোয়া ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে প্রায় সাত লাখ কোটি টাকা তো উপার্জন করতে হবে। এর মধ্যে বড় লক্ষ্যটা অর্থমন্ত্রী দিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর)। এই বোর্ডের কোনো কাঠামো পরিবর্তন করা হয়নি, সেটা আগের মতোই আছে। গত বছরে এক লাখ কোটি টাকার ঘাটতি ছিল। তো এই বছর সেটা আদায় করতে পারবে? যদি আদায় করতে না পারে, তাহলে কী করবে? আবারও ব্যাংক থেকে টাকা ধার নেবে, তাই তো?
মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, মানুষের জন্য বাজেট, কিন্তু এখানে মানুষই তো নেই। এই বাজেট দেওয়ার পরও দ্রব্যমূল্য কমেনি। সংস্কার ও পরিবর্তনের প্রত্যাশাও পূরণ হয়নি। পরিবর্তন ছাড়া কেবল কথার ফুলঝুরি দিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়া যায় না।
গোলটেবিলে অনলাইন পোর্টাল ‘চর্চা’-র সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সোহরাব হাসান বাজেট বাস্তবায়নে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক শান্তি ও নাগরিকের মর্যাদা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, এই বাজেটে খুব বেশি পাওয়ার নেই। দুর্নীতি ও অপচয় থেকে বেরিয়ে আসার কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এটি গতানুগতিক বাজেট। মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর বাজেট চাই; স্বপ্ন দেখানোর বাজেট নয়, স্বপ্ন বাস্তবায়নের বাজেট চাই।
সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী’ ও ‘চরম অবাস্তব’ বাজেট আখ্যা দিয়ে বলেন, এই বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয়। বাজেটের ৭০ ভাগ বাস্তবায়ন হলেই খুশি হব। তবে যত সমালোচনাই হোক, এই বাজেট সংসদে ‘হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে’ বলে পাস হয়ে যাবে। আমরা যে যা-ই বলি না কেন, সরকারের কানে পানিও ঢুকবে না। দেশের জনগণের পক্ষ থেকে বিশাল একটা চাপ সৃষ্টি করতে পারলেই জনকল্যাণমূলক বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সম্ভব।
লেখক-গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, বৈষম্যবিরোধী রক্তাক্ত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গঠিত এই সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল—বৈষম্য ও দারিদ্র্যমুক্তি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, এমন বাজেট দেবে। দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোগত পরিবর্তন ও সংস্কারের বাজেট দেবে। কিন্তু বাজেটে আমরা তার কিছুই দেখতে পাইনি।
গোলটেবিলে মূল বক্তব্য উত্থাপন ও পরিচালনা করেন নাগরিক ঐক্যের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাকিব আনোয়ার। আরও বক্তব্য রাখেন, ইবাইস ইউনিভার্সিটির সাবেক ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. আরিফুর রহমান, ঢাকা স্ট্রিমের উপদেষ্টা সম্পাদক হাসান মামুন, নাগরিক ঐক্যের প্রেসিডিয়াম সদস্য দেলোয়ার হোসেন রাজা প্রমুখ।



