রাজশাহীর ট্রাফিক সিগন্যাল ৩ দশকেও সচল হয়নি

তিন দশক আগে চালু প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থার সুফল বঞ্চিত নগরবাসী

Printed Edition

মুহা: আব্দুল আউয়াল রাজশাহী

রাজশাহী নগরীর ব্যস্ত মোড়ে যানবাহনের চাপ বাড়লেই সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাতের ইশারায় গাড়ি থামিয়ে চলাচলের সঙ্কেত দিতে হয় ট্রাফিক পুলিশকে। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এ দায়িত্ব পালন করছেন তারা। অথচ একই মোড়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যালের বাতি ও অবকাঠামো। কিন্তু সেগুলো অকার্যকর। প্রায় তিন দশক আগে চালু করা প্রযুক্তিনির্ভর এই ট্রাফিক ব্যবস্থার সুফল থেকে বঞ্চিত নগরবাসী।

সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, কাদিরগঞ্জসহ গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে প্রতিদিনই বাড়ছে যানবাহনের চাপ। এ সময় ট্রাফিক সদস্যদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে একদিকের গাড়ি থামিয়ে অন্যদিকে চলাচলের সুযোগ করে দিতে হয়। একাধিক দিক থেকে যানবাহন এলে পরিস্থিতি সামাল দেয়াও তখন কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ব্যস্ত সময়ে দ্রুত যানজট তৈরি হয়।

সরেজমিন দেখা যায়, বিভিন্ন মোড়ে সিগন্যাল বাতি স্থাপিত থাকলেও সেগুলোর ব্যবহার নেই। নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণের বদলে ট্রাফিক সদস্যদের হাতের ইশারায় চলছে যানবাহন।

জানা যায়, নগরীর সড়কগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ২১টি পয়েন্টে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যানুযায়ী, তিন ধাপে এসব সিগন্যাল স্থাপনে ব্যয় হয়েছিল এক কোটি ৪০ লাখ টাকা। ১৯৯৪ সালে প্রথম ধাপে সিঅ্যান্ডবি মোড়, লক্ষ্মীপুর, বিন্দুর মোড়, সাহেববাজার জিরো পয়েন্ট, মনি চত্বর ও তালাইমারী মোড়ে সিগন্যাল স্থাপন করা হয়। ব্যয় হয় ৩৬ লাখ টাকা। ২০০২ সালে দ্বিতীয় ধাপে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের বন্ধগেট, বহরমপুর বাইপাস রোড, কোর্ট স্টেশন মোড়, কাশিয়াডাঙ্গা নতুন বাইপাস মোড় ও পুরনো সড়ক মোড়সহ কয়েকটি স্থানে সিগন্যাল বসানো হয়। ব্যয় হয় ৪৯ লাখ টাকা। তৃতীয় ধাপে উৎসব সিনেমা হল মোড়, সাগরপাড়া বটতলা, শিরোইল স্টেশন মোড়, শহীদ জিয়া শিশুপার্কের সামনের মোড় ও নওদাপাড়া আমচত্বর মোড়সহ আরো কয়েকটি স্থানে সিগন্যাল বসানো হয়। ব্যয় হয় ৫৫ লাখ টাকা।

সময় গড়ানোর সাথে এসব সিগন্যালের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। এর মধ্যে নগরীতে যানবাহনের সংখ্যা ও চলাচলের চাপও বেড়েছে। সকাল ও বিকেলের ব্যস্ত সময়ে ব্যক্তিগত গাড়ি, অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও মোটরসাইকেলের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক যানবাহনের চাপ বাড়ে। ছুটির সময় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের রাস্তার পাশে অবস্থান করায় কোথাও কোথাও যান চলাচল ধীর হয়ে পড়ে। এক মোড়ের যানজট ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের সড়কেও।

পথচারী মুরাদ হোসেন বলেন, আগে কাদিরগঞ্জ থেকে সাহেববাজার যেতে কয়েক মিনিট লাগলেও এখন যানজটের কারণে অনেক বেশি সময় লেগে যায়। কোচিং সেন্টার ছুটির সময় অভিভাবকদের রাস্তার পাশে অবস্থানে যানজট তীব্র হয় এবং কখনো তা স্বাভাবিক হতে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে।

অচল সিগন্যালের পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচলকেও যানজটের অন্যতম কারণ মনে করছেন নগরবাসী। তাদের অভিযোগ, লাইসেন্সবিহীন অনেক অটোরিকশা প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি পর্যন্ত চলছে। নিবন্ধিত সংখ্যার চেয়ে অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা বেশি বলেও অভিযোগ রয়েছে। সিটি করপোরেশনের নতুন লাইসেন্স দেয়া বন্ধ থাকার পরও নতুন যানবাহন সড়কে যুক্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ অনেকের।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু পুরনো সিগন্যাল সচল করলেই যানজটের সমাধান হবে না। যানবাহনের সংখ্যা, সড়কের ধারণক্ষমতা, পথচারী পারাপার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার অবস্থান, পার্কিং এবং যানবাহনের রুট বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক সিগন্যাল চালুর পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও নিশ্চিত করা জরুরি।

সচেতন নাগরিক মামুন অর রশিদ বলেন, অচল সিগন্যাল সচল, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক যানজট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করাও উচিত।

আরএমপির ট্রাফিক বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো: নূর আলম সিদ্দিকী বলেন, আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল চালু হলে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং যানজট নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ট্রাফিক সদস্যদের হাতের ইশারায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। এতে পুলিশ সদস্যদের অতিরিক্ত পরিশ্রমের পাশাপাশি ব্যস্ত সময়ে যানজট দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো: মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, যানজট নিরসনে আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েই দেখা হচ্ছে। অচল সিগন্যাল চালু, প্রয়োজনীয় স্থানে নতুন সিগন্যাল স্থাপন এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। নগরবাসীর চলাচল স্বাভাবিক রাখা ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সাথে সমন্বয় করে পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রায় তিন দশকে নগরীর জনসংখ্যা ও যানবাহনের বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এলেও কার্যকর হয়নি ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা। তাই পুরনো সিগন্যাল সচলের পাশাপাশি বর্তমান বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আধুনিক, কার্যকর ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি।